The Daily Ittefaq
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৩, ০৯ কার্তিক ১৪২০, ১৮ জেলহজ্জ ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ শর্ত সাপেক্ষে কাল ঢাকায় সমাবেশের অনুমোতি পেয়েছে বিএনপি | চট্টগ্রামে নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করে নোমানের নেতৃত্বে মিছিল | মমিনুলের শতকে শক্ত অবস্থানে বাংলাদেশ | এবার খুলনায়ও সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ | চলে গেলেন মান্না দে | কাল রাজধানীতে আওয়ামী লীগের সমাবেশ না করার সিদ্ধান্ত | তফসিল ঘোষণার আগ পর্যন্ত এই সরকার নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করবে: তথ্যমন্ত্রী | নির্বাচনের প্রস্তুতি চূড়ান্ত, সময় মতো তফসিল:সিইসি

তথ্য অধিকার আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন চাই

রেহমান আতিক

তথ্য জানার অধিকার মানুষের অন্যান্য মৌলিক অধিকার পূরণের চাবিকাঠি। গণতন্ত্রের প্রাণ। টেকসই উন্নয়ন ও সুশাসনের পূর্বশর্ত। স্বচ্ছ, জবাবদিহি ও জন অংশগ্রহণমূলক কল্যাণকামী শাসন ব্যবস্থায় তথ্যের অবাধ প্রবাহ অপরিহার্য। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বিশ্বব্যাপী দুর্নীতির যে সূচক প্রকাশ করে তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যেসব দেশে জনগণের তথ্য জানার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে সেসব দেশে দুর্নীতি অপেক্ষাকৃত কম। আর যেসব দেশে তথ্য জানার অধিকার নেই বা নানা কালা-কানুনের মাধ্যমে সংকুচিত করে রাখা হয়েছে সেসব দেশে দুর্নীতির মাত্রা বেশি। ফিনল্যান্ড, সুইডেনসহ উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে নাগরিকদের জানার অধিকার রয়েছে এবং তথ্যের সহজপ্রাপ্যতা নিশ্চিত করা হয়েছে। অবাধ তথ্য প্রবাহ থাকায় এসব দেশে দুর্নীতিও কম। মানবমুক্তি ও নাগরিক অধিকারের অন্যতম মাইল ফলক ফরাসি বিপ্লবের সময় নাগরিক অধিকার সমুন্নত রাখতে তথ্য জানার অধিকারকে মুখ্য অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন যথার্থই বলেছেন, "গণমাধ্যম পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা ভোগ করলে সেখানে দুর্ভিক্ষ হয় না।" আর স্বাধীন গণমাধ্যমের সুফল পেতে তথ্যের অবাধ প্রবাহ অপরিহার্য। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের গোপনীয়তার সংস্কৃতি ও নানা কালা-কানুনের অজুহাতে তথ্য প্রকাশ না করার প্রবণতা লক্ষণীয় এবং সাধারণ জনগণ তথ্য প্রাপ্তির ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হত এবং হয়। তথ্যের অবাধ প্রবাহ, এর সহজপ্রাপ্যতা এবং তথ্য প্রদানে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বাধ্য থাকবেন, এমন অনুকূল পরিবেশের প্রত্যাশায় গণমাধ্যমকর্মী, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ও সুশীল সমাজের দাবির প্রেক্ষিতে ২০০৯ খৃস্টাব্দের মার্চে তথ্য অধিকার আইন মহান জাতীয় সংসদে পাস হয় এবং একই বছর জুলাই থেকে কার্যকর হয়। আইনটি কার্যকর হওয়ার মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দপ্তরের বিবিধ তথ্য প্রাপ্তির আইনগত অধিকার পেয়েছে নাগরিকরা। অফিসিয়াল সিক্রেটস এ্যাক্ট, রুলস অব বিজনেস প্রভৃতির অজুহাতে এখন আর তথ্য গোপন করার সুযোগ নেই। কারণ তথ্য অধিকার আইন কার্যকর হওয়ার পর থেকে তথ্য প্রদানে বাধা সৃষ্টিকারী অতীতের কোন আইন আর কার্যকর নেই। এ আইন পাসের উদ্দেশ্যে বলা হয়, প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক হিসেবে জনগণের তথ্য প্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করে জনগণের ক্ষমতায়ন এবং সরকার ও জনগণের মাঝে সেতুবন্ধন রচনা করে সরকারি কর্মকাণ্ডে জনঅংশগ্রহণ বৃদ্ধি ও বিভ্রান্তি দূর করা। এর ফলে গণতন্ত্র সুসংহত হবে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পাবে, দুর্নীতি হরাস পাবে ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা হবে। প্রায় ৫ বছরে এ আইনের সুফল জনগণ কতটা পেয়েছে, আইনটি যথাযথভাবে কার্যকর করতে সংশ্লিষ্ট মহল কতটা আন্তরিক, যথার্থ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে কি না, আইনটি কতটুকু জনবান্ধব বা এ সম্পর্কে জনগণকে যথাযথভাবে জানানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে কিনা তা আলোচনার দাবি রাখে।

সাধারণ পর্যবেক্ষণে এটি জোর দিয়ে বলা যায়, জনগণ এর সুফল পেতে শুরু করেছে। কিন্তু পর্যাপ্ত ও যথাযথ প্রচারণার অভাব, সরকারি-বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা না থাকা, স্বপ্রণোদিত হয়ে তথ্য প্রকাশে গড়িমশি, তথ্য প্রাপ্তিতে দীর্ঘ সময় ব্যয় নানা কারণে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সুফল পাচ্ছে না এর ভোক্তারা। আইনটি কার্যকর হওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে আইনের আওতাভুক্ত সকল দপ্তরে দায়িত্বপ্রাপ্ত তথ্য কর্মকর্তা নিয়োগ করে কমিশনে প্রেরণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বাস্তবে এর প্রতিফলন কতটা হয়েছে তা প্রশ্ন সাপেক্ষ। তবে এ কথা নির্দ্ধিধায় বলা যায়, কোন কোন দপ্তরে কর্মকর্তা নিয়োগ হলেও দেশের সাধারণ মানুষ অনেক অফিসে গিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খুঁজে পায় না। স্বপ্রণোদিত হয়ে যেসব তথ্য প্রকাশের কথা আইনে বলা হয়েছে, সেসব তথ্যও সব সময় মেলে না। গোপন করার যে দীর্ঘদিনের সংস্কৃতি তার পরিবর্তন তেমন একটা চোখে পড়ে না। তথ্য সংরক্ষণ বা ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিও প্রযুক্তি নির্ভর ও আধুনিক নয়। বিভিন্ন সময়ে তথ্য প্রাপ্তির আবেদনপত্র কোথাও কোথাও জমা পড়েছে। কেউ কেউ তথ্য পেয়েছেন আবার কেউ কেউ অনুরোধকৃত না তথ্য পেয়ে আপিল ও কমিশনে অভিযোগ করেছেন এমন খবরও আছে। প্রশ্ন হচ্ছে সরকারি কর্মকর্তাদের কেউ কেউ যেখানে এমন একটি আইন সম্পর্কে জানেন না, সেক্ষেত্রে দেশের সাধারণ মানুষের জানার সুযোগ কতটুকু হয়েছে। এর উত্তরে পরিষ্কার করে বলা যায়, ব্যাপক জনগোষ্ঠীর মধ্যে আইনটির ব্যাপক প্রচার নেই। তথ্য সংরক্ষণ ও প্রদানের দায়িত্ব যারা পালন করবেন তারা যথেষ্ট দক্ষ নন এবং কোন কোন ক্ষেত্রে আইন সম্পর্কে জানেন না। তবে জাতীয় ওয়েব পোর্টাল, জেলা তথ্য বাতায়ন, ইউনিয়ন তথ্য সেবা কেন্দ্র স্থাপনসহ বেশ কিছু সরকারি উদ্যোগ জনগণের সাধারণ তথ্য প্রাপ্তি সহজলভ্য করেছে। এটি ইতিবাচক অগ্রযাত্রা।

অনেকে মনে করেন, জনগণের জন্য প্রণীত এ আইনটির যথাযথ সুফল পেতে তথ্য কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে আরো উদ্যোগী হয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। আইন অনুযায়ী আবেদনের ২০-৩০ কার্যদিবস, আপিল করলে ১৫ কার্যদিবস এবং কমিশনে অভিযোগ দায়ের করলে সর্বোচ্চ ৫০-৭৫ কার্যদিবসের মধ্যে এর নিষ্পত্তি করবে কমিশন। সেক্ষেত্রে তথ্য প্রাপ্তিতে দীর্ঘ সময়ক্ষেপণ হয়; যে কারণে নাগরিকদের আগ্রহ কমে যায়, বিশেষ করে গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে অনেক সময় সে তথ্যের মূল্য বা উপযোগিতা থাকে না। দীর্ঘসূত্রতার এ বিষয়টিও বিবেচনায় আনতে হবে কমিশনকে। স্ব-প্রণোদিত হয়ে তথ্য প্রকাশের নীতিকে কার্যকর করতে হবে এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি নির্ভর তথ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার উপর জোর দিতে হবে। তথ্য কমিশন প্রতিবছর বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশসহ সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে। বিভিন্ন জেলায় জেলায় কমিশন সেমিনারের আয়োজন করছে। এ কাজগুলো আরো ব্যাপকভাবে ও দ্রুততার সাথে সম্পন্ন করতে হবে। কর্মকর্তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে জ্ঞান ও তথ্য প্রদান, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের তথ্য সংরক্ষণ, ব্যবস্থাপনা ও প্রকাশে সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কারিগরি প্রশিক্ষণ জরুরি। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সকল স্তরে বিশেষ করে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত তথ্য কর্মকর্তা এখনও চিহ্নিত করা হয়নি বা প্রকাশ করা হয়নি। যারা করেননি দ্রুততম সময়ের মধ্যে তারা তা চিহ্নিত করে প্রকাশ করবেন। অভিযোগ মীমাংসার পাশাপাশি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে মনিটরিং করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে কমিশনকে। তথ্য অধিকার আইনের সুবিধা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হলে, প্রান্তিক জনগণের তথ্য অধিকার নিশ্চিত করতে হলে, ইউনিয়ন পরিষদক এবং ইউনিয়ন তথ্য সেবা কেন্দ্রকে কাজে লাগানো যেতে পারে। তথ্য প্রদানে উত্সাহিত করতে প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সরকারিভাবে তথ্য মেলা করা যেতে পারে। সর্বোপরি সংশ্লিষ্ট সকলের সাথে পরামর্শ করে এ ব্যাপারে জাতীয় কর্মকৌশল নির্ধারণ করে জনপ্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষক, গণমাধ্যমকর্মী, আইনজীবী, উন্নয়নকর্মীসহ বিভিন্ন পেশা ও শ্রেণির মানুষদের সম্পৃক্ত করে কমিশন ব্যাপকভিত্তিক প্রচারণা চালাতে পারে। এ ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি বেতার-টেলিভিশন ও সংবাদপত্রসহ বিভিন্ন গণযোগাযাগ মাধ্যমকে কাজে লাগানো যায়।

সরকার, গণমাধ্যমকর্মী, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সকলের সমন্বিত উদ্যোগে তথ্য অধিকার আইন জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে পারলে এর সুফল অবশ্যই পাবে জনগণ। সরকারি-বেসরকারি সেবা ও কর্মকাণ্ড বিষয়ক সঠিক ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্য জানা থাকলে জনগণ স্বাভাবিকভাবে সরকারি কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করবে; সরকারের সাথে জনগণের সেতুবন্ধন রচনা হবে; কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে, দুর্নীতি কমবে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা হবে-যা এ আইনের মূল লক্ষ্য।

লেখক : উন্নয়নকর্মী ও পিএইচডি গবেষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

ই-মেইল: [email protected]

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
সংসদে খালেদা জিয়ার নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের প্রস্তাব উপস্থাপন করেছে বিএনপি, আপনি কি মনে করেন সংসদ তার প্রস্তাব বিবেচনা করবে?
4 + 2 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
এপ্রিল - ১০
ফজর৪:২৫
যোহর১২:০০
আসর৪:৩১
মাগরিব৬:২১
এশা৭:৩৫
সূর্যোদয় - ৫:৪২সূর্যাস্ত - ০৬:১৬
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :