The Daily Ittefaq
ঢাকা, শুক্রবার ১৪ ডিসেম্বর ২০১২, ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪১৯, ২৮ মহররম ১৪৩৪

স্মরণ

কবীর চৌধুরী তোমার নিমন্ত্রণ লোকে লোকে

সফিউদ্দিন আহমদ

কবীর চৌধুরী প্রসঙ্গে প্রথমেই মনে পড়ে সক্রেটিসের জীবনের একটি ঘটনা—আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগের ঘটনা। সেদিন এথেন্সের জনাকীর্ণ আদালতে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে মহান দার্শনিক সক্রেটিস বিচারক এবং উপস্থিত জনতার সামনে দ্বিধাহীনকণ্ঠে ঘোষণা করলেন—'জীবন মহত্ কাজের জন্য এবং মহত্ কাজের উদ্দেশ্য থাকলে কোনও একজন মানুষের কাছে জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন বড় নয়—তাকে শুধু ভাবতে হবে এবং দেখতে হবে স্বীয়কার্য সাধনে সে কোথাও কোনও অন্যায় বা অবিচার করেছে কি না এবং আরও দেখতে হবে, সে সত্যের সন্ধানে অনুসন্ধিত্সু ছিল কি না। তাছাড়া সে এ পৃথিবী ও মানব সমাজে বাস করতে গিয়ে মহত্ কিংবা হীন—কোনও মানুষের ভূমিকা সে পালন করেছে।'

কবীর চৌধুরীর জ্ঞান সাধনা প্রসঙ্গে আমার মনে পড়ছে জার্মানপণ্ডিত ও দার্শিক সি. পি. লিসেনিং-এর সৌন্দর্যতত্ত্বের ওপর মহত্ গ্রন্থ Lacoon-এর একটি উদ্ধৃতি— বিধাতা যদি জিজ্ঞাসা করেন ডান হাতে অনন্ত সত্যের পূর্ণজ্ঞানের ভাণ্ড, বাম হাতে আছে সত্য সন্ধানের জন্য অনন্ত প্রয়াসের দুঃখ—বল তুমি প্রসন্ন চিত্তে কোনটিকে বরণ করে নেবে? তাহলে আমি অবনত মস্তকে সবিনয়ে বিধাতার কাছে আত্মনিবেদন করে বাম হাতের কথাই প্রার্থনা করে বলব—'হে বিধাতা প্রমাদহীন পরিপূর্ণ জ্ঞান একমাত্র তোমারই জন্য'।

এই উক্তির বাস্তবতা আমরা দেখতে পাই কবীর চৌধুরীর জীবনে। কবীর চৌধুরী পড়তেন, শিখতেন এবং জানতেন। আমি মাঝে-মধ্যে বলতাম—'স্যার আপনি এত পরিশ্রম করেন কেন?' তিনি হাসতে হাসতে বলতেন, 'কী করি বল, বয়স হয়েছে আগের মতো ভালো ঘুম হয় না—। সময় তো কাটে না—। তাই বই পড়ি ও শিখি।' লেখার মান নিয়ে আমি প্রশ্ন তুলতাম। তিনি হাসতে হাসতে উত্তর দিতেন—'আমি তো লেখার মান নিয়ে ভাবিনি।'

জ্ঞানপিপাসু এ যুগের প্রমিথিউস কবীর চৌধুরী ১৩ ডিসেম্বর ২০১১ ভোর পাঁচটায় পরলোক গমন করেন। তার পরিবার থেকে প্রথমে আমাকে জানাতে ইতস্তত করছিল। কারণ, আমার হূদরোগ এবং বাইপাস সার্জারি হয়েছে। ছাত্রজীবন থেকেই কবীর চৌধুরী ও মুনীর চৌধুরী স্যারের পরিবারের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ট সম্পর্ক। এ ছাড়া কবীর স্যার, মুনীর স্যারের বোন ফেরদৌসী এবং কবীর স্যারের বড় মেয়ে অধ্যাপক শাহীন কবীরের সঙ্গে আমার গভীর বন্ধুত্ব।

তিনি আমার প্রকাশিত লেখা নিয়ে খুব উত্সাহ প্রকাশ করতেন, প্রত্যেকটি বইয়ের সমালোচনা লিখে তিনি পত্রিকায় পাঠাতেন। প্রতিনিয়তই তিনি আমার স্ত্রী ও ছেলে-মেয়ের ঘন ঘন খোঁজ নিতেন। আমার প্রতি তাঁর আন্তরিকতার নিদর্শন হিসেবে তার প্রবন্ধসংগ্রহ দ্বিতীয় খণ্ড, বিশ্ব সাহিত্যের ওপর ঢাউস দুইখণ্ড আমার নামে উত্সর্গ করেন। তাকে স্মরণ করেই আমার এই লেখা। দার্শনিকেরা সাধারণ মানুষের সঙ্গে পরিচিত নন। কারণ তাদের দার্শনিক তত্ত্ব সাধারণ মানুষ বোঝে না। অথচ বিশ্বের তাবত্ মানুষের কাছে সক্রেটিস পরিচিত। দর্শনকে তিনি যেমন লোকজীবনের নৈকট্য দিয়েছেন তেমনি সাধারণ মানুষের কাছে তিনি নেমে এসেছেন। তাই সেদিন তিনি এথেন্সের জনাকীর্ণ আদালতে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, 'একজন মানুষের কাছে জীবন মৃত্যুর প্রশ্ন বড় নয়, তাকে শুধু দেখতে হবে, স্বীয়কার্য সাধনে সে কোনও অন্যায় বা অসত্যের আশ্রয় নিয়েছে কি না এবং সে মহত্ কিংবা হীন কোনও জীবন যাপন করেছে কি না'।

কবীর চৌধুরী বেড়ে উঠেছেন এক উচ্চশিক্ষিত ও অভিজাত পরিবারে। প্রাচুর্যে ও ঐশ্বর্যে, জাত্যাভিমান ও শিক্ষায় এই পরিবার ও জনতার মধ্যে ছিল বিস্তর ব্যবধান। কিন্তু এই ঠুনকো জাত্যাভিমান সামন্ত মানসিকতার বৃত্ত ভেঙ্গে সাধারণ্যে নেমে এলেন কবীর চৌধুরীর অনুজ মুনীর চৌধুরী ও অনুজা নাদিরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি অনার্স ও মাস্টার্সের কৃতী ছাত্র। পরবর্তীকালে ফুলব্রাইট বৃত্তি নিয়ে আমেরিকার মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ে মার্কিন সাহিত্যে ডিগ্রি এবং সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে লোকপ্রশাসনে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষক ও প্রশাসনিক হিসেবে তিনি নন্দিত। তাঁর প্রকাশিত সাহিত্যকর্মের দিকে তাকালে আমরা বিস্ময় ও বিমুগ্ধতায় উচ্চকিত হই একজনের জীবনের পক্ষে এতো অভিনব ও বৈচিত্র্যময় সৃষ্টি সম্ভব? বিদেশি সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ ভাবসম্পদ বাংলা ভাষায় অনুবাদ করে আমাদের সাহিত্যকে তিনি যেমন ঋদ্ধ করেছেন তেমনি বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ ভাবসম্পদ বিদেশি ভাষায় অনুবাদ করে বাংলার বাণীকে তিনি বিশ্বের বাণী করেছেন, বাঙালির চিত্ত দুয়ারকে সমগ্র বিশ্বের কাছে খুলে দিয়ে আমাদের আসন সেখানে পোক্ত করেছেন। তাই কবীর চৌধুরী বাঙালি হয়েও বিশ্বমানব এবং আমাদের গর্ব ও অহংকার।

কবীর চৌধুরী যে কারণে গণহূদয় নন্দিত—তা হল তিনি একজন সংগ্রামী পুরুষ এবং অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে রয়েছে তাঁর সংগ্রামী ভূমিকা। এখানে তাঁর বিবেকী কণ্ঠ প্রতিবাদে সোচ্চার। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে যে সাহিত্যিক ও শিল্পী প্রতিবাদে সোচ্চার হয় না আমরা তাকে প্রকৃত ও দেশপ্রেমিক সাহিত্যিক বলব না। একজন শিল্পী বা সাহিত্যিক পোষা বাঘ, সার্কাসের বাঘ নয়—তিনি সত্য কথা বলবেন এবং তার মৌলবাণী হবে—execution of truth। বলনে ও চলনে এবং বক্তব্যে ও বাণীবিন্যাসে সনেটের মতো একটি সংযমিত ও পরিমিত ভাবমণ্ডল নিয়ে কবীর চৌধুরী ঔজ্জ্বল্যে ভাস্বর। অভিজ্ঞ ও প্রজ্ঞায় তিনি যেমন বোধিসত্তাবান ও স্থিতধী পুরুষ তেমনি জাতিসত্তার উত্সারণে তিনি শিকড় সন্ধানী। একদিকে অন্যায়-অত্যাচার ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে অটল ও অবিচল, অন্যদিকে তিনি জ্ঞানালোকের পিপাসায় প্রমুক্ত প্রমিথিউস। তাঁর এক হাতে আছে জ্ঞানের মশাল আর অন্য হাতে আছে প্রগতির পতাকা। এই মশালের আলো আর পতাকা আমাদের পথ দেখাবে এবং আমরা সামনে যাবই। অতএব মাভৈঃ। আজ তার মহাপ্রয়াণে তার প্রতি আমার বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করে উচ্চারণ করছি—

তোমার নিমন্ত্রণ হোক

লোকে লোকে

আলোকে আলোকে।

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
সংবিধানের আরেকটি সংশোধনী ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে না। নাগরিক ঐক্যের সভায় ড. কামালের এই বক্তব্য আপনি সমর্থন করেন?
8 + 1 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
ফেব্রুয়ারী - ২৩
ফজর৫:১০
যোহর১২:১৩
আসর৪:২১
মাগরিব৬:০১
এশা৭:১৪
সূর্যোদয় - ৬:২৬সূর্যাস্ত - ০৫:৫৬
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :