The Daily Ittefaq
ঢাকা, শুক্রবার ১৪ ডিসেম্বর ২০১২, ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪১৯, ২৮ মহররম ১৪৩৪

হেমাঙ্গ বিশ্বাস

গণ-সংস্কৃতির পতাকাবাহক

হেমাঙ্গ বিশ্বাস, কবীর চৌধুরী ও খান সারওয়ার মুরশিদ—শিক্ষা-সংস্কৃতির অঙ্গনে তিন প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। ঘটনাক্রমে এই তিন জন জন্ম-মৃত্যুসূত্রে ডিসেম্বরের এই সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। এবারের আয়োজনে কীর্তিমান এই তিন বাঙালিকে স্মরণ করে রয়েছে তিনটি প্রবন্ধ। সঙ্গে '১৫তম দ্বিবার্ষিক এশীয় চারুকলা প্রদর্শনী-২০১২' নিয়ে রয়েছে একটি পর্যালোচনামূলক রচনা

মহসিন শস্ত্রপাণি

উপমহাদেশের জনগণের নতুন সাংস্কৃতিক আন্দোলনের এক আজীবন লড়াকু হেমাঙ্গ বিশ্বাস। জন্ম ১৯১২ সালের ১৪ ডিসেম্বর হবিগঞ্জের মীরাশি গ্রামে। অগ্রহায়ণ ছিল তাঁর প্রিয় মাস। এই মাসে-ই তাঁর জন্ম, বিয়েও। তাঁর চেয়ে বড় কথা অগ্রহায়ণে কৃষকের উঠোনে ওঠে সোনালি ধান। রাতদিন পরিশ্রম শেষে ফুটে ওঠে তাদের মুখে এক চুকরো হাসি। কৃষক-শ্রমিকের আর সব খেটে-খাওয়া মানুষের জীবন-সংগ্রামের অকৃত্রিম বন্ধু হেমাঙ্গ বিশ্বাসের কাছে সেই এক টুকরো হাসিফোটা মাস—অগ্রহায়ণ তো প্রিয় হবেই। ঘটনাক্রমে তিনি শেষ নিঃশ্বাসও ত্যাগ করেন এই অগ্রহায়ণেরই ৫ তারিখে।

তিনি বাল্যকাল থেকেই ছিলেন সংগীতপ্রিয়। তবে কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর থেকেই তিনি পালন করেছেন সক্রিয় সংগঠকের ভূমিকা। সংগীত রচনা, সুর দেওয়া এবং গাওয়া—এ সবই করেছেন নতুন সাংস্কৃতিক আন্দোলনের তাগিদ থেকেই। তিরিশ-চল্লিশ দশকের 'গণনাট্য আন্দোলন' ও 'গণনাট্য সংঘ' প্রতিষ্ঠা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না—ছিল না কেবলমাত্র লেখক-শিল্পীদের বিচ্ছিন্ন কোনো আন্দোলন-প্রয়াসও। সে আন্দোলন ছিল নবচেতনায় জাগ্রত ও উদ্বেল জনগণের রাজনৈতিক সংগ্রামেরই অনুবর্তী। কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে পরিচালিত শ্রমিক-শ্রেণী ও জনগণের সংগ্রামই জন্ম দিয়েছিল 'গণনাট্য আন্দোলন'।

সংগীত ইতিহাসের নবীন এক ধারার নাম 'গণসংগীত'। এ ধারার উদ্ভব ব্যক্তি বিশেষের একক সুর সাধনার ফল হিসেবে নয়—সম্মিলিত সংগ্রামের সাংস্কৃতিক অর্জন হিসেবে। আমরা একথা যখন বলি তখন ব্যক্তিবিশেষের সাধনা ও অবদান খাটো করে দেখি না মোটেও। আমাদের স্মরণ রাখতেই হয় যে, কোনো ব্যক্তির একার পক্ষে বড় তেমন কিছুই করা সম্ভব নয়। এমনকি নিভৃতে রচনা করা বা সুরসাধনাও একা একা সম্ভব নয়—যদি পরিপার্শ্বের সহযোগিতা না থাকে। সৃজনে-নির্মাণে সংগ্রামে ব্যক্তি সবসময় সম্মিলিত শক্তির অংশ। সেই সমষ্টির মধ্যে অল্প কয়েকজনের ভূমিকা ও অবদান অনেক বেশি হতে পারে—হয়ও। সেই ব্যক্তিবর্গ ইতিহাস সৃষ্টিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন যুদ্ধের সেনাপতির মতো। এই ব্যক্তিবর্গ আলোর শিখার মতো ঘটনাধারার শীর্ষে উদ্ভাসিত হন, ইতিহাসে স্মরণীয় হন, অন্যদের কাছে সমকালে এবং পরবর্তী কালপরম্পরায় অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে মর্যাদা লাভ করে। এই ব্যক্তিবর্গের মধ্যে আবার একজন বা কয়েকজন উদ্ভাসিত হন অন্যদের চেয়ে অনেক অধিক দীপ্তিতে। তার পরও শেষ কথায়—তিনি বা তাঁরা সমষ্টিরই অংশ।

গণসংগীত জনগণের সম্পদ। জনগণের সংগ্রামের মধ্য দিয়েই তার উদ্ভব—জনগণের প্রযত্ন ও পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া তার বিকাশ ও সমৃদ্ধি কোনোমতেই সম্ভব নয়। সে কারণে নিষ্ঠার সঙ্গে, একাগ্রতার সঙ্গে জনগণের সেবা করাই প্রেম-প্রীতি-ভালোবাসায়, শোক-তাপ ও আনন্দ-উত্সবে এবং স্বদেশে ও বিশ্বব্যাপী নৈকট্য ও সহমর্মিতা সৃষ্টিতে জনগণের নিত্য, সঙ্গী বলেই তার নাম-পরিচয় গণসংগীত। তার বিষয় যেমন ব্যাপক ও বিস্তৃত, তেমনি তার সুরের আত্তীকরণে তার কোনো দ্বিধা-সংকোচ নেই, বাঁধা নেই। জনগণের সমাজ বদলের সংগ্রামের ভাবাদর্শই তার প্রাণশক্তি—অনেকটা যুদ্ধ-সংগীতের মতো। জনগণের চেতনলোকে উদ্দীপনা সঞ্চার করা, ব্যর্থতা কিংবা বিপর্যয়ের গ্লানি থেকে চেতনামুক্ত করে পুনরায় সংগ্রাম গড়ে তুলতে সাহস জোগান দেওয়া এবং ভবিষ্যতের ছবিটা উজ্জ্বলতর করা এই সংগীতধারার চারিত্র-বৈশিষ্ট্য।

এই উপমহাদেশে ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে জাতীয় নিপীড়ন ও অবমাননা, শ্রেণিশোষণ, বঞ্চনা ও উত্পীড়নমূলক ব্যবস্থা উচ্ছেদের লক্ষ্যে পরিচালিত জনগণের সংগ্রাম যে মানসিক চাহিদা সৃষ্টি করেছিল সেই চাহিদা পূরণ করতেই গণসংগীতের জন্ম। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে একইভাবে জবরদস্তি পেছনে ঠেলে রাখা মেহনতকারী জনগণের চেতনায় পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, ক্রোধ ও প্রতিবাদ রূপ পেয়েছে এমন প্রকৃতির সংগীতে। সে কারণেই যত দিন এই সংগ্রাম জারি আছে অর্থাত্ সাম্রাজ্যবাদের শোষণ ও নিয়ন্ত্রণ এবং শ্রেণীশোষণ, বঞ্চনা ও উত্পীড়নের ব্যবস্থা যতদিন সম্পূর্ণ উচ্ছেদ না হচ্ছে, ততদিন গণসংগীত ঠিকে থাকবে। তারপর নতুন সমাজে এর রূপ বদলাবে কিন্তু এই সংগীতধারা অচিরেই নিঃশেষ হয়ে যাবে—এমন কথা মূর্খরা আর সাম্রাজ্যবাদের ও দেশীয় শোষকশ্রেণীর সেবাদাসেরাই ভাবতে ও বলতে পারে। সে শিক্ষা আমরা হেমাঙ্গ বিশ্বাসের জীবন, সৃষ্টি ও সংগ্রামের ইতিহাস থেকেই পেয়েছি।

হেমাঙ্গ বিশ্বাস ছিলেন গীতিকার, সুরকার ও গায়ক। এমন তিন সত্তার সম্মিলন এক ব্যক্তিতে খুব কমই দেখা যায়। এর অতিরিক্ত ছিলেন তিনি সংগীত-তাত্ত্বিক ও সংগঠক। এর পরও লেখালেখিতে তিনি সার্থকতার স্বাক্ষর রেখেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা:

১. বিষাণ [গানের সংকলন], ১৯৪৩

২. চীন দেখে এলাম, ১৯৫৯ (?)

৩. সীমান্ত প্রহরী [কবিতা], ১৯৬১

৪. কুল খুরার চোতাল, [অসমিয়া কাব্যগ্রন্থ], ১৯৭০

৫. শঙ্খচিলের গান [গান ও স্বরলিপি সংকলন], ১৯৭৫

৬. আবার চীন দেখে এলাম, ১৯৭৫

৭. আকৌ চীন চাই আহিলোঁ [অসমিয়া ভাষায়], ১৯৭৫ প্রথম খণ্ড, ১৯৭৭ দ্বিতীয় খণ্ড

৮. লোকসঙ্গীত সমীক্ষা :বাংলা ও আসাম, ১৯৭৮

৯. হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গান, ১৯৮০

১০. চীন থেকে ফিরে (?)

১১. জীবনশিল্পী জ্যোতিপ্রকাশ [অসমিয়া], ১৯৮৩

তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়েছে তাঁর রচনা, আলোচনা ও সাক্ষাত্কার প্রভৃতি নিয়ে দুটি গ্রন্থ—

১. উজান গাঙ বাইয়া ও ২. গানের বাহিরানা। গ্রন্থগুলো সম্পাদনা করেছেন তাঁর ছেলে মৈনাক বিশ্বাস।

তিনি সংগীত পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন উত্পল দত্তের 'কল্লোল' ও 'তীর' নাটকের। এ ছাড়া তিনি 'লাল লণ্ঠন', 'রাইফেল', 'তেলেঙ্গানা' প্রভৃতি নাটকের গীতিকার ও সুরকার ছিলেন। সংগীত পরিচালনা করেছেন 'লালন ফকীর' চলচ্চিত্রে। এই চলচ্চিত্রে তাঁর সুরে গান গেয়ে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পেয়েছেন হেমন্ত মুখার্জী। তাঁর রচনায় ও সুরে এবং গায়কী ঢঙে বাংলা গণসংগীত নতুন মাত্রা লাভ করেছে। লোকসংগীতের সুর ও গায়কী ঢঙ তিনি গণসংগীতে ব্যবহার করেছেন সার্থকভাবে। তিনি নিজে কেবল সংগীত রচনা করেছেন, সুর দিয়েছেন ও গেয়েছেন তা-ই নয়—অসংখ্য শিল্পীকে তিনি সংগঠিত করছেন—টেনে এনেছেন জনগণের সংগ্রামের কাতারে। তাদের অনেকে আবার সংগীতসত্তা পণ্য করে বাজারে তুলেছেন। কিন্তু হেমাঙ্গ বিশ্বাস অটল দাঁড়িয়ে থেকেছেন জনগণের পক্ষে। তাঁর সংগীতসত্তা পণ্য করেননি কখনো। সুবিধাবাদের জোয়ারে সঙ্গী-সাথীরা প্রায় সবাই ভেসে গেলে তিনি কিছুটা নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিলেন ঠিকই কিন্তু মেহনতি মানুষের ডাকে সাড়া দিতে দ্বিধা করেননি এবং জনগণের সংগ্রামের বিজয়-অভিযাত্রায় তাঁর মনে সংশয় জাগেনি মোটেও।

উপমহাদেশে কমিউনিস্ট আন্দোলনে যতসব গর্ব করার মতো সাফল্যের এবং অনুসরণ করার মতো দৃষ্টান্তের স্মারক বা প্রতীক নির্মিত হয়েছে তার মধ্যে উজ্জ্বল একটি হেমাঙ্গ বিশ্বাস। তিনি ছিলেন উপমহাদেশের জনগণের সংগ্রামের সন্তান। জনগণের সংগ্রাম তাঁকে জন্ম দিয়েছে, লালিত ও বিকশিত করেছে। জনগণ তাদের এ মহান সন্তানকে গর্বের সঙ্গে স্মরণ করবে যত দিন তাদের স্মৃতি জাগ্রত থাকবে। পরম যত্নে সংরক্ষণ ও চর্চা করবে তাঁর অক্ষয় কীর্তি। বর্তমানে বাংলাদেশে তাঁর গান ছাড়া কোনো 'গণসংগীত'-এর অনুষ্ঠান ভাবা-ই যায় না।

আমরা যারা হেমাঙ্গ বিশ্বাসকে মুখোমুখি দেখার, কথা বলার ও তাঁর কণ্ঠ হতে গান শোনার সুযোগ পেয়েছি, তাদের চেতনায় এই মহান সংগীত ও জীবন-শিল্পীর স্মৃতি অম্লান।

'আরো বসন্ত, বহু বসন্ত তোমার নামে আসুক...'

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
সংবিধানের আরেকটি সংশোধনী ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে না। নাগরিক ঐক্যের সভায় ড. কামালের এই বক্তব্য আপনি সমর্থন করেন?
5 + 1 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
ফেব্রুয়ারী - ২৩
ফজর৫:১০
যোহর১২:১৩
আসর৪:২১
মাগরিব৬:০১
এশা৭:১৪
সূর্যোদয় - ৬:২৬সূর্যাস্ত - ০৫:৫৬
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :