The Daily Ittefaq
ঢাকা, শনিবার, ১২ অক্টোবর, ২০১৩, ২৭ আশ্বিন ১৪২০, ০৬ জেলহজ্জ, ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ চতুর্থ দিন শেষে বাংলাদেশের সংগ্রহ ৫০১, নিউজিল্যান্ড ১ উইকেটে ১১৭ | সোহাগ গাজীর প্রথম সেঞ্চুরি | আন্দোলন ঠেকাতে ২৪ অক্টোবরের পর সংসদ চালু রাখার দাবি :বিরোধী দলীয় হুইপ | বাস্তবে বিরোধী দলের কোন আন্দোলন দেখছি না :যোগাযোগমন্ত্রী | বিসিবির প্রথম নির্বাচিত সভাপতি হলেন পাপন | বহদ্দারহাট ফ্লাইওভার উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী | মহাজোট সরকারের নীতি হলো- ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার : তথ্যমন্ত্রী | আজও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে তীব্র যানজট | সঙ্গীত শিল্পী আরেফিন রুমি গ্রেফতার

শ্রী শ্রী চন্ডীর প্রেক্ষাপট

আজকের দুর্গাপূজা এবং আমরা

 শ্রী নিত্যানন্দ চক্রবর্তী

আজ একবিংশ শতকে দাঁড়িয়ে সেই মহাদেবী মা অন্নপূর্ণার পায়ে হিন্দু পুণ্যার্থীরা অঞ্জলি নিবেদন করছে। অনেক সংশয় নব প্রজন্মের মনে, সত্যি কি এ প্রেক্ষাপট ঐতিহাসিক? এমন 'মা' কি হতে পারে? মূর্তিতে ঐ মাকে প্রণাম করে কি সত্যি এই প্রবৃত্তিময় সংসারে দেবতাদের প্রার্থিত ধন-সম্পদ-বৈভব-পত্নী-পুত্র-বিদ্যা ইত্যাদি পাওয়া যায়? উত্তর হলো, পাওয়া যায় বা যাবে কিনা সে কথা পরে। আগে ঐ অসুরের বিরুদ্ধে যুদ্ধটাতো ঘটানো চাই

সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর, কলি-হিন্দুশাস্ত্রে এ চারযুগের সন্ধান পাওয়া যায়। এ চারটি যুগকে একসঙ্গে বলা হয় দিব্যযুগ। ৪৩ লক্ষ ২০ হাজার বছরে এক একটি দিব্যযুগ, আর এরকম ৭১টি দিব্যযুগ ধরে পৃথিবীতে রাজত্ব করেন এক একজন মনু। প্রত্যেক মনু যতকাল ধরে পৃথিবীতে রাজত্ব করেন সে সময়টাকে এক এক মন্বন্তর বলে। পরপর ১৪ জন মনু এমনিভাবে রাজত্ব করলে পর সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার মাত্র একটি দিন হয়। সে সময় সৃষ্টি ধ্বংস হয়ে হয় মহাপ্রলয়। ব্রহ্মার এমন প্রতিদিনকে একটি সৃষ্টিকল্প বলে ধরা হয়। ঐ ১৪ জন মনুর নামও সনাতন শাস্ত্রে পাওয়া যায় ঃ ১) স্বয়ম্ভূব ২) স্বরোচিষ ৩) ঔত্তম ৪) তামস ৫) রৈবত ৬) চাক্ষুষ ৭) বৈবস্বত ৮) সাবর্ণি ৯) দক্ষসাবর্ণি ১০) ব্রহ্মসাবর্ণি ১১) রুদ্রসাবর্ণি ১২) ধর্মসাবর্ণি ১৩) দেবসাবর্ণি বা রৌচ্য এবং ১৪) ইন্দ্রসাবর্ণি বা ভৌত্য।

আমাদের এ পৃথিবীতে এ যাবত্ রাজত্ব করেছেন ছয়জন মনু,আর এখন চলছে সপ্তম মনু। বৈবস্বত। আগামীতে রাজা হবেন সাবর্ণি অর্থাত্ সূর্যের ছেলে। তিনি দ্বিতীয় মনু স্বরোচিষের রাজত্বকালে ছিলেন সুরথ নামের এক রাজা। দেবী চন্ডীকে তপস্যায় সন্তুষ্ট করে তিনি দেবীর বলে ৭১ দিব্যযুগ ধরে পৃথিবী অধিকার করে থাকবেন- এ ব্যবস্থা আগে থেকেই হয়ে রয়েছে। যে দেবী চন্ডীর বরে সুরথের এমন ভাগ্য হল সেই চন্ডীকার ঐশ্বরীয় লীলা ও মহিমার কথা তার কাছে প্রকাশ করেছিলেন মেধা নামে এক মুনি। শ্রী শ্রী চন্ডী বা সপ্তশতী গ্রন্থে সেই চন্ডীর লীলা কাহিনীই বলা হয়েছে। সেখানে প্রথম অধ্যায়ে মধু কৈটভ বধ, দ্বিতীয় অধ্যায়ে মহিষাসুর সৈন্যবধ, তৃতীয় অধ্যায়ে মহিষাসুর বধ, চতুর্থ অধ্যায়ে দেবতাদের চন্ডীস্তব, পঞ্চম অধ্যায়ে দেবী ও অসুর-দূতের কাহিনী, ষষ্ঠ অধ্যায়ে ধূম্রলোচন বধ, সপ্তম অধ্যায়ে চন্ড-মুন্ড বধ, অষ্টম অধ্যায়ে রক্তবীজ বধ, নবম অধ্যায়ে নিশুম্ভ বধ, দশম অধ্যায়ে শুম্ভ বধ, একাদশ অধ্যায়ে আবার দেবতাদের চন্ডীস্তব, দ্বাদশ অধ্যায়ে চন্ডীস্তব মাহাত্ম্য বর্ণনা এবং সবশেষে ত্রয়োদশ অধ্যায়ে রাজা সুরথ ও বৈশ্য সমাধির বরলাভ।

এই চন্ডীর দ্বিতীয় অধ্যায়ভাগে যে লীলা বর্ণিত হয়েছে তার সবটুকু নিয়ে আজকের দুর্গোত্সবের বিকাশ। দ্বিতীয় অধ্যায়ে মহিষাসুর বধের প্রেক্ষাপট, তৃতীয় অধ্যায়ে মহিষাসুরের সাথে চন্ডীর যুদ্ধ কাহিনী ও সবশেষে মহিষাসুর বধ, আর চতুর্থ অধ্যায়ে মহিষাসুর বধের কারণে দেবতাদের মনে পরম সন্তোষ, নিরাপত্তাবোধ ও চন্ডীর প্রতি পরমাভক্তি প্রকাশ ঘটেছে তাদের চন্ডীস্তবের মধ্যদিয়ে। কাহিনীসূত্রে, পুরাকালে দেবতাদের রাজা ইন্দ্র আর অসুরদের রাজা ছিল মহিষাসুর। একশ' বছর উভয় রাজার মধ্যে যুদ্ধ হয়ে দেবতারা পরাজিত হয়ে পৃথিবীতে নেমে এলেন। স্বর্গ রইল মহিষাসুরের করায়ত্ত। দেবতারা অনুপায় হয়ে এই পরাজয়ের বার্তা মহাদেব আর বিষ্ণুকে দিলেন। তাদের মনে ক্রোধ হল। দেবতাদের ক্রোধে তাঁদের শরীর থেকে তেজ বেরিয়ে এসে তা ঘনীভূত হয়ে প্রকাশিত হল এক তেজোপুঞ্জ কলেবর দেবীমূর্তিতে। দেবীমূর্তির অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দেবতাদের এক এক রকম তেজ অনুসারে, আর তার অনন্ত হাতে দেবতাদের দেয়া অনন্ত অস্ত্র। স্বর্গ, মর্ত্য, পাতাল সে তেজ আর অস্ত্রের আলোড়নে কেঁপে উঠল। দেবতারা আনন্দে জয়ধ্বনি করলেন, তা অসুরদের কান বিদীর্ণ করতে লাগল। মহিষাসুর চেয়ে দেখল দেবীর মাথার মুকুট আকাশে ঠেকেছে,পায়ের ভারে পৃথিবী কম্পমান। তার দলের বড় বড় যোদ্ধা চিক্ষুর, চামর, মহাহনু, বিড়ালাক্ষ, বাস্কল এবং হাজার হাজার সৈন্য, রথ, হাতি, ঘোড়াসহ দেবীকে আক্রমণ করল। তোমর, ভিন্দিপাল, শক্তি ইত্যাদি নানা অস্ত্র দেবীকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণ করতে লাগল। দেবী তার বাহন সিংহ ও তারই নিঃশ্বাসে উত্পন্ন অসংখ্য গণদেবতাদের নিয়ে দুর্মদ মহিষাসুরের সৈন্যদলের উপর আক্রমণ করলেন। অসুরসৈন্যগণ দেবীসৈন্যের আঘাতে হাত-পা-মাথাবিহীন হয়েও যুদ্ধ করছিল। কিন্তু বেশীক্ষণ নয়। রক্তসে াতে পৃথিবী ভেসে যাবার উপক্রম। তারা অল্পকালেই নিঃশেষিত হল। চিক্ষুর চামর এসব সেনাপতি নিহত হলো। কিন্তু মহিষাসুর তার সেনাপতি চিক্ষুরের মৃত্যুতে নিজেই মহিষ রূপে এগিয়ে এল দেবীর সাথে যুদ্ধ করতে। অস্ত্রের বিপরীতে অস্ত্র। দেবীর অস্ত্রে অসুরদেরও রথের সারথী আর ঘোড়া সব কাটা পড়লো। মহিষাসুরের ধনুকের ছিলাও দিলেন কেটে, অশ্ব-রথহীন অসুরেরা ঢাল-তলোয়ার নিয়ে এবার দেবীকে আক্রমণ করতে লাগলো। মহিষাসুরের ক্ষুর, মুখ, শিং, নখ, লেজের আঘাতে দেবীসৈন্যরাও মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিল। তার ক্ষুরের আঘাতে যেন বজ্রপাত হল, নিঃশ্বাসে আকাশ-বাতাস-পাহাড়-সাগর কেঁপে-কেঁপে উঠল। তখন দেবী মহিষাসুরকে একটা জালে জড়িয়ে বেঁধে ফেললেন। ইতোমধ্যে দেবী মধু পানের বিরতি নিলেন। তার পরই মহিষাসুরের উপর চূড়ান্ত আক্রমণ। অট্টহাসি দিয়ে দেবী মহিষের পিঠে চড়ে পা দিয়ে গলা চেপে ধরতেই অসুর তার নিজ মূর্তি ধরে মহিষের মুখ থেকে বেড়িয়ে পড়ল। দেবী তার বক্ষে শূল বিঁধিয়ে দিলেন। মহিষাসুরের মৃত্যুতে অন্যান্য অসুরও ছুটে পালাল।

দেবতাদের এতে পরম আনন্দ। তাঁরা দেবীর স্তব করতে লাগলেন। ধূপ, দীপ, ফুল, চন্দন দিয়ে ভক্তিভরে তাঁর পূজা করলেন সকলে। দেবী তুষ্ট হয়ে দেবতাদেরকে আশীর্বাদ করলেন ও বর দিতে চাইলেন। দেবতারা বললেন, এরূপ ঘোর বিপদে যেন তিনি সর্বদাই সহায় হন এবং পৃথিবীর মানুষ যদি দেবীর স্তুতিগুলো পরম ভক্তির সাথে উচ্চারণ করে দেবীর পূজো করেন তবে তিনি যেন প্রসন্না হয়ে তাদের ধন, সম্পদ, বিভব, পত্নী, পুত্র প্রভৃতির পরম মঙ্গল ও বৃদ্ধি প্রদান করেন। এই যে দেবীর পূজা এই উপমহাদেশ ও অন্যান্য মহাদেশেও আজকাল সনাতনী ভক্তরা মহা আড়ম্বরে করে থাকে- তা এই প্রেক্ষাপটেই। মহাশক্তিকে মহাপ্রকৃতিও বলা হয়েছে চন্ডীতে এবং তিনি নিত্যা,সর্বত্র বিরাজিতা শক্তি। আজ একবিংশ শতকে দাঁড়িয়ে সেই মহাদেবী মা অন্নপূর্ণার পায়ে হিন্দু পুণ্যার্থীরা অঞ্জলি নিবেদন করছে। অনেক সংশয় নব প্রজন্মের মনে, সত্যি কি এ প্রেক্ষাপট ঐতিহাসিক? এমন 'মা' কি হতে পারে? মূর্তিতে ঐ মাকে প্রণাম করে কি সত্যি এই প্রবৃত্তিময় সংসারে দেবতাদের প্রার্থিত ধন-সম্পদ-বৈভব-পত্নী-পুত্র-বিদ্যা ইত্যাদি পাওয়া যায়?

উত্তর হলো, পাওয়া যায় বা যাবে কিনা সে কথা পরে। আগে ঐ অসুরের বিরুদ্ধে যুদ্ধটাতো ঘটানো চাই। শুভ শক্তি রূপ দেবতাগুলো কি আজ তেজ বিকীরণ করতে পারছে, নাকি মিথ্যা, সংশয়, দুর্বলতা, স্বার্থ, হানাহানিতে ঐ অসুরের স্বভাবই পেয়ে যাচ্ছে। তাহলে যুদ্ধটা ঘটাবে কে? বিশ্বময় অসুরই যদি সব, দেবতুল্য মানুষ যদি নির্বীর্য হয়ে শুধু ভাল মানুষ সেজে দু'বেলা অন্ন জুগিয়েই হূষ্টচিত্তে গর্ব করে বলে,"ভালই ত আছি"- তবে ঐ যুদ্ধ ঘটাবে কে? আজ প্রয়োজন, এমন একটা অসুরবিনাশী যুদ্ধের। বিশ্বে দেব-শক্তির অভাব নেই, চাই তাদের সংহত শক্তির প্রকাশ। সেটাই ঘটছে না। তবে কি অপেক্ষা করবো সেদিনের জন্যে যেদিন অসুরেরা দেবতাদের মতো আমাদেরকেও পৃথিবী ছাড়া করবে।

লেখক: সভাপতি, শ্রী শ্রী গীতাসংঘ বাংলাদেশ

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেছেন, '২৪ অক্টোবর নিয়ে অনিশ্চয়তার কিছুই নেই।' আপনি কি তার

সাথে একমত?
6 + 8 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
নভেম্বর - ২৮
ফজর৫:০২
যোহর১১:৪৭
আসর৩:৩৫
মাগরিব৫:১৪
এশা৬:৩১
সূর্যোদয় - ৬:২২সূর্যাস্ত - ০৫:০৯
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :