The Daily Ittefaq
ঢাকা, শুক্রবার ১৪ ডিসেম্বর ২০১২, ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪১৯, ২৮ মহররম ১৪৩৪

ড. জি সি দেবের বাড়ি উদ্ধার হল না ৪১ বছরেও

'বাংলার সক্রেটিস' শহীদ হন ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ

মাহবুব রনি

বুদ্ধিজীবী হত্যার ৪১ বছরেও বাড়ির দখল পাননি উপমহাদেশের বিখ্যাত দার্শনিক ড. গোবিন্দ চন্দ দেবের (জিসি দেব) উত্তরসূরিরা। বাস্তবায়িত হয়নি তার উইল। দীর্ঘদিন বেদখল হয়ে থাকা শহীদের এই বাড়িটি উদ্ধারে নেই সরকারের কার্যকর উদ্যোগ। সম্প্রতি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে নোটিস দিলেও শেষপর্যন্ত অজানা ইশারায় থেমে গেছে সে আয়োজন। অবশ্য পূর্ত সচিব ড. খোন্দকার শওকত হোসেন ইত্তেফাককে বলেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বেআইনি দখলদারের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা হচ্ছে। শিগগির এ কাজ শেষ করা যাবে বলে আশা করেন তিনি। আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক ইত্তেফাককে বলেছেন, ড. দেবের বাড়িটি ফিরে পেতে বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ৪১ বছরেও বাড়িটির দখল বুঝে পাওয়া গেল না-এটি দুঃখজনক। বেআইনি দখলদার উচ্ছেদ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে হস্তান্তর করতে পূর্ত মন্ত্রণালয়ের কাছে দাবি জানানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।

শহীদ বুদ্ধিজীবী ড. জিসি দেব আজীবন চর্চা করেছেন মানবতাবাদ ও নৈতিক দর্শন। ব্যক্তিজীবনে সৃষ্টি করেছিলেন আন্ত:ধর্মীয় সম্প্রীতির উজ্জল দৃষ্টান্ত। যুক্তি ও মানবিক দর্শন চর্চায় কাটিয়েছেন আমৃত্যুকাল। জ্ঞান ও জীবনবোধে তিনি নিজেকে নিয়ে গিয়েছিলেন অনন্য এক উচ্চতায়। দর্শন বিষয়ে পান্ডিত্যের কারণে ড. গোবিন্দ চন্দ দেবকে (ড. জি সি দেব) বলা হয় 'বাংলার সক্রেটিস'। অকৃতদার এ মহান ব্যক্তি মৃত্যুর আগে বাংলাদেশে তার সম্পত্তির অর্ধেক দান করে গিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে। মুক্তিযুদ্ধে শহীদ এ বুদ্ধিজীবীর সেই শেষ ইচ্ছা (উইল) আজও বাস্তবায়িত হয়নি। ধানমন্ডিতে অবস্থিত এ অধ্যাপকের বাড়িটি এখন একটি অখ্যাত প্রতিষ্ঠানের অবৈধ দখলে। ধর্মীয় অসাধুতার বিরুদ্ধে সোচ্চার এ দার্শনিকের সম্পত্তির উপরে নানা ধরনের অসামাজিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন।

সর্বশেষ গত ৩০ অক্টোবরের মধ্যে জি সি দেবের ধানমন্ডির ঐ বাড়িটি ছেড়ে দিতে নির্দেশ দেয় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। এই নোটিসের কার্যকারিতা স্থগিত চেয়ে অবৈধ দখলদাররা হাইকোর্টের আশ্রয় নিলেও হাইকোর্ট তা অগ্রাহ্য করে। পরে তা আপিল বিভাগে নেয়া হয় কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ উচ্ছেদের কার্যকারিতার স্থগিতাদেশ প্রত্যাখ্যান করে। এর পরেও কেনো বাড়িটি থেকে অবৈধ দখল উচ্ছেদ করা হচ্ছে না-তা অজ্ঞাতই থেকে যাচ্ছে।

উইলে যা ছিল

ড. জিসি দেবকে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ সকালে গুলি করে হত্যা করে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী। অকৃতদার জিসি দেবের দত্তক ছেলে ছিলেন জ্যোতি প্রকাশ দত্ত এবং দত্তক মেয়ে ছিলেন বেগম রোকেয়া সুলতানা। যুদ্ধের আগে ১৯৭০ সালে জি সি দেব আমেরিকায় যাওয়ার পূর্বে একটি উইল করে যান। ঐ বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর করা ঐ উইলের চার এবং পাঁচ নম্বর ধারায় জিসি দেব উল্লেখ করেন, "পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) আমার যে সমস্ত সম্পত্তি আছে তার অর্ধেক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মানুষের কল্যাণ-দর্শনের প্রয়োজনীয়তার কথা প্রচারের জন্য পাবে। আর এই সমস্ত সম্পত্তির বাকী অর্ধেক জ্যোতি প্রকাশ দত্ত এবং রোকেয়ার মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে দেয়া হবে।" উইলে সাক্ষী ছিলেন দর্শন বিভাগের তখনকার জ্যেষ্ঠ প্রভাষক সৈয়দ আবদুল হাই এবং আবদুল গণি মিয়া।

সংশ্লিষ্ট নথিপত্র থেকে দেখা যায়, জিসি দেব উইলের প্রবেটের (সত্যতা নিরূপণ করে ব্যবস্থা) দায়িত্ব দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারকে। কিন্তু ৪১ বছরেও বাড়ির মালিকানা বুঝে পায়নি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা অন্য দুই অংশীদার। ১৯৭৭ সালে আদালত বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে একটি রায় দিলেও তখন ধানমন্ডির ৪/এ (নতুন) বাড়িটির দখল নেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

এ প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, তখন কেন কর্তৃপক্ষ বাড়িটি বুঝে নেয়নি বা বুঝে নিতে পারেনি তা বোধগম্য নয়। তবে তখন দখলমুক্ত করতে না পারলেও পূর্ত মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় শিগগিরই বাড়িটি বিশ্ববিদ্যালয় বুঝে নিবে। এ জন্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে অনুরোধ করা হয়েছে।

যেভাবে বেদখল হলো বাড়িটি

১৯৭১ সালে জি সি দেবকে হত্যার পূর্বে তার দত্তক মেয়ে রোকেয়ার স্বামীকেও গুলি করে হত্যা করে পাকিস্তানের সেনা সদস্যরা। যুদ্ধের পর ধানমন্ডির ঐ ১৫ কাঠা, ১৫ ছটাক পরিমাণ জমির বাড়িতেই থাকতেন রোকেয়া।

এলাকাবাসী এবং সংশ্লিষ্টরা জানান, আর্থিক অসঙ্গতি দেখা দিলে তিনি বাড়িতে ১৯৭৪-৭৫ সালে কিশোরগঞ্জের আনোয়ারুল হককে বাড়ির একটি অংশ ভাড়া দেন রোকেয়া। এই হকের নামেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একটি প্রতিষ্ঠান। আনোয়ারুল হকের মৃত্যুর পর সেখানে খানকা বানায় তার অনুসারীরা। এরপর প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতিকদের আশ্রয়ে অনুসারীরা রোকেয়াকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করে। এরপর বিভিন্ন সময় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বাড়িটি বুঝে নেয়ার চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হয়।

এ প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন উপদেষ্টার অফিসের কর্মকর্তা ফারহানা পারভীন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ৩৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে চেষ্টা করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সব ধরনের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু অবৈধ দখলদাররা সময় ক্ষেপণ করছে।

উচ্ছেদ ঠেকানোর চেষ্টা

জি সি দেবের ধানমন্ডির এই বাড়িটি পরিত্যক্ত সম্পত্তি (সরকারি সম্পত্তি) হিসেবে গেজেট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে সরকার। কিন্তু দখলকৃত ঐ বাড়ি তখন সরকারও উদ্ধার করতে পারেনি। সর্বশেষ গত ১৫ অক্টোবর গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় বাড়িটি ছেড়ে দিতে একটি চিঠি দেয়। মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মো. আলমগীর হোসেন স্বাক্ষরিত ঐ নোটিসে ১৫ দিনের মধ্যে প্লটটি ছেড়ে দিতে নির্দেশ দেয়া হয়। এ নির্দেশনার বিরুদ্ধে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেন অবৈধ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা চৌধুরী আফজাল হোসেন। কিন্তু তার আবেদন আদালত গত ২০ নভেম্বর খারিজ করে দেয়। এখন পর্যন্ত বাড়িটি দখলে কোনো অভিযান চালায়নি গণপূর্ত মন্ত্রণালয়।

সরেজমিন ঘুরে ও সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা যায়, জি সি দেবের বাড়ির ভিতরে একটি প্রতীকী কবর তৈরি করে মাজার নির্মাণ করেছে দখলকারীরা। এ মাজারকে আশ্রয় করেই তারা বাড়িটি দখল করে রেখেছে। মন্ত্রণালয়ের নোটিস এবং আদালতে তাদের রিট আবেদন খারিজ হওয়ার পর কিশোরগঞ্জের গ্রামের বাড়ি থেকে আনোয়ারুল হকের মৃতদেহ এনে জি সি দেবের বাড়িতে কবরস্থ করার পরিকল্পনা করছে দখলকারীরা। এর মাধ্যমে তারা উচ্ছেদ ঠেকানোর চেষ্টা করছে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের কাছে কবর স্থানান্তরের জন্য এবং মরদেহের অবশিষ্ট অংশ উঠিয়ে আনার অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছে।

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
সংবিধানের আরেকটি সংশোধনী ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে না। নাগরিক ঐক্যের সভায় ড. কামালের এই বক্তব্য আপনি সমর্থন করেন?
1 + 2 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
ফেব্রুয়ারী - ২৪
ফজর৫:০৯
যোহর১২:১২
আসর৪:২২
মাগরিব৬:০২
এশা৭:১৫
সূর্যোদয় - ৬:২৫সূর্যাস্ত - ০৫:৫৭
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :