The Daily Ittefaq
ঢাকা, শুক্রবার ১৪ ডিসেম্বর ২০১২, ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪১৯, ২৮ মহররম ১৪৩৪

বিজয়ের স্মৃতি

ট্রেনিং ক্যাম্প 'মেলাঘর'

সাদেক হোসেন খোকা

অন্য অনেক সহযোদ্ধার মতো আমিও মাকে এমনকি পরিবারের অন্য কাউকে কিছু না জানিয়েই যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে বাড়ি ছেড়েছিলাম। এপ্রিলের মাঝামাঝি সময় ছাত্র ইউনিয়নের তত্কালীন নেতা রুহুল আমীন এবং গোপীবাগের মাসুদসহ (বুড়া) বেশ কয়েকজন মিলে প্রথমে আমরা যাই নরসিংদীর শিবপুরে। ওখানে দিন কয়েক অবস্থানের পর যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেয়ার জন্য আগরতলার উদ্দেশ্যে রওনা দিই। আগরতলায় আমাদের রিসিভ করেন শহীদুল্লাহ খান বাদল (বর্তমানে দি নিউ এজ পত্রিকার প্রকাশক)। ওখানে পৌঁছে প্রথমে বটতলাস্থ সিপিএম অফিসে গিয়ে মেনন ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করি—তারপর যাই দুই নম্বর সেক্টরে। খালেদ মোশররফ ছিলেন সেই সেক্টরের কমান্ডার। মেজর হায়দার (পরবর্তীকালে কর্নেল হায়দার)-এর নেতৃত্বে ঢাকার মুক্তিযোদ্ধাদের সেখানে গেরিলা প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছিল। দুই নম্বর সেক্টরের প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের নাম ছিল 'মেলাঘর'। এই ক্যাম্প বামপন্থি (আওয়ামী লীগ ছাড়া) মুক্তিযোদ্ধাদের নির্ভরযোগ্য আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছিলো।

দুই নম্বর সেক্টরের ট্রেনিং ক্যাম্প 'মেলাঘর'-এর পারিপার্শ্বিক পরিবেশ মানুষের বসবাসের জন্য একেবারেই উপযুক্ত ছিল না। পাহাড় আর ঘন জঙ্গলে পূর্ণ চারিদিক, লাল মাটির উঁচু-নিচু পাহাড়ি পথ—একটু বৃষ্টি হলেই বেশ পিচ্ছিল হয়ে পড়তো। প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে যেতে হতো বনের ভেতরে। এই ক্যাম্পে বেশিরভাগই ছিল ঢাকা শহরের ছেলে— এরকম পরিবেশে থাকতে আমরা কেউ অভ্যস্ত ছিলাম না। আমি আর আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু মরহুম মেসবাহ উদ্দিন সাবু দুইজনে এক সঙ্গে থাকতাম। প্রকৃতির ডাকে বনের মধ্যে দুইজনে এক সঙ্গে গিয়ে দুইদিকে মুখ করে বসতাম। ক্যাম্পে নিয়ম ছিল রান্নার জন্য লাকড়ি নিজেদেরই জোগাড় করতে হতো। আর মেলাঘরে আমাদের যে খাবার দেয়া হতো তা তখন কীভাবে খেয়েছিলাম তা এখন ভেবে পাই না। পেটের ক্ষুধা আর মাতৃভূমিকে দখলদার মুক্ত করার স্বপ্নে বিভোর তরুণদের খাবারের রং বা স্বাদ দেখার সময় কই? পেট ভরলেই হলো।

মেজর হায়দারের অধীনে তিন সপ্তাহ গেরিলা ট্রেনিং শেষে আমাদের সম্মুখ যুদ্ধের ট্রেনিং নিতে ক্যাপ্টেন গাফফারের (পরবর্তীতে জাতীয় পার্টি নেতা) নেতৃত্বে পরিচালিত সাব-সেক্টরে পাঠানো হয়। ওখানে ট্রেনিং শেষ করার পর কসবা-মন্দভাগ (মির্জাপুর) বর্ডার এলাকার সাব সেক্টরে কয়েকটি সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেই। এসব যুদ্ধে ক্যাপ্টেন গাফফার সরাসরি অংশ নিতেন এবং পাকসেনাদের বাঙ্কারের কাছাকাছি তিনি চলে যেতেন। তার সাহসিকতা দেখে আমরা দারুণ অনুপ্রাণিত হই। এখানে যুদ্ধ করেই মূলত এসএমজি, এসএলার ও চাইনিজ রাইফেলসহ বিভিন্ন অস্ত্র পরিচালনা ও সরাসরি যুদ্ধ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করি। ওখানেই একটি যুদ্ধে প্রবল সাহসিকতা দেখিয়ে শহীদ হন গোপীবাগ এলাকার কৃতীসন্তান ও আমার ঘনিষ্ঠবন্ধু জাকির হোসেন।

আমাদের গ্রুপে পুলিশের একজন হাবিলদার ছিলেন- সেনাবাহিনীর সদস্যদের মতো তিনি অতটা যুদ্ধ কৌশল না জানলেও তিনি ছিলেন বেশ সাহসী- এক ধরনের অ্যাডভেঞ্চারিজম তার মধ্যে কাজ করতো। একদিন তিনি একটি গ্রুপ নিয়ে পাকিস্তানি আর্মির একটা বাঙ্কার রেট করতে যান। তারা ধানক্ষেতের ভেতর দিয়ে ক্রলিং করে এগুচ্ছিল- তাতে ধান গাছ নড়ছিল- এটা দেখে গুলি চালায় পাকিস্তানি বাহিনী। তাদের একটি গুলি এসে লাগে মতিঝিল কলোনি এলাকার নবম শ্রেণীর ছাত্র মোস্তাকের হাতে। মোস্তাক পাশে থাকা জাকিরকে ডেকে বলে, জাকির ভাই আমার গুলি লেগেছে। ঘাড় উঁচু করে সেদিকে তাকাতেই আরেকটি গুলি এসে জাকিরের কানের নিচে লেগে ভেদ করে বেড়িয়ে যায়। পরে আরও মুক্তিযোদ্ধা গিয়ে আক্রমণ করে পাকিস্তানিদের হটিয়ে তার লাশ উদ্ধার করে এবং বাংলাদেশের মাটিতেই তাকে দাফন করা হয়। তার সমাধির পাশে বাংলাদেশের পতাকাও উড়ানো হয়।

সেপ্টেম্বর শেষে আমরা আবার ঢাকায় ঢুকি। ঢাকায় আমরা মোমেনবাগে তত্কালীন নির্বাচন কমিশন অফিস, শান্তিনগরে ডিএফপি, আজিমপুরে বিমান বাহিনী রিত্রুদ্ধটিং অফিস এবং বিডিআর পিলখানা গেটে দুঃসাহসিক কয়েকটি অপারেশন চালিয়ে পাকিস্তানি আর্মির মনে ভয় ধরিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলাম। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, আকাশবাণী, বিবিসি এবং ভয়েস অফ আমেরিকার মতো বিশ্ব মিডিয়াতে সেসব অপারেশন বেশ গুরুত্ব দিয়ে বার বার প্রচার হয়েছিল। আসলে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রায় পুরো জাতি অংশগ্রহণ করেছিলো। তাই এটা ছিল একটা জাতীয় জনযুদ্ধ। কিছু চিহ্নিত বিশ্বাসঘাতক ছাড়া দল-মত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এদেশের মানুষ সেই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন।

লেখক : ভাইস-চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল

এই পাতার আরো খবর -
font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
সংবিধানের আরেকটি সংশোধনী ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে না। নাগরিক ঐক্যের সভায় ড. কামালের এই বক্তব্য আপনি সমর্থন করেন?
5 + 6 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
এপ্রিল - ৯
ফজর৪:২৬
যোহর১২:০১
আসর৪:৩১
মাগরিব৬:২১
এশা৭:৩৫
সূর্যোদয় - ৫:৪৩সূর্যাস্ত - ০৬:১৬
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :