The Daily Ittefaq
ঢাকা, শনিবার, ১২ অক্টোবর, ২০১৩, ২৭ আশ্বিন ১৪২০, ০৬ জেলহজ্জ, ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ চতুর্থ দিন শেষে বাংলাদেশের সংগ্রহ ৫০১, নিউজিল্যান্ড ১ উইকেটে ১১৭ | সোহাগ গাজীর প্রথম সেঞ্চুরি | আন্দোলন ঠেকাতে ২৪ অক্টোবরের পর সংসদ চালু রাখার দাবি :বিরোধী দলীয় হুইপ | বাস্তবে বিরোধী দলের কোন আন্দোলন দেখছি না :যোগাযোগমন্ত্রী | বিসিবির প্রথম নির্বাচিত সভাপতি হলেন পাপন | বহদ্দারহাট ফ্লাইওভার উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী | মহাজোট সরকারের নীতি হলো- ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার : তথ্যমন্ত্রী | আজও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে তীব্র যানজট | সঙ্গীত শিল্পী আরেফিন রুমি গ্রেফতার

জাগো দেবী জাগো নারী

 সঞ্চিতা

শৈশবে যখন মায়ের সাথে ঘুমাতাম, প্রতিবছর মহালয়ার ভোর রাতে চারটায় আমার ঘুম ভাঙতো বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের অসাধারণ অবারিত কণ্ঠের স্তোত্র পাঠ শুনে। 'যা দেবী সর্বভূতেষূ মাতৃরূপেণ সংস্থিতা, নমস্তস্যই নমস্তস্যই নমস্তস্যই নম নমহ...। মানে বুঝতাম না। কিন্তু বৃষ্টির মতো ছিল সে কণ্ঠের বিস্তার।

মহালয়া হতো অমাবস্যার দিনে। তার পাঁচদিন পরে ষষ্ঠীতে দেবীর চক্ষুদান, তার পরদিন অর্থাত্ সপ্তমী থেকে পূজা শুরু। বাড়ির কাছে ছিল 'হরিসভা'। পূজার বাদ্য বাজত থেকে থেকে। তাতে বোল উঠত, 'ঠাকুর থাকবে কতক্ষণ, ঠাকুর যাবে বিসর্জন।'

এমন বাঙালি সম্ভবত বিরল যিনি জীবনে একবারও পূজো মণ্ডপে যাননি। তবু একবার ভেবে নেয়া যাক সেখানকার ছবিটি। মাঝখানে সিংহবাহিনী দশপ্রহরণধারিণী দুর্গা, পায়ের কাছে মহিষাসুর, দেবীর ডান দিকে গনেশ আর লক্ষ্মী, বাঁ-দিকে সরস্বতী আর কার্তিক। দেবী দুর্গার চার ছেলে মেয়ে।

এই বেলা স্বীকার করে নেয়া ভালো যে পূজার তাত্পর্য ব্যাখ্যা করবার অধিকার বা যোগ্যতা আমার নেই। এ কেবল সাধারণভাবে জানবার চেষ্টা যে কীভাবে এবং কেন তার উত্পত্তি? কেনইবা তিনি মহাশক্তি? তার দশখানা হাতেরইবা কী প্রয়োজন?

আসলে দুর্গা পূজা হতো বসন্তকালে। রাজা সুরথ কাছের মানুষদের প্রবঞ্চনায় রাজ্যপাট হারিয়ে গভীর বনে মেধস্ ঋষির আশ্রমে আশ্রয় নেন। ঋষির কাছে জানতে চান তার এ দুর্দশার কারণ কী? আর কীভাবে তিনি তার রাজ্যপাট আবার উদ্ধার করতে পারেন। ঋষি তাকে দেবী দুর্গার কথা বলেন।

দৈত্যদের রাজা মহিষাসুর কঠোর তপস্যা করে ইন্দ্রের কাছ থেকে এই বর লাভ করেন যে কোনো দেবতা বা মানুষ বা দৈত্য বা পশু তাকে বধ করতে পারবে না। অর্থাত্ কেবলমাত্র নারীর হাতে তার মরণ হওয়া সম্ভব। এই বর লাভের ফলে সে এক সময় দেবলোক আক্রমণ করে সব লণ্ডভণ্ড করে ফেলল। দেবতারা সব হারিয়ে পৃথিবীতে এসে সাধারণ মানুষের মতো পথে পথে ঘুরতে লাগলেন। তারপর তারা সবাই গেলেন বিষ্ণুর কাছে। মহিষাসুরের অত্যাচারের কথা শুনতে শুনতে মহাক্রোধে বিষ্ণুর মুখ থেকে নির্গত হলো তেজরাশি। অন্য দেবতারাও তাদের তেজ সেই সাথে যুক্ত করলেন। আবির্ভূত হলেন জ্যোতির্ময়ী এক দেবীমূর্তি।

তিনি কোন্ দেবতার থেকে কী পেলেন, সেটা একবার দেখা যাক। শিবের তেজে মুখ, যমের তেজে চুলের সম্ভার, বিষ্ণুর তেজে বাহু, চন্দ্রের তেজে স্তন, ইন্দ্রের তেজে দেহের মধ্যভাগ, বরুণের তেজে জঙ্ঘা ও উরু, পৃথিবীর তেজে নিতম্ব, ব্রহ্মার তেজে পা, অষ্টবসুর তেজে হাতের আঙুল, কুবেরের তেজে নাক, দক্ষ প্রজাপতিদের তেজে দাঁত, অগ্নির তেজে চোখ, আর বায়ুর তেজে কান উত্পন্ন হলো। দেবতারা অস্ত্র শস্ত্রও উপহার দিলেন। মহাদেব দিলেন ত্রিশূল, বিষ্ণু সুদর্শন চক্র, বরুণ শঙ্খ ও পাশ, অগ্নিশক্তি, পবন দিলেন ধনুর্বাণ, ইন্দ্র বজ , যমরাজ দণ্ড, ব্রহ্মা কমন্ডলু এবং বিশ্বকর্মা দিলেন কুঠার। অন্যরাও আরও নানারকম অস্ত্র দিলেন। আর অলঙ্কার দিলেন ক্ষীরসমুদ্র। এবার বিবেচনা করুন, দশখানা অস্ত্র ধারণ করতে দশখানা হাত অনিবার্য কিনা। এবং সব দেবতার মিলিত শক্তি থেকে যার উত্পত্তি তিনিই সব শক্তির শেষ কথা। তার হাতে নিহত হলো মহিষাসুর। ঋষি জানালেন তিনি সন্তুষ্ট হলে রাজা সুরথ তার রাজ্যপাট ফিরে পেতে পারেন। ঋষির উপদেশ অনুসারে রাজা তখন নদীর তীরে গিয়ে সোনার দেবী মূর্তি নির্মাণ করে দেবীর আরাধনা শুরু করলেন। তিন বছর বাদে দেবী প্রসন্ন হয়ে দেখা দিলেন এবং রাজাও বর পেয়ে তার রাজ্য উদ্ধার করতে পারলেন। তখন ছিল বসন্তকাল। সেই থেকে দুর্গা পূজা হতো বসন্তে।

এখন সীতাকে হরণ করেছে রাবণ। সেও মহাশক্তিধর। তার সাথে এঁটে ওঠা কঠিন। রামায়ণে বিস্তারিত আছে সে কাহিনী। তো রামেরও এখন দরকার দেবীর প্রসন্নতা। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন দেবী আরাধনা করবেন। উত্সর্গ করবেন ১০৮টি নীলপদ্ম। প্রসঙ্গত কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও তাই তাঁর প্রেয়সীর জন্য পৃথিবী তন্ন তন্ন করে খুঁজে আনেন ১০৮টি নীলপদ্ম। তবে রাম সব ক'টি পাননি। তিনি পান ১০৭টি। রামের ছিল পদ্মের মতো নীল নয়ন। তিনি তখন ঠিক করলেন বাকি একটি পদ্মের পরিবর্তে তিনি তার একটি চোখ উপড়ে দেবেন। দেবী সন্তুষ্ট হয়ে আবারও দেখা দিলেন। রামের পক্ষে অস্ত্রধারণ করলেন। সপ্তমীর দিন শুরু হলো যুদ্ধ। অষ্টমী এবং নবমীর সন্ধিক্ষণে রাবণ নিহত হলো। দশমীর দিন বিজয় উত্সব, সেজন্য বলা হয় বিজয়া দশমী। আর সে সময়টা ছিল শরত্কাল, বসন্ত নয়। অকালে আবার দেবীর বোধন হলো। শারদীয় পূজাকে তাই বলে অকালবোধন। দশমীর দিনই প্রতিমা'র বিসর্জন হয়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী দেবীর বাপের বাড়ি এই পৃথিবী। বিসর্জনের মাধ্যমে দেবী ফিরে যান শ্বশুরবাড়ি দেবলোকে। এখন প্রতিমা মণ্ডপে যারা যারা আছেন তারা সবাই পূজিত। চার ছেলেমেয়ে নিয়ে দেবী দুর্গা, সেখানে মহিষাসুর কেন? একটা অসুরকে কেন পূজা করা হয়? তার দুটো কাহিনী প্রচলিত।

প্রথমটাতে বলা হয়েছে মহিষাসুর মোটেই খারাপ ছিলেন না। তিনিও দেবী দুর্গার পরম ভক্ত ছিলেন। কিন্তু দেবতারা তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার করে করে হয়ে উঠেছিলেন স্বেচ্ছাচারী। দেবী তাই তাদের উপযুক্ত শিক্ষা দিতে মহিষাসুরকে বললেন, তিনি যদি দেবতাদের শাস্তি দিতে অসুর হয়ে জন্ম নেন তবে দুর্গা তাকে সহস্র বছরের পুণ্য অর্পণ করবেন এবং তিনি চিরকাল তার সাথে পূজা পাবার অধিকারী হবেন। তিনি রাজি হন এই প্রস্তাবে। দেবী তখন নিজের শক্তির অংশদান করেন তাকে। দেবতারা তাই তার কাছে হার মেনে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। পরে দেবতাদের রক্ষা করতে আবার তিনি মহিষাসুরের সাথে যুদ্ধে নামেন। মহিষাসুর তাই মানুষেরও পূজ্য। আর একটা কাহিনী এ-রকম যে, দেবী দুর্গা ভক্ত মহিষাসুরের ঘরেও অবস্থান করতেন। একদিন তিনি তার মহিষীকে লাঞ্ছনা করলে দেবী ভয়ানক ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে ত্যাগ করেন। বলেন, 'তুমি একজন নারীকে অপমান করেছ। সব নারীর মধ্যে আমিও আছি। আমি আর তোমার ঘরে থাকব না।' মহিষাসুর অনেক কাকুতি-মিনতি করেও দেবীকে আটকাতে পারেন না। দেবী তাকে বলেন, 'তুিম আমার পরম ভক্ত। তার স্বীকৃতস্বরূপ তোমাকে এই বর দিচ্ছি যে, আমার সাথে সাথে আমার ভক্তবৃন্দ তোমাকেও পূজা করবে।'

শারদীয় পূজা থেকে অনেক কিছু নেবার আছে। একটি হচ্ছে নারী চেতনা। প্রকৃতিগতভাবে শারীরিক শক্তিতে নারী পুরুষের চেয়ে পিছিয়ে। কিন্তু নারী সৃষ্টি করে। নারী রক্ষা করে। পুরুষেরও সৃষ্টিকর্তা নারী। এ কথা এখন বলার দিন এসেছে যে, আগামী পৃথিবীতে পুরুষের সহায়তা ছাড়াও নারী সন্তানের জন্ম দিতে পারবে। খুবই সম্ভব পুরুষশূন্য হয়েও পৃথিবীতে মানবজাতির অস্তিত্ব টিকে থাকা। কেবলমাত্র শারীরিক শক্তিতে বলিয়ান হয়ে নারীকে যারা পদানত করতে চায় তারা অবশ্য পরিত্যজ্য। এ দেশে এবং পৃথিবীর সব দেশে।

আর একটি কথা হলো, ক্ষমা। অফুরন্ত ক্ষমতা দিয়ে কাউকেই বিশ্বাস করা যায় না। আর শেষ কথা হলো, সব সমাজেই কিছু কিছু অমানুষ থাকবেই। তারা অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করবেই। তাদের বিরুদ্ধে জয়ী হতে হলে সমাজের সব ভালোদের ঐক্য দরকার। দেবতারা যেমন তাদের সব ভালোটুকু দিয়ে দেবীকে সৃজন করেছিলেন। সেটা হতে পারলে আসুরিক শক্তি যতই বলবান হোক না কেন, তার পতন অনিবার্য। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ তার প্রমাণ। এই ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। আসলে সব যুগেই সব শুভশক্তির ঐক্য একান্ত জরুরি। প্রতিবছর সে কথাই মনে করিয়ে দেয় শারদীয় পূজা উত্সব।

লেখক: কথাসাহিত্যিক

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেছেন, '২৪ অক্টোবর নিয়ে অনিশ্চয়তার কিছুই নেই।' আপনি কি তার

সাথে একমত?
1 + 6 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
নভেম্বর - ২৮
ফজর৫:০২
যোহর১১:৪৭
আসর৩:৩৫
মাগরিব৫:১৪
এশা৬:৩১
সূর্যোদয় - ৬:২২সূর্যাস্ত - ০৫:০৯
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :