The Daily Ittefaq
শুক্রবার ১৫ আগস্ট ২০১৪, ৩১ শ্রাবণ ১৪২১, ১৮ শাওয়াল ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ শাহ আমানতে যাত্রীর ফ্লাস্ক থেকে ৪০ লাখ টাকার সোনা উদ্ধার | ধর্ষণের ঘটনা ভারতের জন্য লজ্জার: মোদি | শোক দিবসে সারাদেশে জাতির জনকের প্রতি শ্রদ্ধা | লঞ্চ পিনাক-৬ এর মালিকের ছেলে ওমর ফারুকও গ্রেফতার

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

বাঙালির অনিঃশেষ মহাকাব্য

মহাদেব সাহা

বহু বছর আগে রবীন্দ্রনাথ যুগপুরুষের আবির্ভাবের কথা বলেছিলেন, যিনি হবেন দেশ ও জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক, যার মধ্যে মূর্ত হয়ে উঠবে একটি জাতির স্বপ্ন, যিনি হবেন বাঙালি জাতির নবজন্মের মহানায়ক, উদ্গাতা; রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশাতে না হলেও বাঙালি জাতির সেই মহানায়কের আবির্ভাব ঘটে গত শতকের মধ্যভাগেই, যাঁর নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এক ব্যক্তির মধ্যে সমগ্র দেশ ও সমগ্র জাতির এমন প্রকাশ, এমন উদ্বোধন আর দেখা যায়নি, তিনি ধারণ করেছেন বাঙালির সমগ্র জীবন, সমগ্র চেতনা, সমগ্র প্রত্যাশা, যিনি বাঙালি জাতির আত্মপরিচয় ও আত্ম-আবিষ্কারের প্রতিষ্ঠা করেন। এ কথা তো আজ নিঃসন্দেহেই বলা যায় যে, বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে বাঙালির স্বাধীনতা হতো না কিংবা হলেও আরো কত শতাব্দী অপেক্ষা করতে হতো কে জানে। একটি জাতির আত্মপরিচয়ের গৌরব যিনি স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠা করে গেছেন নিজের জীবনের সর্বোচ্চ ত্যাগের বিনিময়ে, রবীন্দ্রনাথ তো তাঁর অসামান্য কবিকল্পনায় এই মহানায়কেরই আবির্ভাব প্রত্যক্ষ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুহীন বাংলাদেশ কল্পনা করা যায় না, যে সময় মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের মধ্যদিয়ে তাঁর মৃত্যু ঘটে তখন বঙ্গবন্ধুহীন বাংলাদেশ ছিল ভয়ঙ্কর এক দুঃস্বপ্নমাত্র, সেই দুঃস্বপ্নকে একদল নৃসংশ ঘাতক রোপণ করেছিল স্বাধীন বাংলার মাটিতে, ফলপ্রাপ্তির আশাও করেছিল, রোপণ করেছিল বটে, দৈহিকভাবে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছিল ঠিকই, কিন্তু তাঁর মৃত্যু হয়নি, সেই দুঃস্বপ্নও প্রোথিত হয়নি এই মাটিতে, সফল হয়নি, মরেও অমর হয়ে আছেন তিনি, ইতিহাসের এই হচ্ছে অমোঘ সত্য। বঙ্গবন্ধু মৃত্যুহীন, চিরঞ্জীব, কিন্তু কেন, এ কারণে যে, বঙ্গবন্ধু আর বাংলাদেশ সমার্থক, 'সে-ই ধন্য নরকুলে/ লোকে যারে নাহি ভুলে/ মনের মন্দিরে যারে সেবে সর্বজন', বঙ্গবন্ধু সেই লোকবন্দিত মহাপুরুষ, চিরস্মরণীয়। তাঁর মৃত্যু নেই।

আমি মাঝে মাঝে ভেবে আশ্চর্য হই, কিভাবে একজন মানুষ একটি দেশকে নিজের মধ্যে অপূর্ব মহিমায় ধারণ করেছিলেন, কিভাবে তাঁর মধ্যে জেগে উঠেছিল বাংলার তেরোশত নদী, বঙ্গোপসাগর, বৃক্ষপল্লব, আকাশ, প্রকৃতি, ঋতুপ্রবাহ, মানুষের জীবনধারা, আবহমান বাংলা; এই জাতির সমস্ত জাগরণ, সমস্ত দ্রোহ, সমস্ত স্বপ্ন, সমস্ত গরিমা নিজের মধ্যে ধারণ করে তিনি হয়ে উঠেছিলেন একটি জাতির প্রতীকপুরুষ, একটি জাতির স্বাধীন পরিচয়ের মানব-পতাকা, একটি দেশের মানচিত্র; তাঁর দেহ জুড়ে অঙ্কিত ছিল বাংলাদেশ, হূদয় জুড়ে চিত্রিত ছিল বাংলাদেশ, প্রাণভরে মুদ্রিত ছিল বাংলাদেশ, তিনি ছিলেন সেই মানুষ যাঁর মৃত্যুর পরেও ভূলুণ্ঠিত রক্তাক্ত দেহ ছিল এদেশের স্বাধীন মানচিত্র, 'রক্তমাখা বুক জুড়ে স্বদেশের ছবি'। আমি এখনো দেখতে পাই তাঁর রক্তাক্ত ভূলুণ্ঠিত দেহটি কিভাবে আগলে রেখেছে দেশ, তাঁর মাতৃভূমি, দেশের দুঃখ, দৈন্য, গ্লানি সব তিনি যেন তাঁর মৃতদেহটি দিয়েও অপার যত্নে ঢেকে রেখেছিলেন; এমন দৃষ্টান্ত পৃথিবীর ইতিহাসে আর নেই।

বাঙালির সর্বোচ্চ গৌরবের নাম শেখ মুজিবুর রহমান, সর্বোচ্চ ত্যাগের নাম শেখ মুজিবুর রহমান, সবচেয়ে দুর্লভ পুষ্পের নাম, শুদ্ধতম সঙ্গীতের নাম, শ্রেষ্ঠ কবিতার নাম শেখ মুজিবুর রহমান। কান পাতলে নদীর কল্লোলে, শস্যের হিল্লোলে, বৃষ্টি ও শিশিরের গুঞ্জনে, পাখির কলমুখরতায়, নবজাত শিশুর প্রথম উচ্চারণে ধ্বনিত হয় তাঁর নাম, তিনি এদেশের শ্রেষ্ঠ গোলাপ, শ্রেষ্ঠ ভাস্কর্য, শ্রেষ্ঠ হূদয়। তাঁকে ভোলে কে, ভুলতে পারে কে, তিনি আমাদের সত্তায়, চৈতন্যে, উত্থানে, জাগরণে সর্বদা অম্লান হয়ে আছেন, তিনি আছেন শিশুর হাসিতে, মাতৃস্নেহে, মাতৃভাষায়, বাংলা অক্ষরের প্রতিটি উত্সবে, তিনি হয়ে আছেন আমাদের পয়লা বৈশাখ, আমাদের নববর্ষ, আমাদের একুশে ফেব্রুয়ারি, আমাদের স্বাধীনতা; বঙ্গবন্ধু বাঙালির ইতিহাস-পুরুষ, যুগনায়ক, স্বাধীনতার প্রতীক, তাঁর মধ্যে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয় আবহমান বাংলা। বাঙালির প্রতিটি জাগরণে, প্রতিটি উত্থানে, প্রতিটি সংকটে তিনি সাহস ও ভরসা, আশা ও উদ্যম, তাঁর দিকে তাকিয়ে আমরা ভবিষ্যত্ রচনা করি, আগামী প্রণয়ন করি। তিনি একই সঙ্গে বাঙালির আধুনিকতা ও ঐতিহ্য, বাংলার পরিবর্তন ও পরম্পরা ধারণ করে আছেন। বাঙালির সমস্ত মহত্তম চেতনার সংগ্রহশালা তিনি, শ্রেষ্ঠতম চিত্রকলা; তাঁর দিকে যখন আমরা ফিরে তাকাই তখন আমরা বড় হয়ে উঠি, মহত্ত্ব ও বিশালতায় পূর্ণ হয়ে ওঠে আমাদের হূদয়; তাঁর ত্যাগ ও সাধনা শিখরস্পর্শী, আত্মত্যাগে ও আত্মবলিদানে, সাহসে ও সংগ্রামে তিনি হিমালয় স্পর্শ করেছেন, শুধু বাংলা নয়, বিশ্ব-ইতিহাসেও তাঁর দৃষ্টান্ত মেলা ভার। তিনি আমাদের জয়ের স্বপ্ন, আমাদের প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা, সমৃদ্ধির স্বাক্ষর, আমাদের গর্বের ঐশ্বর্য, তাঁর জীবন আমাদের মহত্ ইতিহাস, বাঙালির অনিঃশেষ মহাকাব্য।

মুজিব মিশে আছেন এই মাটিতে, মুজিব এই দেশের জল, বায়ু, মাটি, প্রকৃতি; তিনি বন্ধু, মানুষের বন্ধু, বাঙালি জাতির বন্ধু, বঙ্গবন্ধু; বাংলার এই দুর্লভ গোলাপ এখনো প্রতিদিন এই মাটিতে প্রস্ফুটিত হয়, আমি তার নাম রাখি মুজিব, বাংলার এই দুর্লভ কবিতা এখনো লেখা হয় নদীর কল্লোলে, পাখির সঙ্গীতে, পাতার মর্মরধ্বনিতে, আমি এই কবিতার নাম রাখি মুজিব, আমি এই জলধারার নাম রাখি মুজিব, এই বৃষ্টি ও শিশিরবিন্দুর নাম রাখি মুজিব, এই নবজাত মানবশিশুর নাম রাখি মুজিব; মুজিব হয়ে আছেন আমাদের প্রতিদিনের জীবন, প্রতিদিনের শুভকর্ম, প্রতিদিনের সংগ্রাম, প্রতিদিনের উত্সব; তাঁর মধ্যে বাংলা, বাংলার মধ্যে তিনি, বাংলার মুজিব, মুজিবের বাংলা, তিনি নশ্বর হয়েও অবিনশ্বর, মৃত্যুর পরও তিনি মৃত্যুহীন; এই দেশ এই বাংলা এই বাংলা ভাষা এই মাতৃভূমি এই মাতৃভাষা তাঁরই ললাটে অমরত্বের বিজয়টিকা এঁকে দিয়েছেন, দেশমাতৃকা তাঁর এই শ্রেষ্ঠ সন্তানকেই অমরত্বের বর দান করেছেন। তাঁর নাম গাঁথা হয়ে আছে আমাদের হূদয়তন্ত্রীতে।

পনেরোই আগস্টের কলঙ্কিত রক্তধারা, সেই মহাপাতক যুগ যুগ ধরে নিন্দিত হবে, ঘৃণিত হবে, ধিক্কৃত হবে; সেই পিতৃঘাতী নরপশুদের নাম চিরকলঙ্কিত থাকবে, সিজারের হত্যাকারীরা যেভাবে ধিক্কৃত ও লাঞ্ছিত হয়, ব্রুটাস যেমন নিষ্ঠুরতার নির্মম স্বাক্ষর হয়ে আছে, তারচেয়েও বেশি ঘৃণা ও লাঞ্ছনা কুড়াতে হবে পনেরোই আগস্টের পিতৃহন্তারকদের; মানুষরূপী এই পশুদের প্রতি নিক্ষিপ্ত হবে কোটি কোটি মানুষের অব্যক্ত ঘৃণা ও ধিক্কার, আগামী দিনের শিশুরা এই দানবদের নামে আতঙ্কে শিউরে উঠবে, অভিশপ্ত নামরূপে তারা চিহ্নিত হবে বাংলায়; তাদের নাম শুনে শুষ্ক হয়ে যাবে নদী, ঝরে পড়বে পুষ্প ও পল্লব, স্তব্ধ হয়ে যাবে পাখির কণ্ঠ, রুদ্ধ হয়ে যাবে সঙ্গীতধারা। কী চেয়েছিল এই ঘাতকেরা, বাংলার হূদয়কে, স্বাধীনতাকে, বাংলাভাষাকে, বাংলা বর্ণমালাকে, বাংলার গৌরবকে ছিন্নভিন্ন বিদীর্ণ করতে চেয়েছিল তারা, অবলুপ্ত করতে চেয়েছিল বাংলার স্বাধীনতা, মুছে ফেলতে চেয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের অর্জন। তাদের সেই অপপ্রয়াস ব্যর্থ হয়েছে, বাংলার জনগণ কিছু বিলম্ব হলেও আবার রুখে দাঁড়িয়েছে, সাহসে উঠে দাঁড়িয়েছে নির্মূল করতে বাংলার শত্রুদের চক্রান্ত, সেই জাগরণই আজকের বাংলাদেশের নবজাগরণ, কে তাকে রুধিতে পারে।

সেই নিষ্ঠুর ঘাতকদের হাতে সেদিন বঙ্গবন্ধু নিহত না হলে, গুলিতে জর্জরিত না হলে বঙ্গবন্ধুর দেহ ও বাংলার মানচিত্র, আজ বাংলার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হতো। বাঙালির ইতিহাস থেকে কয়েকটি দশক ব্যর্থতার নিষ্ফল প্রান্তর হতো না, ফুলে ফলে ফসলে আরো সমৃদ্ধ হতো বাংলা, আরো রূপময়, সৌন্দর্যমণ্ডিত, সমৃদ্ধিশালী হতো এই বাংলা, উত্কর্ষ হতো এই ভাষা ও এই ইতিহাস, উন্নত হতো এই ভূখণ্ডের মানবজীবন, বিশ্ব অভিভূত হয়ে তাকিয়ে থাকত স্বাধীন বাংলার দিকে, আরো কয়েক দশক আগেই ঘটতো বাংলার এই সাফল্য ও বিজয়, ধনে, ধান্যে, পুষ্পে, সৌরভে, সম্ভারে ভরে উঠত বাংলা, পঁচাত্তর-পরবর্তী কয়েক দশকব্যাপী মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার চেতনা এমন ধস্ত ও বিধ্বস্ত হতো না, বাংলার সেই গৌরবকে যারা অস্তমিত করতে চেয়েছিল তারাই আজ অস্তমিত হয়েছে কিংবা অস্তমিত হওয়ার পথে। বাংলা ও বাঙালির জয় অবশ্যম্ভাবী। বাংলার মানচিত্রে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে সেই নাম, সেই অপার ঐশ্বর্যশালী অবিস্মরণীয় নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, 'জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা নিয়ে টিআইবি'র বক্তব্য রাজনৈতিক উদ্দেশ্যমূলক।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
8 + 6 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
মে - ২৬
ফজর৩:৪৭
যোহর১১:৫৬
আসর৪:৩৫
মাগরিব৬:৪১
এশা৮:০৪
সূর্যোদয় - ৫:১৩সূর্যাস্ত - ০৬:৩৬
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :