The Daily Ittefaq
ঢাকা, শুক্রবার ১৪ ডিসেম্বর ২০১২, ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪১৯, ২৮ মহররম ১৪৩৪

শ্রদ্ধাঞ্জলি

খান সারওয়ার মুরশিদ এক কর্মময় জীবন-আখ্যান

নুরুল করিম নাসিম

মৃত্যু অমোঘ এবং অনিবার্য; তার পরও আমাদের মতো খুব সাধারণ ও অসহায় মানুষেরা প্রিয় মানুষদের প্রয়াণ সহজভাবে গ্রহণ করতে পারে না। এমন কোনো সখ্য ছিল না খান সারওয়ার মুরশিদ স্যারের সঙ্গে আমার। তবু কী এক মুগ্ধতা তৈরি হয়েছিল আমার—তাঁর ব্যক্তিত্ব, লেখা ও বক্তৃতা ঘিরে।

চিন্তা ও চেতনায় নিজের কালের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিলেন তিনি। বই পড়তে ভালোবাসতেন। তাঁর ব্যক্তিগত পাঠগারটি বিচিত্র সব বইয়ের সংগ্রহশালা। তিনি একজন সফল সম্পাদকও ছিলেন। তাঁর বক্তৃতা শুনতে শুনতে ছাত্ররা এক ঘোরের ভেতর চলে যেত। ছাত্রদের চোখের সামনে উম্মোচিত হতো এক অপরূপ পৃথিবী। ছাত্রদের প্রতি তিনি ছিলেন সহূদয়, বন্ধুবত্সল ও প্রীতিময়।

মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ করেছিলেন। প্রবাসে মুজিবনগর সরকারের পরিকল্পনা বিভাগের সদস্য ছিলেন। বাংলাদেশের প্রথম শাসনতন্ত্রের ইংরেজি ভার্সন তাঁর রচনা। দেশ ও জনগণের প্রতি ছিল প্রবল আবেগ ও অগাধ ভালোবাসা। ছিলেন ভদ্র ও বিনয়ী।

দীর্ঘ ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি প্রজ্ঞা ও মনীষার স্বাক্ষর রেখেছেন শিক্ষাক্ষেত্রে। তাঁর রুচিবোধে ছিল এমন স্বাতন্ত্র্য, যার ছোঁয়ায় আমাদের চিন্তার জগত নানাভাবে ঋদ্ধ হয়েছে। তিন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। ইংল্যান্ডের নটিংহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করেন। পরে উচ্চতর গবেষণা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে।

১৯৫১ সালে প্রতিষ্ঠা করেন প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী 'সংস্কৃতি সংসদ'; ছিলেন ওই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা-সভাপতিও। পাকিস্তান লেখক সংঘের পূর্বাঞ্চল শাখার তিনি সম্পাদক ছিলেন। ভাষা আন্দোলনে রেখেছেন সক্রিয় ভূমিকা। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র-জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনব কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৫ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করার সময় তাঁর নেতৃত্বেই শুরু হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন প্রবর্তনের প্রস্তাবনা ও অবকাঠামো তৈরির প্রক্রিয়া। তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা আন্দোলনের অন্যতম নীতিনির্ধারক ও পরিকল্পনাকারী। আইয়ুব খানের সঙ্গে গোলটেবিল বৈঠকে বঙ্গবন্ধুর অন্যতম সহযোগী হিসেবে তিনি উপস্থিত থাকতেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের একজন সদস্য হিসেবে তাঁর ভূমিকা ছিল উজ্জ্বল।

ছিলেন ভালো প্রশাসকও। কূটনীতিক হিসেবেও সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছিলেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি উপাচার্য হিসেবে এক অনন্য ভূমিকা রেখেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য থাকাকালে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ। একজন উপাচার্যের মধ্যে যত গুণের সন্নিবেশ থাকা সম্ভব, তার সব-ই তাঁর ছিল। এ প্রসঙ্গে গোলাম মুরশিদের মূল্যায়ণ প্রণিধানযোগ্য—'খান সারওয়ার মুরশিদ সত্যিকার একজন যোগ্য আত্মমর্যাদাসম্পন্ন উপাচার্য কী করতে পারেন, তার দৃষ্টান্ত রেখেছিলেন।' উপাচার্য থাকাকালীন তাঁর ডাক পড়ে দেশের বাইরে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালনের। চলে যান পোল্যান্ডে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হয়ে। একই সময় পালন করেছেন হাঙ্গেরির রাষ্ট্রদূতের দায়িত্বও। ছিলেন কমনওয়েলথের সহকারী মহাসচিব। দেশে ফিরে ১৯৮৩ সালে যোগ দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য শহীদ জননী জাহানারা ইমামের গঠিত 'গণতদন্ত কমিশন'-এর সদস্য ছিলেন তিনি। কেবল শিক্ষা ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে যে তিনি সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন তা-ই নয়, দেশ-জাতির কল্যাণে ২০০১ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

তাঁর লেখা একমাত্র বই 'কালের কথা'। এ ছাড়া বাংলা সাহিত্য নিয়ে তিনি দুটি পাণ্ডিত্যপূর্ণ সেমিনারের আয়োজন করেছিলেন। ওই দুই সেমিনারের ওপর ভিত্তি করে তিনি দুটি সংকলনও সম্পাদনা করেন। ১৯৪৯ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৬ বছর 'নিউভ্যালুজ' পত্রিকাটি সফলতার সাথে সম্পাদনা করেছেন। শুধু সম্পাদনা নয়, সফল ও জনপ্রিয় শিক্ষকও ছিলেন। 'নিউ ভ্যাল্যুজ' সম্পাদনার ১৭ বছরে সাহিত্য-সংস্কৃতি ছাড়াও সমকালীন বহু সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে তিনি ইংরেজি প্রবন্ধ লিখেছেন। ১৯৯৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের ৭৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে শিক্ষা ও গবেষণায় অসামান্য অবদানের জন্য তাঁকে আজীবন সম্মাননা দেওয়া হয়। তিনি বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার (২০১১), জাহানারা ইমাম স্মৃতিপদক (২০০৬) ও কণ্ঠশীলন পুরস্কারে (২০০৮) ভূষিত হন।

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
সংবিধানের আরেকটি সংশোধনী ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে না। নাগরিক ঐক্যের সভায় ড. কামালের এই বক্তব্য আপনি সমর্থন করেন?
4 + 4 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
ফেব্রুয়ারী - ২৩
ফজর৫:১০
যোহর১২:১৩
আসর৪:২১
মাগরিব৬:০১
এশা৭:১৪
সূর্যোদয় - ৬:২৬সূর্যাস্ত - ০৫:৫৬
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :