The Daily Ittefaq
ঢাকা, মঙ্গলবার ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ০২ আশ্বিন ১৪২০ এবং ১০ জিলক্বদ ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ ৪৮ ঘণ্টার হরতাল ডেকেছে জামায়াতে ইসলামী | সরকারের এই মেয়াদেই রায় কার্যকর: হানিফ | চট্টগ্রামে জামায়াত শিবিরের তাণ্ডব, পুলিশের গাড়িতে আগুন | চূড়ান্ত রায়ে কাদের মোল্লার ফাঁসি

চলমান রাজনৈতিক সংকট :সংবিধান ও বাস্তবতা

আফতাব উদ্দিন ছিদ্দিকী

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে বর্তমান সরকারের প্রায় পুরোটা সময়ই দেশের রাজনীতিক আকাশ ছিল মেঘলা। সূর্য যে মাঝে মাঝে উঁকি দেয়নি, তা নয়। কিন্তু সে উঁকি পর্যন্তই। দেখা মেলেনি। পরক্ষণেই ঢাকা পড়েছে ঘনতর মেঘের চাদরে। সংবিধান অসংশোধনে সরকারের দ্ব্যর্থহীন প্রত্যয়ের সাথে সম্প্রতি যোগ হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর সংসদ বহাল রেখে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা। তাতে দপ করে নিভে গেছে আশার সমস্ত আলো। তেতে উঠেছে দুর্যোগের ঘনঘটা। মুক্তি বুভুক্ষু উদ্ধারহীন জাতির চোখে এখন শুধু অন্ধকার আর অন্ধকার।

অবশ্য এটাই অবশ্যম্ভাবী ছিল। আবহমানকাল ধরে সরকার ও বিরোধীদলের আপসহীন দ্বান্দ্বিক অবস্থান। তার ওপর পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে 'সংবিধান'কে যেভাবে 'খেয়াল-খুশির বিধান', তাতে এ পরিস্থিতি অনভিপ্রেত নয়। প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তটির কথাই ধরা যাক। সংসদ বহাল রেখে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান কিন্তু অসাংবিধানিক নয়। কারণ ১২৩(৩) অনুচ্ছেদ বলছে, 'সংসদ-সদস্যের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে

(ক) মেয়াদ-অবসানের কারণে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙ্গিয়া যাইবার পূর্ববর্তী নব্বই দিনের মধ্যে; এবং

(খ) মেয়াদ-অবসান ব্যতীত অন্য কোন কারণে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবার ক্ষেত্রে পরবর্তী নব্বই দিনের মধ্যে—

তবে শর্ত থাকে যে, এই দফার (ক) উপ-দফা অনুযায়ী অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত ব্যক্তিগণ, উপ-দফায় উল্লিখিত মেয়াদ সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত সংসদ-সদস্যরূপে কার্যভার গ্রহণ করিবেন না।'

অর্থাত্, সংসদ নির্বাচনটা সংসদ বহাল রেখেও করা যায়। আবার ভেঙ্গে দিয়েও করা যায়। তাত্ত্বিক পার্থক্য ৯০ দিন আগে আর পরে-এই যা। তবে সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধানটি আগে ছিল না। ছিল না ওই অনুচ্ছেদের শেষাংশে বর্ণিত নির্বাচনের পরেও মেয়াদপূর্তি পর্যন্ত সাংসদদের স্বপদে বহাল থাকার শর্তটিও। এ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের 'সরকার-বান্ধব' পঞ্চদশ সংশোধনীর (২০১১ সাল) ফসল। ১২৩(৩) অনুচ্ছেদটির পূর্বরূপ এরকম—'মেয়াদ অবসানের কারণে অথবা মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোন কারণে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবার পরবর্তী নব্বই দিনের মধ্যে সংসদ-সদস্যের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে।' এখানে সরকারের উদ্দেশ্যগত অসততার বিষয়টি সুস্পষ্ট।

এক্ষেত্রে সরকার চাইলে সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে নির্বাচনের ঘোষণা দিতে পারত। তাতে নির্বাচন কেন্দ্রিক জটিলতা হয়ত কমতো। কিন্তু গুণগত পার্থক্য আসত কিনা সন্দেহ। কারণ সংবিধানের ৫৫(২) অনুচ্ছদ মতে, প্রধানমন্ত্রী বা তাঁর কর্তৃত্বে সংবিধান অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রযুক্ত হবে। শুধু তাই নয়, উত্তরাধিকারীরা দায়িত্বভার গ্রহণ করার আগপর্যন্ত তিনি ও তাঁর মনোনীত মন্ত্রিসভা স্বপদে বহাল থাকবেন [অনু-৫৭(৩) ও ৫৮(৪)]। অন্যদিকে, সাংসদদের মধ্য থেকেই প্রধানমন্ত্রী ও তার মন্ত্রিসভার (এক-দশমাংস টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী ছাড়া) নিয়োগ । সংসদ ভেঙে গেলে এবং পরবর্তী সংসদ নির্বাচনের মধ্যবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তথা প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার নিয়োগও আসবে পূর্ববর্তী সাংসদদের মধ্য থেকে [অনু-৫৬]। প্রধানমন্ত্রী নেই তো মন্ত্রিসভাও নেই [অনু-৫৮(৪)]। সেক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ সাংসদের আস্থাভাজন সাংসদই হবেন নতুন প্রধানমন্ত্রী [অনু-৫৭(২)]। অর্থাত্, বিদ্যমান সংবিধানের বুনট এমনিই যে, সংসদ নির্বাচনটা যখন-যেভাবেই হউক না কেন, সংসদ থাকুক-না থাকুক, সর্বাবস্থায় ক্ষমতার মূল নাটাই কিন্তু দলীয় সরকারের হাতেই। আর এই দলীয় সরকারই যত বিষফোঁড়া। বিরোধীদলের কাছে সংসদ বহালকালীন নির্বাচনের চেয়ে বড় এলার্জি হলো এই দলীয় সরকারের অধীন নির্বাচন। অবশ্য প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ওই সময় মন্ত্রীরা দৈনন্দিন কাজ ছাড়া নীতিগত কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না । সংসদ থাকলেও অধিবেশন বসবে না। কিন্তু সংবিধানে (বা আরপিওতে) এরূপ কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। নেই সংসদ নির্বাচনকালীন দলীয় সরকারের স্বতন্ত্র কোনো রূপরেখা কিংবা অবশ্য পালনীয় কোনো আচরণবিধি। উল্লেখ্য, সংসদ আর সরকার কিন্তু এক নয়। সংবিধানে সংসদের মেয়াদের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু সরকারের মেয়াদ কিন্তু বলেনি।

অন্যদিকে দলীয় সরকারের প্রভাব মুক্ত থেকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আকাঙ্ক্ষা থেকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণার উদ্ভব ও বিকাশ। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা জনগণের ওই সহজাত ও স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষার মুখে বেশ বড় একটা চপেটাঘাত। কারণ এতে তাবত্ সুযোগ-সুবিধা নিয়েই মন্ত্রী-সাংসদেরা নির্বাচন করবে। বর্তমানে 'সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০০৮' শিরোনামে যে বিধিমালাটি কার্যকর আছে তা মূলত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে এবং মেয়াদান্তে সংসদ নির্বাচনের জন্য উপযোগী করে তৈরি করা। দলীয় সরকারের অধীনে এবং মেয়াদপূর্ব সংসদ নির্বাচনের জন্য নয়। ওই বিধিতে জাতীয় নির্বাচনে সরকারি সুবিধাভোগী প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, উপমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা সাংসদদের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু বলা নেই । কেবল উপ-নির্বাচনের ক্ষেত্রে কিছু বিধি-নিষেধের কথা বলা হয়েছে (ধারা-১৪)।

সংবিধানের ১১৮(৪) অনুচ্ছেদ নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) 'দায়িত্ব পালনে স্বাধীন' হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা না রেখে, দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনে ইসির কাছ থেকে 'স্বাধীন' ভূমিকা আশা করা কি ফানুস নয়? আবার ১২৬ অনুচ্ছেদ বলছে, 'নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা সকল নির্বাহী বিভাগের দায়িত্ব হইবে'। কিন্তু দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমাদের দেশীয় বাস্তবতায় 'সহায়তাকারী'র বদলে নির্বাহী বিভাগের 'নিয়ন্ত্রণকারী' দেখার আশংকাই কী বাস্তবসম্মত নয়? আমার ধারণা, বর্তমান সরকার দলীয় সরকারের অধীন জাতীয় নির্বাচনের কেবল সাংবিধানিক ভিত তৈরি করেই খালাস। সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য আনুষঙ্গিক যে আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক-আইনগত পরিবেশ ও পরিস্থিতি তৈরি একান্ত জরুরি ছিল, তা সম্পাদনে তারা পুরোপুরি ব্যর্থ। সরকার যেভাবে আগাচ্ছে আর বিরোধীদলও যেভাবে তর্জনী উঁচাচ্ছে, তাতে এই দেশ ও তার ১৬ কোটি নিরীহ জনগণের জীবনে আরেকটি ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন না দ্বিতীয় ওয়ান-ইলেভেন ধেয়ে আসছে- জানি না? দু'দল অনড় থাকলে সাংবিধানিক সমাধানও এখানে অনুপস্থিত। মেঘের আড়ালে আমরা সূর্য দেখতে চাই। কিন্তু সে সূর্যটা কোথায়? কেউ কি আমাদের দেখাবেন?

লেখক :আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট

যোগাযোগ: [email protected]

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন, 'বিএনপি ক্ষমতায় এলে জঙ্গিরা আবার ফিরে আসবে। আবার বোমা হামলা করবে।' আপনি কি তার সাথে একমত?
8 + 8 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
নভেম্বর - ১২
ফজর৪:৫৩
যোহর১১:৪৩
আসর৩:৩৯
মাগরিব৫:১৭
এশা৬:৩২
সূর্যোদয় - ৬:১১সূর্যাস্ত - ০৫:১২
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :