The Daily Ittefaq
ঢাকা, শনিবার, ১২ অক্টোবর, ২০১৩, ২৭ আশ্বিন ১৪২০, ০৬ জেলহজ্জ, ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ চতুর্থ দিন শেষে বাংলাদেশের সংগ্রহ ৫০১, নিউজিল্যান্ড ১ উইকেটে ১১৭ | সোহাগ গাজীর প্রথম সেঞ্চুরি | আন্দোলন ঠেকাতে ২৪ অক্টোবরের পর সংসদ চালু রাখার দাবি :বিরোধী দলীয় হুইপ | বাস্তবে বিরোধী দলের কোন আন্দোলন দেখছি না :যোগাযোগমন্ত্রী | বিসিবির প্রথম নির্বাচিত সভাপতি হলেন পাপন | বহদ্দারহাট ফ্লাইওভার উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী | মহাজোট সরকারের নীতি হলো- ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার : তথ্যমন্ত্রী | আজও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে তীব্র যানজট | সঙ্গীত শিল্পী আরেফিন রুমি গ্রেফতার

দুর্গাপূজার ভাব ও আনুষ্ঠানিকতা

 স্বামী স্থিরাত্মানন্দ

দর্শন, পৌরাণিক কাহিনী ও আনুষ্ঠানিকতা নিয়েই সমগ্র ধর্মজগত। কবিরাই পারেন কঠিন জীবনদর্শনকে বাইরের জগতের সাথে মিলিয়ে আমাদের বোধগম্য করতে। মহাকবি ব্যাসদেব অন্তরের সত্যকে সহজ করে বুঝিয়েছেন পুরাণগুলিতে। মার্কণ্ডয় পুরাণের অন্তর্গত শ্রীশ্রীচণ্ডীগ্রন্থে দুর্গাপূজার বিষয়টি বিশেষ করে বর্ণনা করা আছে। ঈশ্বর অনন্ত ভাবময়। জাগতিক ও পারমার্থিক আনন্দলাভের জন্য মাতৃভাবে ঈশ্বরকে আরাধনাই দুর্গাপূজার অন্তর্নিহিত রহস্য।

সাধক কবি দেখছেন, জগজ্জননী আমাদের ঘরে আসছেন, আমাদের অন্তরের পূজা গ্রহণ করতে, সন্তানকে ধন্য করতে। কাশবন, শিউলী আর ভোরের শিশির মনে করিয়ে দিচ্ছে শরত্ আগত, মা আসছেন। দোয়েল, শ্যামা ডাকছে আগমনীর সুরে। ভরা নদী কুলুকুলু শব্দে বইছে আর করতালি দিচ্ছে। পুবে মায়ের আরতির দীপ সূর্য হয়ে উঠেছে। রক্ত আকাশ যেন থালায় আলতা গুলে বরণডালা সাজাচ্ছে। মায়ের চরণ ধোয়াতে ঘাসের বুকে শিশির পড়ছে। সে চরণ মোছাবে সবুজ আঁঁচলে তাই ধরণী সবুজ রঙে সেজেছে। এ দৃশ্য সাধক-কবিরাই দেখতে পান তাঁদের অন্তরের দৃষ্টিতে।

প্রাচীন পৌরাণিক যুগ থেকেই মা ভক্তের আর্তি বিনাশ করে থাকেন। রাজা সুরথ যুদ্ধে পরাজিত হয়ে রাজত্ব হারিয়ে মনের দুঃখে গভীর বনে চলে গেলেন। সমাধি বৈশ্যের সঙ্গে তাঁর দেখা। লোভী স্ত্রী-পুত্রেরা ধন কেড়ে নিয়ে সমাধি বৈশ্যকে তাড়িয়ে দিয়েছে। তবুও তাদের কথা ভেবে তার মন খারাপ। মেধা ঋষি বললেন—

মহামায়ার প্রভাবে জীবগণ 'আমি' 'আমি' 'আমার' 'আমার' করে যেন মোহ-গর্তে পড়ে যায়। আহার, নিদ্রা এ সব বিষয়ে পশু ও মানুষ উভয়েই সমান। মহামায়া জ্ঞানীদেরও মন মোহে আবিষ্ট করে রাখেন। তাঁর শরণাগত হলেই কেবল ছাড়া পাওয়া যায়। এই সংসার থেকে মুক্তি লাভের জন্য যে ব্রহ্মবিদ্যা, সে ব্রহ্মবিদ্যাও তিনি। সেই জগতের মা-ই রয়েছেন পুণ্যবানের ঘরে লক্ষ্মী, আর পাপীদের ঘরে অলক্ষ্মী হয়ে।

মায়ের স্বরূপ অনুভব করেন ঋষিগণ ধ্যানে। সেই ধ্যান অনুসারেই প্রতিমা গড়া। বাবার ছবি দেখলে যেমন বাবাকেই মনে পড়ে, সেরকম প্রতিমা দেখলেই তাঁকেই মনে পড়বে। চণ্ডীতে আছে, মহিষাসুর আক্রমণ করে দেবতাদের হটিয়ে স্বর্গরাজ্য অধিকার করে নিল। মহিষাসুরের দৌরাত্ম্য ও দেবগণের পরাজয়ের বর্ণনা শুনে বিষ্ণু, ব্রহ্মা ও শিবের বদন থেকে এবং পরে অন্যান্য দেবগণের শরীর থেকে বিপুল তেজ নির্গত হয়ে এক নারীর দেহে রূপান্তরিত হল। এই শরীর অবলম্বন করে জগজ্জননী মহামায়া দুর্গতিনাশিনী দুর্গারূপে আবির্ভূত হলেন। নিজেদের অস্ত্র থেকে বিভিন্ন অস্ত্র দিয়ে সকলে দেবীকে সাজালেন। গিরিরাজ হিমালয় দিলেন তাঁর বাহন সিংহ। এই দেবী সকল অসুর অনুচরসহ মহিষাসুরকে বধ করে দেবতাদের স্বর্গরাজ্য ফিরিয়ে দিলেন। সৃষ্টির আদিতে বিষ্ণু-শক্তিরূপে মধু-কৈটভকে বধ করে সৃষ্টি রক্ষাও তিনি করেছিলেন।

মহামায়ার মাহাত্ম্য হল এই যে, ভক্তিপূর্বক তাঁর আরাধনা করলে তিনি ইহলোকে সুখ-সমৃদ্ধি ও পরলোকে স্বর্গসুখ এবং মুক্তিপ্রদান করেন। শ্রীকৃষ্ণের পরামর্শে অর্জুন যুদ্ধজয়ের জন্য দুর্গার স্তব করেছিলেন। মার্কণ্ডয় মুনির পরামর্শে সুরথ রাজা ও সমাধি বৈশ্য মাটির প্রতিমা গড়ে অত্যন্ত ভক্তিভাবে মহামায়া দুর্গতিনাশিনী দুর্গার পূজা করলেন। মহামায়ার বরে রাজা সুরথ অল্পদিনেই শত্রুনাশ করে রাজ্য উদ্ধার করলেন। মৃত্যুর পর সাবর্ণি নামে অষ্টম মনু হলেন। আর সমাধি বৈশ্য মায়ের বরে সংসারে বৈরাগ্য লাভ করে মুক্তিপ্রদ ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করলেন।

ভক্ত মন্ত্র উচ্চারণ করে করুণাময়ী মাকে আরাধনা করেন হূদয়ে, ঘটে, বিল্ববৃক্ষে, প্রতিমায়, নবপত্রিকায় সর্বত্র। মা প্রকৃতিরূপে পৃথিবীর সমস্ত শস্যের মধ্য থেকে মানুষের ক্ষুধার অন্ন জুগিয়ে মানুষকে দুর্গতি থেকে রক্ষা করেন। এজন্যও তিনি দুর্গা। তাই দুর্গাপূজায় নয় প্রকার শস্য দিয়েও দুর্গার একটি প্রতিমা তৈরী করা হয়, তাকে বলা হয় নবপত্রিকা বা কলাবউ।

ষষ্ঠীতে কল্পারম্ভ করে তিন দিন ধরে মায়ের পূজার পরিকল্পনা করা হয়। এরপরে বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাস। আমন্ত্রণে বেলগাছের তলায় ঐতিহ্য স্মরণ করে দেবীকে বরণ করা হয়। গন্ধ, পুষ্প, চন্দন ইত্যাদি দিয়ে সংস্কারকেই অধিবাস বলে। মায়ের অধিবাস নিজের হূদয়ে, প্রতিমায় ও নবপত্রিকায় চিন্তা করা হয়। বোধনের প্রার্থনায় সাধক মিনতি জানিয়ে বলেন---'শ্রীরামচন্দ্র যেভাবে দশানন রাবণকে নিহত করেছিলেন, সেইভাবে আমিও কাম, ক্রোধ, লোভ প্রভৃতি শত্রুদের বিনাশ করব।' এজন্য দেবী দুর্গার দশ হাতে দশ অস্ত্র। তিনি আমাদের দশদিক থেকে রক্ষা করেন।

ঘটস্থাপন দেবীর পূজার বিশেষ অঙ্গ। ঘটের জলে যেমন প্রতিবিম্ব পড়ে, সে রকম ভক্তের হূদয়েও মায়ের ভাব বা ধারণা হয়। তাই শ্রীশ্রীদুর্গাপূজা হল মাতৃভাবে ঈশ্বরের আরাধনা। শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছেন---তোমরা যাঁকে ঈশ্বর বল, ব্রহ্ম বল---আমি তাঁকে মা বলি।

সপ্তমীতে নবপত্রিকা ও প্রতিমার সংস্কার করে এবং পূজারী নিজের হূদয় থেকে প্রতিমায় প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে পূজা শুরু করেন। পূজায় কমপক্ষে ১৬টি দ্রব্যের সাহায্যে যেমন পা ধোয়ার জল, সুগন্ধি ফুল, সুগন্ধি চন্দন, ধূপ, দীপ, নৈবেদ্য ইত্যাদি দিয়ে মায়ের পূজা করা হয়। মাননীয় ব্যক্তিকে সমাজে সম্মান জানানোর মতই তাঁকে সম্মান জানানো হয়। এদিন দেবীর মহাস্নান হয় বিভিন্ন তীর্থসহ নানা স্থানের মাটি এবং নানা তীর্থের জল দিয়ে। রাজার দরজার মাটি থেকে বারবণিতার দরজার মাটি পর্যন্ত দরকার হয়, এটা মনে করার জন্য যে মা সকল স্থানেই আছেন, তিনি সকলের। মহাস্নানের ফলে ভক্তগণ বিভিন্ন পাপ থেকে মুক্ত হয়ে পবিত্র হন।

অষ্টমী ও নবমীতে সপ্তমী পূজার মতই পূজা ও মহাস্নান হয়। অষ্টমীতে বিশেষ বিষয় হল কুমারী পূজা। রামকৃষ্ণ মঠে এ পূজা বিশেষভাবে করা হয়। শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃতে আছে ঃ 'কুমারী পূজা করে কেন? সব স্ত্রীলোক ভগবতীর এক-একটি রূপ। শুদ্ধাত্মা কুমারীতে ভগবতীর বেশি প্রকাশ।' নবমীতে বৈদিক পদ্ধতি অবলম্বন করে মন্ত্র উচ্চারণ করে ঘৃত দিয়ে বিল্বপত্র অগ্নিতে আহুতি দেওয়া হয়। ব্রহ্মময়ী শ্রীশ্রীদুর্গার শ্রীচরণে সাধক সমস্ত কিছু অর্পণ করে কৃতার্থ হন। ঈশ্বরে আত্মসমর্পণই হল ধর্মের পরাকাষ্ঠা।

অষ্টমীর শেষ ২৪ মিনিট ও নবমীর প্রথম ২৪ মিনিট---এই ৪৮ মিনিট ধরে সন্ধি পূজা হয়। এই সন্ধি পূজার সময় দুর্গা দেবীকে চামণ্ডারূপে পূজা করা হয়। এ সময় সাধকের ষড়রিপুকে---কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ এবং মাত্সর্যকে বলি বা উপহার রূপে মায়ের চরণে নিবেদন করা হয়। এ সময়ই রামচন্দ্রের হাতে দুষ্ট রাবণ নিহত হয়।

দশমীতে মহিষাসুর বধ হয়। এ দিন বিসর্জন। প্রতিমা থেকে ঘটে এবং ঘট থেকে আবার ভক্তের হূদয়ে মাকে নিয়ে আসাকে বিসর্জন বলে। বিসর্জনকে আপাত দুঃখ মনে হলেও কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণের বাণীটি প্রণিধানযোগ্য ঃ 'আর বিসর্জন দিলেই বা তিনি যাবেন কোথায়? ছেলেকে ছেড়ে মা কি কখনো থাকতে পারে? এ তিন দিন বাইরে দালানে বসে তোমার পূজা নিয়েছেন, আজ থেকে তোমার আরও নিকটে থেকে সর্বদা তোমার হূদয়ে বসে তোমার পূজা নেবেন।' মা অন্তরের অসুরকে জয় করে আমাদের অন্তরেই বিরাজমান। তাই তিনি বিজয়া। বিজয়ার আনন্দে আমরাও আবার বলি—

যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেণ সংস্থিতা।

নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ

লেখক: সহ-সম্পাদক, রামকৃষ্ণ মিশন, ঢাকা

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেছেন, '২৪ অক্টোবর নিয়ে অনিশ্চয়তার কিছুই নেই।' আপনি কি তার

সাথে একমত?
6 + 4 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
নভেম্বর - ২৮
ফজর৫:০২
যোহর১১:৪৭
আসর৩:৩৫
মাগরিব৫:১৪
এশা৬:৩১
সূর্যোদয় - ৬:২২সূর্যাস্ত - ০৫:০৯
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :