The Daily Ittefaq
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৩, ০৯ কার্তিক ১৪২০, ১৮ জেলহজ্জ ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ শর্ত সাপেক্ষে কাল ঢাকায় সমাবেশের অনুমোতি পেয়েছে বিএনপি | চট্টগ্রামে নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করে নোমানের নেতৃত্বে মিছিল | মমিনুলের শতকে শক্ত অবস্থানে বাংলাদেশ | এবার খুলনায়ও সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ | চলে গেলেন মান্না দে | কাল রাজধানীতে আওয়ামী লীগের সমাবেশ না করার সিদ্ধান্ত | তফসিল ঘোষণার আগ পর্যন্ত এই সরকার নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করবে: তথ্যমন্ত্রী | নির্বাচনের প্রস্তুতি চূড়ান্ত, সময় মতো তফসিল:সিইসি

[ রা জ নী তি ]

প্রস্তাবের আবর্তে সমাধানের পথ

অধ্যাপক ড. মো. শামছুল আলম

সংবিধান রচিত হয় একটি রাষ্ট্রযন্ত্রের শৃঙ্খলার বিষয়টি নিশ্চিত করতে। যে রাষ্ট্র কাঠামোটি গড়ে ওঠেছে একটি বিশাল জনসমষ্টিকে কেন্দ্র করে। এই জনসমষ্টির স্বার্থ সংরক্ষণ ও সেবা নিশ্চিত করতেই রাষ্ট্রযন্ত্রে গড়ে ওঠে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও অঙ্গ-প্রতিষ্ঠান। কিন্তু শৃঙ্খলার দোহাই দিয়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল যখন নিজের মত করে সংবিধানের ব্যাখা দেন, তখন বুঝতে হবে দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সচল রাখতে সরকারের আগ্রহের মাত্রা কতটুকু।

দেশের বর্তমান সংকট আগামী জাতীয় নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে। সরকার ব্যবস্থা কী হবে এ নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস হওয়ার মধ্য দিয়ে। এরপর থেকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন আঠার দলীয় জোট তত্ত্বাবধায়ক সরকার/নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার দাবিতে আন্দোলন করে আসছে। যেহেতু বাংলাদেশের রাজনীতিতে রাজনৈতিক দলগুলো একে অপরের ওপর আস্থার সংকটের কারণেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রবর্তন হয়েছিল। সেহেতু আঠার দলীয় জোটের তত্ত্বাবধায়ক সরকার দাবি যৌক্তিকতা বহন করে। কারণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে সরকার দলের ওপর বিরোধী দলের আস্থার সংকট এখনো ব্যাপকভাবে বিদ্যমান রয়েছে।

আন্দোলনের এ সময়গুলোতে সরকারের পক্ষ থেকে দাবিকে তোয়াক্কা না করে কোন দিক-নির্দেশনা না দিয়ে সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা জানিয়ে দেয়। সংগতকারণেই দেশের ৮৫ ভাগ মানুষের চাওয়ার তাগিদেই সংকট ঘনীভূত হয়। সবার দৃষ্টি কী হবে ২৫ অক্টোবর?

সরকারের শেষ পর্যায়ে এ সংকট সমাধানে থাকবে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ। দেশের যেকোন নাগরিক মাত্রই আশা করেছিল ভাষণে সংকট সমাধানে দিক-নির্দেশনা থাকবে। কিন্তু আশাহত হয়েছে সাধারণ জনতা। তার ভাষণে গুরুত্ব পেয়েছে চারদলীয় জোট সরকারের নানা সমালোচনা ও বর্তমান সরকারের উন্নয়নের সাফাই। সংকট সমাধানে সর্বদলীয় সরকারের রূপরেখার প্রস্তাব করেন। যা প্রকৃত অর্থে সংকট সমাধানের পরিবর্তে সংকটকে জিইয়ে রাখে। বস্তুত প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে কোন অবস্থানই ব্যক্ত করেননি। তার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সরকারের পূর্ববর্তী অবস্থানকে ভিন্ন আঙ্গিকে ব্যক্ত করা হয়েছে। যা চলমান সংকট সঞ্চালনায় নিয়ামক হবে।

প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ জানান দিচ্ছে, ২৫ অক্টোবরের পর সরকার ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই থাকছেন নির্বাহী বিভাগের সর্বোচ্চ পদে, অর্থাত্ তার অধীনেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বহাল থাকছে সংসদ ও মন্ত্রিপরিষদ। তবে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে নতুন করে যোগ হচ্ছে— 'নির্বাচনকালীন সরকার হবে সর্বদলীয়'। এতে বিরোধী দল থেকেও মন্ত্রিপরিষদে যোগ দেয়ার সুযোগ দিয়েছেন। এ প্রস্তাব আপাতদৃষ্টিতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইতিবাচক মনে হলেও, নানা ফাঁক-ফোকর স্পষ্ট। কারণ নির্বাচনকালীন সরকারে রাষ্ট্রের নির্বাহী পদে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব "লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড"-এর ইঙ্গিত বহন করে না। কারণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক আস্থার সংকট দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী সর্বদলীয় সরকারের কথা লন্ডনে বলেছিলেন।

প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবের পর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বল এখন বিএনপির কোর্টে। এটা তাদেরকে খেলতে হবে। ২১ জুন বিএনপি চেয়ারপার্সন বল খেললেন। দিয়েছেন নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে আরেকটি প্রস্তাব। ওই প্রস্তাবে বলা হয়েছে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ২০ জন উপদেষ্টার মধ্য থেকে দুই দলের প্রস্তাবের ভিত্তিতে ১০ জনকে নির্বাচনকালীন সরকারের উপদেষ্টা করা হবে। আর প্রধান উপদেষ্টা দুই দলের মতৈক্যের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হবে। এই প্রস্তাবকে সাধুবাদ জানিয়েছেন দেশের প্রবীণ আইনজ্ঞ, বুদ্ধিজীবী ও বিভিন্ন রাজনীতিক দল।

প্রস্তাবের পর বিশ্লেষকরা বলছেন, বল এখন আওয়ামী লীগের কোর্টে। এখন তাদেরকে খেলতে হবে। তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় কয়েকজন মন্ত্রী বলেছেন, "খালেদার প্রস্তাব অসাংবিধানিক"। কথা হচ্ছে, যে বিষয়টি নিয়ে সংকট ঘনীভূত হচ্ছে, দেশ সংঘাতের দিকে যাচ্ছে। সে বিষয়টিকে সমাধানকল্পে প্রতিপক্ষ আহুত প্রস্তাবকে অসাংবিধানিক বলে কেয়ার না করা সংকটকে আরো ত্বরান্বিত করবে।

প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবের সাথে বিরোধী দলীয় নেত্রীর প্রস্তাবের প্রকৃত ফারাক নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান নিয়ে। বিদ্যমান ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর পদটিকে অনেক বেশি ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। যিনি দলীয় প্রধান তিনিই প্রধানমন্ত্রী। দলীয় প্রধান হতে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হতে হয় না। প্রধানমন্ত্রী হতেও ভোটাভুটির মুখোমুখি হতে হয় না। রাষ্ট্র পরিচালনায় 'প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছাই' এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রীর এই সীমাহীন ক্ষমতার অধীনে সর্বদলীয় সরকার গঠন যদি হয়, যে নামেই ডাকা হোক না কেন এটি দলীয় সরকার এবং প্রধানমন্ত্রী সীমাহীন ক্ষমতাসম্পন্ন। সংসদ বহাল থাকার সুবাদে ৭২ অনুচ্ছেদের কল্যাণে নির্বাচনকালীন সংসদ পরিচালনায় রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক লিখিতভাবে প্রদত্ত পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করবেন। নির্দিষ্ট মেয়াদের পর প্রধানমন্ত্রী চাইলে রাষ্ট্রপতি সংসদের অধিবেশন আহ্বান করতে পারবেন। যেকোনো ধরনের সিদ্ধান্তও সরকার সংসদের মাধ্যমে নিতে পারবেন। সংগত কারণেই এটা বিরোধী দল মেনে নেবে না।

নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় কার্যপরিধি ছিল রুটিনমাফিক। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত নির্বাচনকালীন সরকারের কোনো ধরনের কার্যপরিধি ঠিক করা নেই। ফলে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছাই হবে এ সরকারের কার্যপরিধি। তার মন্ত্রিসভা কত সদস্যের হবে, মন্ত্রিসভায় বিরোধী দলের ক'জন সদস্য থাকবেন, এ মন্ত্রিসভার মেয়াদ কী হবে এবং কাজের পরিধিই বা কতটুকু হবে। এসব কিছুই প্রধানমন্ত্রী ঠিক করবেন। বিদ্যমান সাংবিধানিক ব্যবস্থায় তা মেনে নেয়া ছাড়া উপায় নেই। ফলে সংকট উত্তরণের স্বার্থে প্রধানমন্ত্রীর সাংবিধানিক বাধ্য-বাধকতাকে ক্ষাণিকটা হলেও অতিক্রম করা জরুরি।

প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবের আলোকে ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত নির্বাচন কমিশনাররাই সম্পাদন করবেন সংসদ নির্বাচন। প্রধানমন্ত্রীর সাজানো-গোছানো প্রশাসনিক ব্যবস্থার মধ্যেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে এ নির্বাচন। আবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলছেন, রাষ্ট্রীয়ভাবে দিক-নির্দেশনা না আসলে সংবিধান অনুযায়ীই নির্বাচন। আমাদের নির্বাচন কমিশন কী এতটা শক্তিশালী। ভুলে যাওয়ার কথা নয়, এই সরকারের সময়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনে সেনাবাহিনী চেয়ে পাননি তত্কালীন নির্বাচন কমিশনার এটিএম শামসুল হুদা। আস্থার জায়গা সরকার নিজে হাতে নষ্ট করেছেন। প্রধানমন্ত্রী কয়েক মাস আগে বলেছিলেন সংবিধান থেকে একচুলও নড়বেন না। তাহলে সর্বদলীয় সরকারের কথা কি সংবিধানে উল্লেখ ছিল?

এ ধরনের বক্তব্য সংকটকে আরো ঘনীভূত করবে। সংবিধান মানুষের জন্য। জাতির বৃহত্তর স্বার্থে যেমন এর পরিবর্তন আনা উচিত, ঠিক তেমনি কোন খুচরা স্বার্থ হাসিলের তাগিদে রাজনীতিকদের সংবিধানে হাত দেয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। রাজনীতিকদের ভুলে গেলে চলবে না, "আপনারা রাজনীতি করেন দেশ, জাতি ও জনগণের স্বার্থে। ক্ষমতার মসনদ পাকাপোক্ত করার জন্য নয়।"

আশার দিক হচ্ছে, খালেদা জিয়ার প্রস্তাবের পর দুই মহাসচিবের ফোনালাপ ও বিরোধী দলীয় নেত্রীর সাথে প্রধানমন্ত্রীর কথা বলার সংবাদ জনগণকে আশান্বিত করেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা প্রস্তাব দুটি থেকে সংকট সমাধানের ইঙ্গিত পেয়েছেন। তারা প্রস্তাব দুটিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা আশা করছেন, এর মধ্য দিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছতে পারবেন।

লেখক :সরকার ও রাজনীতি বিভাগ,

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
সংসদে খালেদা জিয়ার নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের প্রস্তাব উপস্থাপন করেছে বিএনপি, আপনি কি মনে করেন সংসদ তার প্রস্তাব বিবেচনা করবে?
6 + 1 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
নভেম্বর - ১২
ফজর৪:৫৩
যোহর১১:৪৩
আসর৩:৩৯
মাগরিব৫:১৭
এশা৬:৩২
সূর্যোদয় - ৬:১১সূর্যাস্ত - ০৫:১২
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :