The Daily Ittefaq
ঢাকা, শনিবার ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ০৬ আশ্বিন ১৪২০, ১৪ জিলক্বদ ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ আফগান তালেবান নেতা বারাদারকে মুক্তি দিল পাকিস্তান | মানুষ পরিবর্তন চাচ্ছে: এরশাদ | নিঃশর্ত ও খোলামনের সংলাপ চাই: যোগাযোগমন্ত্রী

বাংলাদেশে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও বর্তমান রাজনৈতিক সংকট

অধ্যাপক ড. মো. শামছুল আলম

বর্তমানে বাংলাদেশ এখন কঠিন ও জটিল পরিস্থিতি অতিক্রম করছে। সব জায়গায় উদ্বেগ, উত্কণ্ঠা, ভয় আর অনিশ্চয়তার ছাপ। প্রধানমন্ত্রীর ভয় যদি আবার ১/১১ আসে, বিরোধী দলীয় নেতার ভয় একদলীয় সরকার নিয়ে, সুশীল সমাজের উত্কণ্ঠা সুষ্ঠু নির্বাচন আর সাধারণ মানুষের উত্কণ্ঠা কখন যে শুরু হয় সংঘাত আর সংঘর্ষ। সেই সাথে কিছু প্রশ্নও দেখা দিয়েছে, যেমন: নির্বাচন কি যথাসময়ে হবে, নির্বাচনকালীন সরকার কেমন হবে? যদি দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হয় তাতে কি বিএনপি অংশ নেবে? যদি বিএনপি অংশ না নেয় তাহলে সেই নির্বাচন কি গ্রহণযোগ্য হবে? নির্বাচন পরিচালনার জন্য নির্বাচন কমিশন কি সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত? এই সকল প্রশ্নে উত্তর জানতে চায় সবাই।

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে চলমান এই সংকটের জন্ম আজ থেকে প্রায় ২ বছর ৩ মাস আগে। যখন সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী করা হয়। সেই সময় থেকেই সুশীল সমাজ, আইনজ্ঞ, রাজনীতি বিশ্লেষকসহ বিশিষ্টজনেরা সবাই এর সমালোচনা করেছে। সরকার কর্ণপাত করেনি। এই সংকট এখন বিশাল আকার ধারণ করেছে। দীর্ঘ দু'বছরের অধিক সময় অতিক্রান্ত হলেও সরকার দলের পক্ষ থেকে কোন পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়নি। এই সমস্যা সমাধানেও সরকার কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। আলোচনা ও সংলাপের কথা বারবার বলা হয়েছে। কিন্তু সেটা শুধুমাত্র সভা সমাবেশেই সীমাবদ্ধ ছিল। অথচ বিরোধীজোট গত দুই বছর ধরে প্রধানত এই ইস্যুতেই আন্দোলন করে আসছে। কিন্তু সরকার সংবিধানের দোহাই দিয়ে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে বদ্ধপরিকর। ঠিক একই সাংবিধানিক বাধ্যবাধ্যকতার দোহাই দেয়া হয়েছিল ১৯৯৬ সালে। তখন বর্তমান সরকার সেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। ২০০৬ সালেও একই ঘটনা ঘটেছে। তবে তত্কালীন বিরোধী দল নির্বাচনে যেতে অপারগতা প্রকাশ করেছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য নয় বরং একজন সাবেক বিচারপতির জন্য। যার বিরুদ্ধে বিএনপির সংশ্লিষ্টার অভিযোগ ছিল। তার নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হলে সাংবিধানিক সংস্থা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবে না বলে ঘোষণা দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। সাথে সাথে তত্কালীন নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধেও ছিল অভিযোগ। ফলশ্রুতিতে তৈরি হয় ১/১১।

নির্বাচন নিয়ে সর্বশেষ জটিলতা দেখা দিয়েছে কয়েকদিন আগে প্রধানমন্ত্রীর একটি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে। এর আগে প্রধানমন্ত্রী পার্লামেন্টে ঘোষণা করেছেন যে নির্বাচনের আগে পার্লামেন্ট ভেঙ্গে দেবেন এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে প্রয়োজনে বিরোধী দলের সদস্যও থাকবে। কিন্তু গত ২ তারিখ সচিবালয়ে সচিবসভায় তিনি বলেছেন, নির্বাচন হবে ২৭ অক্টোবর থেকে ২৪ জানুয়ারির মধ্যে। তিনি সেখানে ঘোষণা করেন, এই সময়ে সংসদ বহাল থাকবে তবে কোন অধিবেশন বসবে না এবং মন্ত্রিসভা থাকবে তবে তারা রুটিন কাজ ছাড়া কোন নীতি নির্ধারণী কাজ করবে না। প্রকৃতপক্ষে মন্ত্রীরা যে শুধু দৈনন্দিন কাজ করবেন, নীতিগত কোন সিদ্ধান্ত নেয়া থেকে বিরত থাকবে, সে বিষয়ে সংবিধান বা আরপিওতে কোনো নির্দেশনা নেই। তাছাড়া যখনই নির্বাচন হোক প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রী-সাংসদরা সব সুযোগ-সুবিধা নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন। কারণ, আইনে নির্বাচনের সময়ে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী বা সাংসদদের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের কথা বলা নেই। নির্বাচন কমিশন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধনের যে প্রস্তাব করেছে, তাতেও নির্বাচনের সময়ে প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রী-সাংসদদের ক্ষমতা বা সুযোগ-সুবিধা নিয়ন্ত্রণের কোন বিধান রাখা হয়নি। প্রয়োজন অনুযায়ী নির্বাচনী আইন, আরপিও এবং সে অনুযায়ী নির্বাচনী আচরণ বিধি এখন পর্যন্ত সংশোধন করা হয়নি। ফলে এখানে সরকার দলে মন্ত্রী-সাংসদেরা নির্বাচনে বাড়তি সুবিধা পাবেন। বৈষম্যের শিকার হবেন বিরোধী দলের প্রার্থীরা। এই অবস্থায় একটি সুষ্ঠূ নির্বাচন প্রায় অসম্ভব বলেই প্রতীয়মান হয়।

প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণার পর বিভিন্ন মহল থেকে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। বিশিষ্টজনরা অভিমত দিয়েছেন এভাবে নির্বাচন হলে 'লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড' তৈরি হবে না। এটি নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা আরো বৃদ্ধি করবে। স্বয়ং নির্বাচন কমিশনই এই বিষয়ে উদ্বিগ্ন। কিছুদিন আগে সিইসি কাজী রকিবউদ্দিন বলেছেন, 'প্রধান দুই দলের বিপরীতমুখী অবস্থানের প্রেক্ষাপটে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে 'কঠিন'। এছাড়া আরেক নির্বাচন কমিশনার আবু হাফিজ বলেছেন, 'সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন করা দুরূহ ব্যাপার'। তারও আগে জাতিসংঘের মহাসচিব, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এমনকি চীনা কূটনীতিকরাও অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে সমঝোতার কথা বলেছেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণার পর প্রকৃত প্রস্তাবে সমঝোতার আর কোন পথ খোলা রইলো না। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পরও সর্বশেষ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরী প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেত্রীর নিকট আলাদা চিঠিতে তাদেরকে সংলাপে বসার মাধ্যমে নির্বাচনকালীন সরকার পদ্ধতি সম্পর্কে সমাধানের আহবান জানিয়েছেন।

সার্বিক দিক বিশ্লেষণে এটি প্রতীয়মান হয় যে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবর্তে সরকারের কাছে যেন-তেন একটি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় টিকে থাকাটাই মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই লক্ষ্যে সরকার প্রশাসনসহ সকল ক্ষেত্রে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিশেষভাবে সুবিধা দিয়ে ঢেলে সাজাচ্ছে। বিভিন্ন পর্যায়ে পদন্নোতির হিড়িক লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রশাসনে ৩২৬ জন উপসচিবকে যুগ্ম সচিব পদে পদন্নোতি দেয়া হয়েছে। সরকারের জন্য 'হুমকি' এমন ৩৫ জন কর্মকর্তসহ প্রশাসন ক্যাডারের দুই অতিরিক্ত সচিব, দুই যুগ্ম সচিব ও পরারাষ্ট্র ক্যাডারের তিন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো পরিকল্পনা রয়েছে। বাদ যায়নি শিক্ষকরাও। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের দ্বিতীয় শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তার মর্যাদা দেয়া হয় গত বছরের মে মাসে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পদ তৃতীয় শ্রেণি থেকে দ্বিতীয় শ্রেণি করার উদ্যোগ নিয়েছে। এর পাশাপাশি সরকার ঘোষিত প্রায় ২৬ হাজার রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোরও পরিকল্পনা আছে। নির্বাচনের সময় প্রশাসন, পুলিশসহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বড় ভূমিকা থাকে। বিএনপি'র স্থায়ী কমিটির এক সদস্য এ ব্যাপারে অভিযোগ তুলেছে যে, গোটা প্রশাসনযন্ত্রকে কাজে লাগিয়ে সরকার নির্বাচনের নামে প্রহসন করতে চাইছে।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে সরকার একদলীয় নির্বাচনের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। যদি বিএনপি কিংবা ১৮ দলীয় জোট নির্বাচনে অংশ না নেয় সেই বিকল্পও সরকারের তরফ থেকে ভাবা হয়েছে। এক্ষেত্রে সরকারের যোগসাজশে বিএনপির আদলে বিএনএফ গঠনের প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা গেছে। এরশাদের জাতীয় পার্টিতো হাতের কাছেই রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর গত কিছু দিনের বক্তব্যে এটা স্পষ্ট যে, সরকার দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। নির্বাচনের ফল নিজের ঘরে ভিড়ানোর জন্য বদ্ধপরিকর, সে জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সরকারের মনোভাব 'বিচার মানি কিন্তু তাল গাছ আমার' টাইপের। সরকার গণতন্ত্রের কথা বলছে সংবিধানের কথা বলছে কিন্তু যেই জনগণের জন্য গণতন্ত্র যে জনগণের দ্বারা গণতন্ত্র সেই জনগণের কথা শুনছে না। একতরফা কিংবা সরকারি দল কর্তৃক সৃষ্টি বিরোধী দল দিয়ে নির্বাচন এদেশের মানুষ অনেক বার দেখেছে। পাশাপাশি এর মারাত্মক ফলাফলও জনগণ দেখেছে। এই প্রেক্ষিতে বারবার যুক্তরাজ্য ও ভারতের উদাহরণসহ সংবিধানের কথা টেনে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের বৈধতা কিংবা উপযোগিতার কথা বলা মানে হলো দেশকে সংঘাত ও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়া।

এই প্রেক্ষিতে বিদ্যমান অবস্থায় যদি ১৮ দল নির্বাচনে অংশ নেয় তাদেরকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর সম্মুখীন হতে হবে। ১. সংসদ বহাল থাকায় নির্বাচিত সরকার দলীয় সাংসদরা সরকারি দলের সদস্য হিসেবে সকল সুযোগ-সুবিধা পাবে। যা বিরোধী দল পাবে না। ২. প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার (মন্ত্রিসভা) যাদের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের কোন আইনগত বিধান করা হয়নি। ৩. স্বেচ্ছায় নিজেদের ক্ষমতা খর্ব করতে ইচ্ছুক বিভিন্ন বিষয়ে দ্বিধাবিভক্ত ক্ষমতাহীন নির্বাচন কমিশন। ৪. অসংশোধিত ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আলোকে রচিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ও আচরণবিধি। ৫. আমলাতন্ত্র, পুলিশ প্রশাসন, নির্বাচন কমিশনসহ প্রশাসনের সকলেই প্রধানমন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণে থাকবে। ফলে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড-এর অভাব ঘটবে।

সার্বিক দিক বিবেচনায় একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের যে পরিবেশ তা এখনো তৈরি হয়নি। কেউ কেউ বলছেন বিএনপি কিংবা ১৮ দলীয় শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে যাবে। কিন্তু উল্লেখিত বিষয়গুলোর সমাধান হওয়া ছাড়া একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন কোনভাবেই সম্ভব নয়।

লেখক :সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

E-mail: [email protected]

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
জাতীয় পার্টির (এ) চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ বলেছেন, 'সবাই না এলে নির্বাচনে যাব না।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
7 + 3 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
মে - ২০
ফজর৩:৪৯
যোহর১১:৫৫
আসর৪:৩৪
মাগরিব৬:৩৯
এশা৭:৫৯
সূর্যোদয় - ৫:১৩সূর্যাস্ত - ০৬:৩৪
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :