The Daily Ittefaq
ঢাকা, শুক্রবার ১৪ ডিসেম্বর ২০১২, ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪১৯, ২৮ মহররম ১৪৩৪

প্রদর্শনী

রঘু রাইয়ের ক্যামেরায় একাত্তর

দীপঙ্কর দীপু

দীর্ঘ চল্লিশ বছর আলোকচিত্রের নেগেটিভগুলো খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রামাণ্য দলিলগুলো ছিল এত দিন লোকচক্ষুর অন্তরালে। সম্প্রতি সেই সব ঐতিহাসিক নেগেটিভের কিছু অংশ অনেক চেষ্টায় খুঁজে পাওয়া গেছে। আর ওই সব নেগেটিভ থেকে বাছাই করা ৫১টি ছবি নিয়ে এক প্রদর্শনী চলছে ঢাকার ধানমন্ডির বেঙ্গল গ্যালারিতে। 'বাংলাদেশ : দ্য প্রাইস অব ফ্রিডম' শিরোনামে এ প্রদর্শনীর ছবিগুলো ক্যামেরাবন্দী করেছিলেন এ সময়ের বিশ্বখ্যাত ভারতীয় আলোকচিত্রী রঘু রাই। একাত্তরে তিনি ছিলেন আটাশ বছরের টগবগে তরুণ। তত্কালীন 'দ্য স্টেটসম্যান' পত্রিকার আলোকচিত্রী হিসেবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ছবি কাভার করতে আসেন। সে সময়ে তিনি প্রায় ৫-৬ মাস ভারতের বিভিন্ন শরণার্থীশিবিরে বাংলাদেশের রণাঙ্গনসহ নানা জায়গার ছবি তুলেছিলেন।

প্রদর্শনীকক্ষে ঢুকেই ছোট্ট গ্যালারিতে চোখে পড়বে শরণার্থীশিবিরের মানুষের কষ্টের স্থিরচিত্র। এরপর বড় কক্ষের গ্যালারিতে যুদ্ধের নানা পর্যায়ের ছবি দেখা যাবে—শরণার্থীশিবির, মানুষের অমানবিক কষ্ট, দেশপ্রেম, রণাঙ্গনের ছবি, বিজয়োল্লাস আর চূড়ান্ত জয়ের পর মানুষের ঘরে ফেরার দৃশ্য। গ্যালারিতে ঢুকেই হাতের বাঁ দিকে চোখে পড়বে দু-পাশে সারি সারি কংক্রিটের বড় বড় পাইপের মাঝখানে অনাদরে শুয়ে থাকা নির্লিপ্ত এক নগ্নশিশু। পাইপগুলোর ভেতরে মানুষ যে বসবাস করছে, তার চিহ্ন পরিলক্ষিত হবে। বিজয়ের মাসে এ ধরনের প্রদর্শনীর জন্য প্রারম্ভিক ছবি হিসেবে তিনটি ছবি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তী ছবিগুলোয় দেখা যাবে শরণার্থীশিবিরের দিকে এগোতে থাকা মানুষের মিছিল। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মানুষ নিজের সহায়-সম্বল যতটুকু পারে তা নিয়ে ছুটে চলেছে অনিশ্চয়তার দিকে। এ রকম নানা ছবি ফুটে উঠেছে প্রদর্শনীতে। বৃদ্ধা মাসহ সপরিবারে শরণার্থীশিবিরের দিকে যাওয়ার পথে রঘু রাইয়ের ক্যামেরায় বন্দী হয় একটি পরিবার।

প্রদর্শনীর সব ছবিই সাদাকালো। প্রিন্টের আকার নানা ধরনের। তবে অধিকাংশ ছবিই ২০ ইঞ্চি বাই ৩০ ইঞ্চি কিংবা তারও অধিক। ছবিগুলো দেখতে দেখতে মনের ভেতর এ ধারণা জন্মাতেই পারে যে—সেই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে আপনি যাচ্ছেন। শরণার্থীশিবিরের সারি সারি খড়ের তৈরি ঘরগুলোর পাশে দাঁড়ানো মানুষের নির্মোহ দৃষ্টি বিবেককে নাড়া দেবে। কোনো ছবি যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত সেতু, ঘরবাড়ি, যানবাহন যুদ্ধের ভয়াবহতাকে তুলে ধরে। একটি ছবিতে দেখা যায় একজন নারী ও তার পরিবারের অন্যরা পুড়ে যাওয়া ঘর থেকে অবশিষ্ট কিছু আছে কি না, খুঁজছে। ছোট্ট ট্রাকের ওপর মানুষ আর মালামাল একাকার হয়ে ছুটছে শরণার্থীশিবিরের দিকে। আলোকচিত্রী রঘু রাই বেশ সাবলীলভাবে শরণার্থীশিবির, যুদ্ধক্ষেত্রের প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরেছেন। কর্দমাক্ত পথে সারি সারি দেশান্তরিত মানুষের মিছিল, আশ্রয়ের খোঁজে ন্যূব্জ দেহে বৃদ্ধা-বৃদ্ধের অজানা গন্তব্যে পাড়ি জমানো, শরণার্থীশিবিরের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের মাঝেই চলছে রান্না-বান্না, খোলা আকাশের নিচে বেঁচে থাকার নিরন্তর সংগ্রামের চিত্র দেখা যায় ছবিগুলোতে। একটি ছবি কিছুক্ষণের জন্য হলেও দর্শকদের ভাবিয়ে তোলে। শরণার্থীশিবিরে অবস্থানরত এক কিশোরী সাদা খাদির শাড়ি পরে হাঁড়ি-পাতিল, কলসি, ঘটি-বাটির একপাশে শুয়ে আছে হাতের তালুর ওপর। তার দৃষ্টি উন্মুক্ত কিন্তু উদ্দেশ্যহীন। ভাবলেশহীন সেই দৃষ্টিভঙ্গি দেখে হঠাত্-ই তাকে ঘরের বাসনপত্রের সঙ্গে প্রথম দর্শনেই একাকার করার একটা ভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। যুদ্ধের এত কষ্ট, জীবনের এত বেদনার পর মানুষ নিজের অস্তিত্বের প্রশ্নেও সংশয়চিত্ত হয়ে ওঠে!

অন্য একটি ছবিতে বিশাল পাইপ লাইনের ভেতর এক মধ্যবয়সী মানুষের পোর্ট্রেট। টপ অ্যাঙ্গেল থেকে তোলা ছবিতে মধ্যবয়সী মানুষের চোখের অবস্থান আলোকচিত্রের নিয়মমতে এক-তৃতীয়াংশ বরাবর। আর সেই চোখের শার্পনেস, অভিব্যক্তি চোখে পড়ার মতো। চোখজোড়ার মধ্যে রয়েছে বিষণ্নতা, হতাশা আর প্রতিবাদের মিশ্ররূপ।

প্রদর্শনীতে ক্লোজ পোর্ট্রেটের ছবিগুলো আবেগঘন পরিবেশের অবতারণা করে। বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, ক্রন্দনরত শিশুর ছল-ছল চোখের চাউনি দর্শককে টেনে নিয়ে যায় ভয়াল একাত্তরের দিনগুলোয়। দৃষ্টিতে সকরুণ অনিশ্চয়তার প্রতিবিম্ব সুস্পষ্ট। ভবিষ্যত্ যেন ক্যামেরার ভাষার মতো আউট অব ফোকাস; বড়ই ঘোলাটে আর অস্পষ্ট। চোখ যেন বারবার ভেসে যায় বেদনার জলে।

প্রদর্শিত ছবিগুলো নৈতিকতার দিক থেকে সত্যরূপে উপস্থাপনের নিরিখে আর রাজনৈতিকভাবে প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতার বিবেচনায় ইথিক্যালি ইভ্যালুয়েটিভ ফটোগ্রাফের আওতায় ফেলা যায়। অন্যদিকে নির্দিষ্ট সময়, স্থান ও তথ্যের উত্স হিসেবে ফটোসাংবাদিকতার বিচারে আর সমাজবিজ্ঞানের নানা বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য দেওয়ার সক্ষমতার দিক থেকে এগুলোকে আবার এক্সপ্ল্যানেটরি ফটোগ্রাফের অন্তর্ভুক্ত করা যায়।

প্রদর্শনীর সংবাদ সম্মেলনে রঘু রাই বলেন, 'দ্য স্টেটসম্যান' পত্রিকার পক্ষ থেকে তাঁকে সীমান্তবর্তী এলাকার যুদ্ধপরিস্থিতির ছবি তুলতে পাঠানো হয়। সেখানে তিনি মূলত নারী ও শিশুদের ছবি বেশি তোলেন। তাদের দুঃখ-দুর্দশা দেখে এক সময় নিজেই পাগলপ্রায় হয়ে পড়েন। নিজের মনেই প্রশ্ন ভেসে ওঠে, এভাবে কি মানুষ বেঁচে থাকতে পারে?

আলোকচিত্রী রঘু রাইয়ের জন্ম ১৯৪২ সালে। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনা করার পর ১৯৬০ সালে মাত্র ২৩ বছর বয়সে আলোকচিত্রী হিসেবে কাজ শুরু করেন। তিনি ১৯৬৬ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত 'দ্য স্টেটসম্যান' পত্রিকায় চিফ ফটোগ্রাফার এবং ১৯৭৭ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত কলকাতার সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন 'সানডে'তে ফটো এডিটর হিসেবে কাজ করেন। ১৯৭১ সালে প্যারিসের গ্যালারি ডেলপিয়েরেতে অনুষ্ঠিত রঘু রাইয়ের প্রদর্শনীর আলোকচিত্র দেখে মুগ্ধ হয়ে বিশ্বখ্যাত আলোকচিত্রী হেনরি কার্টার ব্রেসন তাঁকে 'ম্যাগনাম ফটোস'-এর জন্য নির্বাচিত করেন। তিনি ১৯৮২ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত ভারতের শীর্ষস্থানীয় সংবাদ ম্যাগাজিন 'ইন্ডিয়া টুডে'তে বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক বিষয়ের ওপর কাজ করেন। তিনি ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, উদ্বাস্তু, পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ—ইত্যাদি নিয়ে কাজের জন্য ভারত সরকারের কাছ থেকে 'পদ্মশ্রী' পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৯২ সালে ন্যাশনাল জিওগ্র্যাফিতে প্রকাশিত 'হিউম্যান ম্যানেজমেন্ট অব ওয়াইল্ড লাইফ ইন ইন্ডিয়া' শীর্ষক কাজের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের 'ফটোগ্রাফার অব দি ইয়ার' পুরস্কার লাভ করেন। টাইম, লাইফ, জিও লে ফিগারো দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, দ্য টাইমস লন্ডন, নিউজউইক, ভোগ, জিকিউ, দি ইনডিপিন্ডেন্টসহ পৃথিবীর প্রায় সব বিখ্যাত ম্যাগাজিন এবং পত্রিকায় তাঁর আলোকচিত্র প্রকাশিত হয়েছে। লন্ডন, প্যারিস, নিউইয়র্ক, হামবুর্গ, প্রাগ, টোকিও, এবং সিডনিতে তাঁর প্রদর্শনী হয়েছে। রঘু রাই তিনবার 'ওয়ার্ল্ভ্রপ্রেস ফটো', দুবার 'ইউনেস্কো'র আন্তর্জাতিক আলোকচিত্র প্রতিযোগিতার বিচারক ছিলেন।

জাতি হিসেবে বাংলাদেশিরা রঘু রাইয়ের কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে এ জন্য যে, জীবন বাজি রেখে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথপরিক্রমার জীবন্ত দৃশ্য ধারণ করেছেন তাঁর ক্যামেরায়। যা কিনা আমাদের আগামী প্রজন্মকে দেশপ্রেমের চেতনায় নবরূপে উদ্ভাসিত করবে। প্রদর্শনীটি ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন দুপুর ১২ টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
সংবিধানের আরেকটি সংশোধনী ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে না। নাগরিক ঐক্যের সভায় ড. কামালের এই বক্তব্য আপনি সমর্থন করেন?
2 + 6 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
ফেব্রুয়ারী - ২৩
ফজর৫:১০
যোহর১২:১৩
আসর৪:২১
মাগরিব৬:০১
এশা৭:১৪
সূর্যোদয় - ৬:২৬সূর্যাস্ত - ০৫:৫৬
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected]m, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :