The Daily Ittefaq
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৩, ০৯ কার্তিক ১৪২০, ১৮ জেলহজ্জ ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ শর্ত সাপেক্ষে কাল ঢাকায় সমাবেশের অনুমোতি পেয়েছে বিএনপি | চট্টগ্রামে নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করে নোমানের নেতৃত্বে মিছিল | মমিনুলের শতকে শক্ত অবস্থানে বাংলাদেশ | এবার খুলনায়ও সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ | চলে গেলেন মান্না দে | কাল রাজধানীতে আওয়ামী লীগের সমাবেশ না করার সিদ্ধান্ত | তফসিল ঘোষণার আগ পর্যন্ত এই সরকার নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করবে: তথ্যমন্ত্রী | নির্বাচনের প্রস্তুতি চূড়ান্ত, সময় মতো তফসিল:সিইসি

[ রা জ নী তি ]

দুই নেত্রীর ফর্মুলা ও চলমানরাজনৈতিক সংকটের সমাধান

ড. সাব্বীর আহমেদ

গত ১৮ অক্টোবর (শুক্রবার) মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশে এক ভাষণে চলমান রাজনৈতিক সংকট সমাধানে তার দল ও সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন। তার ভাষণে বর্তমান রাজনৈতিক সংকট সমাধানে তিনি একটি সাধারণ কাঠামো প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। তার প্রস্তাবে উল্লেখিত তিনটি দিক সুস্পষ্ট, তা হলো: ১. সংবিধানের কাঠামোর মধ্যেই আগামী দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা নির্ধারণ করতে হবে; ২. দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি সর্বদলীয় সরকারের অধীনে হবে; ৩. আর এই সর্বদলীয় সরকারে বিরোধীদল (প্রধানত বিএনপি) থেকে মনোনীত সাংসদ মন্ত্রিপরিষদে অংশ নিতে পারবে।

প্রধান বিরোধী দল প্রধানমন্ত্রীর এই প্রস্তাবকে 'অস্পষ্ট' এবং 'পুরোনো', এমনকি তারা এটিকে জনগণের সাথে প্রতারণা হিসাবে আখ্যা দিলেও প্রধানমন্ত্রীর এই প্রস্তাবে আমাদের দেশে রাজনৈতিক উন্নয়নে সহায়ক অনেক উপাদান রয়েছে, যা বিশ্লেষণের দাবি রাখে। অন্যদিকে মহাজোটের শরীক দল জাতীয় পার্টিও প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবকে অস্পষ্টতার দোষে দুষ্ট হিসাবে আখ্যায়িত করেছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবের প্রতি উপরোক্ত ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি, এই প্রস্তাবের ইতিবাচক দিকগুলোকে আলোচনার বাইরে রাখতে ভূমিকা রেখেছে বলে আমি মনে করি। এখন আমি প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবের ইতিবাচক দিকগুলো পর্যায়ক্রমে তুলে ধরবো : ১. সর্বদলীয় সরকারের বিষয়ে সমঝোতা হলে নির্বাচিত রাজনীতিবিদদের অধীনেই নির্বাচন করার একটি স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে উঠতে পারে। শুধু ক্ষমতাসীন দলের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচন করার চেয়ে সর্বদলীয় সরকার নির্বাচনকালীন সকলের জন্য সমতল ক্ষেত্র তৈরিতে অধিকতর কার্যকর হবে। ২. সর্বদলীয় সরকার তার কর্মকাণ্ডের জন্য অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের চেয়ে অধিকতর বৈধ হবে এবং জনসম্পৃক্ততার কারণে এই সরকারের সদস্যরা জনগণের চাওয়া পাওয়া বুঝতে সক্ষম হবে। কেননা, জনগণের ভোটে নির্বাচিত রাজনীতিবিদরাই কেবল এই সরকারে থাকবে। ৩. তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করলেই রাজনীতিবিদদের মধ্যে আস্থা ফিরে আসবে এ ধরনের যুক্তির বাস্তব ভিত্তি নেই। বরং সর্বদলীয় সরকার কাঠামো ভিন্নমতাবলম্বী রাজনীতিবিদদের একসাথে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি করবে। পারস্পরিক মতবিনিময় এবং মেলামেশার ফলে এই ধরনের সরকার রাজনীতিবিদদের মধ্যে আস্থা সৃষ্টিতে সহায়ক হবে। ৪. সর্বদলীয় সরকার কাঠামো দ্বারা বাংলাদেশে বহুদলীয় বা দ্বি-দলীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতি চর্চার একটি ধারা তৈরিতে সহায়ক হতে পারে।

অনেকেই প্রধানমন্ত্রীর এই প্রস্তাবকে শুধু বিরোধী দলকে দমানোর কৌশল হিসাবে দেখেছেন। অথচ রাজনীতিতে কৌশলের ব্যবহার একটি স্বাভাবিক বিষয়। আবার অতিমাত্রায় কৌশল প্রয়োগ করলে তা হিতে বিপরীত হয়ে যায়। যাই হোক, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চলমান রাজনৈতিক সংকট সমাধানের যে প্রস্তাব জনগণের সামনে দিয়েছেন, তা সংকট নিরসনে দুইপক্ষের জয়ের জায়গা থেকে বিরোধীদলের সাথে দ্বন্দ্বের সমাধানের পথ খুলে দিয়েছেন। যারা প্রধানমন্ত্রীর এই প্রস্তাবকে অস্পষ্ট বলেছেন, আমি যদি এই অস্পষ্টতাকে মেনেও নেই, তবে কিছু বিরোধী দলকে তিনি আলোচনায় উদ্বুদ্ধ করার জন্য অস্পষ্ট রেখেছেন বলে ধারণা করা যায়। বিএনপি তার নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির যৌক্তিকতা তথ্য-প্রমাণসহ তুলে ধরতে ব্যর্থ হওয়া সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রীর এই ছাড় দেয়া দায়িত্বশীল নেতৃত্বের পরিচায়ক বহন করে। কিন্তু, একটি বক্তৃতার মাধ্যমে সব সমস্যা কেটে যাবে এটা আশা করা ঠিক নয়। প্রধানমন্ত্রী শুধু সংকট নিরসনে আলোচনার মৌলিক কাঠামো তুলে ধরেছেন, বাকী বিষয় যেমন: সর্বদলীয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান কে হবেন, মন্ত্রিসভার সদস্য কতজন হবে, নির্বাচনকালীন সংসদ থাকবে কি থাকবে না- এ সকল বিষয়ই আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হতে পারে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব প্রধান বিরোধী দল বিএনপি প্রত্যাখ্যান করে ২১ অক্টোবর এক সংবাদ সম্মেলনে দলটির প্রধান বেগম খালেদা জিয়া বিএনপি'র পক্ষ থেকে বিকল্প প্রস্তাব উত্থাপন করেন। বিএনপি'র প্রস্তাবের মূল বিষয়গুলো হচ্ছে: ১. ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ২০ জন উপদেষ্টার মধ্য থেকে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ পাঁচজন করে নাম দেবে। তাঁরাই নির্বাচনকালীন সরকারের উপদেষ্টা হবেন; ২. ঐকমত্যের ভিত্তিতে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একজন এ সরকারের প্রধান হবেন; ৩. সংসদ যেভাবে রাষ্ট্রপতি, স্পিকার ও সংরক্ষিত মহিলা আসনের সদস্যদের নির্বাচিত করে, সেভাবে প্রয়োজনে এই ১১ জনকে নির্বাচিত করে আনা যেতে পারে; ৪. সংবিধান সংশোধন করে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার আবার সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

বিএনপি'র প্রস্তাবের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- এটি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারেরই খানিকটা পরিবর্তিত রূপরেখা। বিএনপি এই প্রস্তাবের মাধ্যমে ত্রয়োদশ সংশোধনী সংক্রান্ত আদালতের রায় যেখানে বলা হয়েছে, বিচারবিভাগকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারে জড়ানো যাবে না— এই অবস্থানটি মেনে নিয়েছে ধারণা করছি। যদি বিচারপতিদেরকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাঠামো থেকে বাইরে রাখা হয় তাহলে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিটি কে হবেন? এছাড়াও বিএনপি গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি বলতে কি বুঝাতে চাইছে তাও পরিষ্কার নয়। এবং কিভাবে তাকে খুঁজে বের করা হবে— এ বিষয়টি বিএনপি'র প্রস্তাবে অস্পষ্ট। আর গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি সম্পর্কে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি তাদের বর্তমান সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে খুব সহজেই কি একমত হতে পারবে! এই সম্ভাব্য জটিলতাই বিএনপি'র প্রস্তাবের কেন্দ্রীয় দুর্বলতা।

বিএনপির প্রস্তাবে বলা হয়েছে, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ১০ জন মন্ত্রীকে পূর্ববর্তী ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ থেকে ৫ জন করে উপদেষ্টা বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ বেছে নেবে। কিন্তু এই ২০ জনের সাথে কোন যোগাযোগ বা কথা না বলে প্রস্তাবে তাদের অন্তর্ভুক্তি আলোচনার জটিলতার আরেকটি দিক উন্মোচন করবে।

বিএনপি'র প্রস্তাবের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে তাদের প্রস্তাবিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ১১ জনকেই সংসদে পরোক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে স্পীকার বা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মতো নির্বাচিত করে নিয়ে আসতে হবে। অর্থাত্ বিএনপি'র প্রস্তাব মানতে হলে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন। আর আওয়ামী লীগ চাচ্ছে বিদ্যমান সংবিধানের আওতায় নির্বাচিত ব্যক্তিদের নিয়ে সর্বদলীয় সরকার গঠন করে সংকটের সমাধান করতে।

দুই নেত্রীর প্রস্তাবের পরস্পর বিপরীতমুখী অবস্থানকেই স্পষ্ট করেছে। তা সত্ত্বেও দুইজনই আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছেন। ইতিমধ্যেই আলোচনা অনুষ্ঠানের জন্য বিএনপি আওয়ামী লীগকে চিঠি দিয়েছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রী এও বলেছেন যে, তিনি সংকট থেকে উত্তরণে প্রয়োজনে খালেদা জিয়ার সঙ্গে ফোনে অথবা অন্য কোন উপায়ে কথা বলবে। এ সবই সংকট উত্তরণের ক্ষেত্রে আশাবাদের জায়গা।

আলোচনা ছাড়া সংকট সমাধানের কোন পথ নেই। এই আলোচনায় দুইটি প্রস্তাবই এজেন্ডায় আসতে পারে। এবং এই আলোচনা দুইটি ধাপে হতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে দুইটি প্রস্তাবকে সমন্বিত করে একটি গ্রহণযোগ্য ফর্মুলা তৈরি করা; দ্বিতীয় পর্যায়ে গ্রহণযোগ্য ফর্মুলার ইতিবাচক/নেতিবাচক দিকগুলোর খুঁটিনাটি দিকগুলো ভবিষ্যতের আলোকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চূড়ান্ত করা। এই আলোচনার অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া, যাতে করে ভবিষ্যতে যেনো আমাদেরকে নির্বাচনকালীন সরকার পদ্ধতি নিয়ে আর সময় নষ্ট না করতে হয়। এসব কিছুই সম্ভব যদি আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণে ত্যাগী এবং দূরদর্শী মনোভাবের পরিচয় দেন।

লেখক :সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
সংসদে খালেদা জিয়ার নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের প্রস্তাব উপস্থাপন করেছে বিএনপি, আপনি কি মনে করেন সংসদ তার প্রস্তাব বিবেচনা করবে?
5 + 8 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
জুলাই - ২১
ফজর৩:৫৮
যোহর১২:০৫
আসর৪:৪৪
মাগরিব৬:৪৯
এশা৮:১১
সূর্যোদয় - ৫:২৩সূর্যাস্ত - ০৬:৪৪
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :