The Daily Ittefaq
ঢাকা, রবিবার ১৬ ডিসেম্বর ২০১২, ২ পৌষ ১৪১৯, ২ সফর ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মৃতিসৌধে লাখো মানুষ

লেখালেখির বাংলাদেশ

সুমন সাজ্জাদ

বইমেলায় দাঁড়ালে মাঝে মাঝে বিপন্ন বোধ করি; এত এত বই, এত এত লেখক। পুথির এক অসামান্য প্রতাপ ঘিরে ধরে চারদিক থেকে। ভাবি, কারা পড়ে এসব বই! প্রকাশক বলেন, 'বই চলে না', লেখক বলেন, 'প্রকাশক ঠকান', পাঠক বলেন, 'বই টানছে না।' তাহলে কারা পড়ে? কারা কেনে? কারাই বা ছাপে? কে কার অপ্রতিহত টানে মেলায় জড়ো হয়! এত রঙ, এত প্রচ্ছদ, এত অভিজাত কাগজ কার জন্য? সেই না-মেলা হিসাব মাথা ঘুরিয়ে দেবার মতো। বইমেলার ওই বিপন্নতার ভেতর থেকে আমি বেরিয়ে আসার চেষ্টা করি; প্রতি বছর এ রকমই ঘটে আমার। বাংলা একাডেমীর বহেরাতলায় দাঁড়ালে মনে হয়, লেখকেরা অনেক কিছুই করে ফেলেছেন। কেবল মিডিয়ার কারসাজি আর ষড়যন্ত্রের চক্রব্যূহে পড়ে স্বীকৃতির অভাব ঘটছে। টিভিতে কার মুখ দেখা গেল, কে কার পদতলে তৈলাধার উপুড় করে ঢেলে দিচ্ছেন, কোন সম্পাদক কুটিরশিল্পের মতো থরে থরে কবি-লেখক বানাচ্ছেন, পদক-পুরস্কারের ঝুলি কার কত ভারী আর শক্ত ইত্যাকার আলাপে কান বধির হয়ে আসে। তখন বাংলাদেশের লেখকদের ধোঁয়াটে চেহারা চোখে ভাসে, বিপন্ন বোধ করি।

আর এই বিপন্নতা থেকে উদ্ধার পেতে নতুন বইগুলো হাতড়ে দেখি। শিশুসুন্দর চেহারার বইগুলোকে ওইসব মুখর কবি-লেখকদের তুখোড় আলাপের চাইতে সুন্দর মনে হয়। ওই সুন্দর নিয়েই মেলা থেকে বাড়ি ফিরি। সামনে থাকে সম্পূর্ণ বাংলাদেশ—যে বাংলাদেশ এই মুহূর্তে পেরিয়ে এসেছে চারটি দশক। সে হিসেবে স্বাধীন বাংলাদেশের লেখালেখির জীবনযাপন চল্লিশ পেরোল। আর নয়টি বছর ডিঙিয়ে গেলেই ছুঁয়ে ফেলবে অর্ধশতক। তার মানে, এখন থেকেই লেনাদেনার হিসাব মেলানো যেতে পারে; দশক, শতক—নানাবিধ জয়জয়ন্তীর কাঠামোতে ইতিহাস বিচারের পুরোনো প্রথা তো তা-ই। কিন্তু চাইলেই কি কেবল চল্লিশ বছর ধরে এগোনো যায়? না, তা তো ইতিহাসসম্মতও নয়। হিসাব মিলবে না, প্রামাণ্যও হবে না, যদি না তাকাই বাংলাদেশ জন্মানোর আগের ইতিহাসে, স্বাধীনতার আগের সাহিত্যে।

দেখব, তখনও নিরীক্ষা ছিল, জীবন ও জগতের প্রতি স্বাভাবিক দৃষ্টিপাত ছিল। আজও যেমন আছে, আজও যেমন নতুন বিলাসব্যাসনে জীবনের অক্ষর সাজিয়ে তোলেন লেখক-কবিরা। কবি-লেখকদের জন্য এ তো এক স্বাভাবিক কর্তব্য। এই কর্তব্যে ভাটা পড়লে বিপদ। আবার বিপুল জোয়ারে ভাসলেও জলাঞ্জলি ঘটবার সম্ভাবনা থাকে। লেখার ভেতর দিয়ে উত্পাদিত মতাদর্শ সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

এমন একটা সময় ছিল যখন 'আধুনিক' হবার বাসনা তাড়া করে ফিরেছে; 'আধুনিকতা'র পিছু পিছু পঙ্গোপালের মতো ছুটে গেছেন কবি-লেখকেরা। একবারও প্রশ্ন জাগেনি, কোন আধুনিকতা? কার আধুনিকতা? কেনই বা গ্রহণের ব্যাকুল বাসনা? পঞ্চাশ-ষাটের দশকের কবিতার দিকেই তাকানো যাক; মরচেপড়া পরাবাস্তবতাবাদকে কবিরা মুড়িমুড়কির মতো গ্রহণ করছেন, গিন্সবার্গীয় উল্লাসে মাতিয়ে তুলছেন কবিতাকে। প্রতীকী কবিতার জং-ধরা কুহক ঢেকে দিচ্ছে দৃশ্যমান বাস্তব। নাটকে সাঈদ আহমদ বেছে নিচ্ছেন উদ্ভটত্বের আদর্শ। দায়হীন লীলালাস্যে ভরে উঠছে উপন্যাস-গল্প। 'বাঙালি মুসলমানে'র 'পশ্চাদ্পদতা'র অভিযোগ খণ্ডন করতে করতে কবিতায়, কথাসাহিত্যের মুখর কথকতায়, নাটকে প্রতিনিয়ত বাংলাদেশের লেখকেরা খুঁজে চলেছেন আধুনিকতার লেবাস ও নিশানা। প্রাবন্ধিকদের কেউ কেউ সাবেকি দায়িত্ব নিয়ে সামাজিক ভাষ্যকারের মতো ঘেঁটে গেছেন সময় ও সংকট, উত্তরণ ও উদ্ধার। আধুনিকতার সংকট নিয়ে কথা তুলেছেন আবুল ফজল, আবদুল হক, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী প্রমুখ।

আবার এই আধুনিকায়নের সারগামে গলা মিলিয়েছে বাঙালির জাতীয়তাবাদ। শামসুর রাহমান বা হাসান হাফিজুর রহমানের কবিতায়, সৈয়দ শামসুল হক-মমতাজউদ্দীন আহমদ বা আবদুল্লাহ আল মামুনের নাটকে, শওকত ওসমান বা আনোয়ার পাশার উপন্যাসে মোটামুটি এরই বিস্তার ঘটেছে, এবং আজও এই আদর্শই শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে। যদিও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে জাতীয়তাবাদের ভিন্ন স্বর প্রস্তুত করতে চেয়েছে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ।

২.

সত্তরের দশকের মধ্যভাগে অরাজক অভিজ্ঞতায় লেখকেরা যেন ঘুরে দাঁড়ালেন। দেশ ও মৃত্তিকার প্রতি জমে থাকা প্রবল প্রভূত টান ভুলে যেতে চাইল আধুনিকতার প্রলোভন। যতই হূদয়হর আর শিখরাসীন হোক-না-কেন বিনা প্রশ্নে আধুনিকতা মুক্তি পেল না। লেখকদের মরমের মন্দিরে নিত্যদিন ধূপধুনাচন্দনভূষিত প্রতীচ্যায়ন আগের মতো শ্রদ্ধা অর্জনে ব্যর্থ হলো। ষাটের দশকে অবক্ষয়ের আনন্দ নিয়ে যাঁরা ডুগডুগি বাজাতেন, তাঁদের সেই বাঁদরনাচানি আধুনিকতাও কালে কালে মুখ থুবড়ে পড়তে শুরু করল। স্বাধীনতা লাভের ঠিক পরের বছরই, 'বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস' বইতে আহমদ ছফা নতুন রাষ্ট্রের সামাজিক-রাষ্ট্রিক-সাংস্কৃতিক-সাহিত্যিক গন্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। সেখানে তাঁরও প্রস্তাবনা ছিল পরদেশি চিন্তা ও ইজমের খপ্পর থেকে দেহরক্ষা করা।

সত্তরের সমাপ্তিকালে দেখা যাবে, দুই পশ্চিমের (পশ্চিমবঙ্গ ও ইউরোপ) সীমানায় পা রাখার ইচ্ছে ক্রমশ কমতে শুরু করেছে। অথবা, কবি-লেখকেরা সেই ভাবগত পশ্চিমকে নিচ্ছেন, যে 'পশ্চিম' পশ্চিমকেই টেক্কা দিতে সক্ষম। এই একটি সুযোগ—যখন কবিরা বলতে পারছেন—'অবক্ষয়ের আধুনিকতায় মুক্তি নেই।' এই আধুনিকতা দাসত্বের, ভাঙনের। লোকায়ত ও কেন্দ্রচ্যুত, গ্রামীণ ও মেঠো, প্রাক-ঔপনিবেশিক ও জনমুখী সমস্ত সুরের শ্রেণীধর্মবর্ণনিরপেক্ষ সম্পূর্ণ জীবন স্পর্শাতীত থেকে গেছে। সতর্কভাবে খেয়াল রাখতে হবে, লোকায়ত নিম্নবর্গের প্রতি এই মনোনিবেশ জাতীয়তাবাদী লক্ষ্যে নয়। এ ধরনের ভাবনার শক্তিকেন্দ্র হিসেব দলে দলে গড়ে উঠেছে ছোটকাগজের গোষ্ঠী।

লেখালেখির ইতিহাসে উঠে এসেছে 'কালপুরুষ', 'গণসাহিত্য', 'একবিংশ', 'অনিন্দ্য', 'গাণ্ডীব', 'লিরিক'সহ বেশ কয়েকটি ছোটকাগজের নাম। প্রতিরোধের নন্দনতাত্ত্বিক আয়োজন হিসেবে, হয়তো বা 'প্রতিরোধের আধুনিকতা' হিসেবেও, কবিদের কণ্ঠে উচ্চারিত হতে থাকল পালাপার্বণের গান, চর্যা-মঙ্গলকাব্যসহ মৌখিক ও যৌথ সংস্কৃতির অনুষঙ্গ—এত দিন যা ছিল প্রত্যাখ্যাত। মার্কসের সমর্থনে প্রতিরোধ শাণিত হতে আরম্ভ করল মোহাম্মদ রফিক, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর লেখায়। পূর্বসূরির প্রেরণা হিসেবে আল মাহমুদ তো হাজির ছিলেনই। নন্দনতাত্ত্বিক প্রতিরোধ আরও বেশি করে দানা বাঁধল খোন্দকার আশরাফ হোসেন, মাসুদ খান, এজাজ ইউসুফী, সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, মুজিব ইরম প্রমুখের লেখায়। আশির শেষ পর্যায় থেকে উত্তর-আধুনিকতা নামক একটি প্রপঞ্চ লেখকদের আরাধ্য হয়ে উঠেছে।

আধুনিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবার যেসব আয়োজন আমরা কবিতায় লক্ষ করেছি, নাটকে এই কাজটি তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিকভাবে সম্পন্ন করেছেন সেলিম আল দীন। বর্ণনামূলক নাট্যরীতি বা দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্ব তাঁর মুখ্য প্রস্তাবনা; দুটিই প্রাক-ঔপনিবেশিক বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে সেতুবন্ধনের ফল। শিল্পের প্রথাগত প্রকরণভেদ মানতে তিনি গররাজি; ফলে নাট্য-নৃত্য-গীত-কাব্যের যৌথতায় তাঁর আখ্যান শিল্পের সম্মিলন। লোকনাট্য নামে যেসব নাট্যরীতি বাংলা অঞ্চলে প্রচলিত, সেগুলোর সমকাল-উপযোগিতা পরখ করবার ক্ষেত্রে সেলিম আল দীন অবিসংবাদিত; নাটকের মঞ্চোপস্থাপনায় সেলিমের সঙ্গে সঙ্গে একই কারণে প্রাসঙ্গিক নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু ও শিমুল ইউসুফ।

পরিপ্রেক্ষিতের এই যে বদল, তাতে তত্পরতাহীন নন গল্পকার ও ঔপন্যাসিকেরা। শওকত আলী যখন 'প্রদোষে প্রাকৃতজন' লিখেছেন, তখন তাঁরও হয়তো একটি সংগুপ্ত শেকড়মুখী কারণ ছিল; প্রাচীন বাংলায় পিছিয়ে গিয়ে, আশির দশকের সামরিক শাসন, জাতীয়তাবাদ-বির্তকের ধ্রুপদি মৌসুমে তিনি কি খুঁজছিলেন অখণ্ড বাঙালিত্বের নিশানা? অতটা দূরবর্তী খাতে প্রবেশ করেননি আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। সাতচল্লিশের দেশেভাগের সীমায় এসে থেমে গেছে 'খোয়াবনামা'র গতি। ইতিহাস পাঠের এই ফিকশনাল পদ্ধতি দেখিয়ে দিয়েছে অনেকখানি পথ। আর তাই ইলিয়াসের 'খোয়াবনামা' বাংলাদেশের উপন্যাসের ক্ষেত্রে বেশ বড় ধরনের মোড় ফেরা। কথকের ভাষাশরীরের ভেতর চরিত্রের নিজস্ব ভাষাশরীরের লিপ্ততা, বাস্তব ও কুহকের সীমানালঙ্ঘন, ভদ্রলোক-অমান্য শব্দ ও লোকবাকভঙ্গির বহুলপ্রয়োগ ইলিয়াসীয় আবহ হিসেবে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত।

এই কৌশল আরও ঘোরালো-প্যাঁচালোভাবে, লাতিন আমেরিকার জাদুবাস্তবতার ধরনে গ্রহণ করেছেন শহীদুল জহির। মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধোত্তর ঘটনাপুঞ্জ ও চরিত্র চক্রাকারে ঘুরে ঘুরে এসেছে 'জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা'য়। ছোটগল্প বা উপন্যাসের বিবরণ ও অবয়বের সঙ্গে মিশে গেছে মৌখিক সংস্কৃতির চিহ্ন। এ-দিক থেকে জহিরের কথকতাকে বরং বলা যায় 'কালচারাল ডকুমেন্টেশন'। অন্যদিকে শাহাদুজ্জামান গল্পের কাঠামোকে করেছেন লোকগল্প-আশ্রয়ী, এবং প্রায় প্রতিটি গল্পেই বিশেষ বক্তব্যের 'মোরাল' বা 'লেসনে'র সংবেদনা স্পষ্টভাবে হাজির থাকে। এই সংবেদনা আধুনিকতার তাত্ত্বিক সংকটগুলোকে খোলাসা করে; এমন গল্পের দেখা মিলবে তাঁর সামপ্রতিক বই 'কেশের আড়ে পাহাড়' বইটিতেও। তরুণতর গল্পকারদের মধ্যে লোকায়তকে বহনের নজির দেখতে পাই অদিতি ফাল্গুনীর গল্পে। 'তিতামিঞার জঙ্গনামা' বা 'অপৌরুষেয় ১৯৭১'-এর মতো বই কথক হিসেবে অদিতির আশ্চর্য শক্তিমত্তার উদাহরণ। নৃতাত্ত্বিক-গবেষকের কর্মপদ্ধতির মতো করে অদিতি কখনো কখনো গল্পের অবয়বে জুড়ে দেন সাক্ষাত্কার, তথ্য, টীকা ইত্যাদি। অর্থাত্, সময় ও পরিস্থিতিকে প্রামাণ্য করে তোলেন। প্রামাণ্য করে তোলার এই কাজটি মামুন হুসাইন করেন ভিন্নভাবে। সামপ্রতিক ঘটনা ও চরিত্রপাত্রের উল্লেখ ও উপস্থাপন অনেক ক্ষেত্রে ফিকশন ও রিয়ালের ভেদরেখা নিয়ে দোটানায় ফেলে দেয়; সামপ্রতিক 'নিক্রপলিস' বা 'যুদ্ধাপরাধ ও ভূমিব্যবস্থার অস্পষ্ট বিজ্ঞাপন'ও দোটানায় ফেলে। শক্তিমান এই লেখক লোকায়ত আঙ্গিকের প্রতিনিধিত্ব করে না, স্থানকালের বিশ্বস্ত প্রতিধ্বনি করে মুখ্যত তা সুররিয়্যাল বহুস্বরিকতায় পূর্ণ। কেনই বা সুররিয়্যাল হবে না! লড়াই-সংগ্রামের শস্য হিসেবে পাওয়া রাষ্ট্র ও তার অনুসারী প্রতিষ্ঠানগুলো এ দেশের মানুষকে এমন কী দিয়েছে চল্লিশ বছরে! এমন কোন বৃহত্ অর্জন জনগোষ্ঠীর সামনে হাজির করছে রাষ্ট্র? মামুনের আখ্যান তাই সমকালীন বাংলাদেশের সমালোচনা।

একটা সময় ছিল যখন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্, সৈয়দ শামসুল হক, আবদুল মান্নান সৈয়দ, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত শোনাতেন বিচ্ছিন্ন মানুষের গল্প; এখনকার কথকতা যৌথ সমাবেশের। আর যৌথতার খোঁজে কারও কারও লেখা ছুটেছে বিশেষ বিশেষ অঞ্চলের অভিমুখে; খুলনা-বাগেরহাটের আঞ্চলিক ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব যেমন প্রশান্ত মৃধাকে চিনিয়ে দেয় তীক্ষ পর্যবেক্ষণকারী হিসেবে। অবশ্য এমন নয় যে, তিনি কেবলই নির্দিষ্ট অঞ্চলের গল্প বলে চলেছেন; তিনিও লিখছেন রাষ্ট্র-রাজনীতি-মানুষ সম্পর্কের সংকট বুঝতে বুঝতে। তবে মানতে হবে, শরীরী সংবেদনার অকপট স্পর্শ সত্ত্বেও মনে হয় না লেখাটি বা লেখাগুলো কেবলই নারী-পুরুষ সম্পর্কের, শরীরের। লেখার বিষয়-পরিসর উন্মোচন করে দেয় সম্পর্কের পেছনে থাকা গোপনীয় সমাজ-ধর্ম-সংস্কৃতির নির্দেশ। রাশিদা সুলতানা বা মাহবুব মোর্শেদের সম্পর্ক-বিষয়ক গল্পগুলোতে তাই প্রত্যক্ষ হয় রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক সংকট থেকে জন্মানো বৈকল্যের নৃশংস আগ্রাসন।

লেখকদের কাছে তত্ত্বগতভাবে ফ্রয়েড আগের মতো পূজ্য বা অবশ্যসম্ভাবী হয়ে থাকছেন না। সেই দিন বলা যায় ফুরিয়ে যাবার পথে, যখন ফ্রয়েডকে ধ্রুব মেনে লেখায় শরীরী উপস্থাপনা ঘটাতে গিয়ে লেখকেরা যৌনভাবে অনায়াস আক্রমণ করতেন নারীকে; নারীর একটি নিষ্ক্রিয় ও আক্রান্ত, ভোগ্য ও নগ্ন চেহারা আঁকা হতো। ওই নিষ্ক্রিয়তার ধারাবাহিকতা থেকে সরিয়ে লেখার জমিনকে আলাদা করেছেন কবিতায় ফরহাদ মজহার, তসলিমা নাসরীন, নাসিমা সুলতানা এবং কথাসাহিত্যে হাসান আজিজুল হক, নাসরীন জাহান, আকিমুন রহমান, শাহীন আখতার, অদিতি ফাল্গুনী। ছাঁচেঢালা বাংলাদেশি 'নারীত্বে'র প্রশ্নহীন পুনরুপস্থাপন বা পুনরুত্পাদন ঘটেনি এঁদের লেখায়। 'তালাশ' উপন্যাসে শাহীন আখতার যেমন লিখেছেন নারীর ঐতিহাসিক বিসর্জনের আখ্যান। মুক্তিযুদ্ধ ঘিরে পুরুষের গড়ে তোলা ডিসকোর্সের বাইরে নিয়ে যাবার আহ্বান 'তালাশ'। হাল আমলে, 'বিধবাদের কথা'য়, তেমনি ঐতিহাসিক বিসর্জনের আখ্যান লিখেছেন হাসান আজিজুল হক।

এ ধরনের আয়োজনে লৈঙ্গিক পক্ষপাতের সংকেত নেই। নারীর প্রতি সহিংসতা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠস্বর আশি ও নব্বইয়ের দশকে বিরল কোনো ঘটনা নয়। কলাম-প্রবন্ধে তসলিমা নাসরীন নারীপ্রসঙ্গে কথা তুলেছিলেন। বাংলাদেশে নারীবাদের বিস্তৃত পরিচয় দিয়েছেন হুমায়ুন আজাদ 'নারী' ও 'দ্বিতীয় লিঙ্গে'র মাধ্যমে। দুটিই প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ; কিন্তু পরবর্তী পর্যায়ে ফরহাদ মজহার, নাসরীন জাহান, তসলিমা নাসরীন, নাসিমা সুলতানা, আকিমুন রহমান, শাহীন আখতার, অদিতি ফাল্গুনী প্রমুখের সূত্রে কথিত 'আধুনিকতা'র পুরুষতান্ত্রিক চেহারাটি ক্রমশ আলগা হয়ে পড়েছে। ফলে কবি-লেখকদের জবান ও বয়ানে উচ্চারিত হয়ে চলছে লৈঙ্গিক আধিপত্যের বিরোধিতা এবং সাম্যের ধারণা।

৩.

মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের সাহিত্যের সরল পাঠ দাঁড় করালে সাধারণীকরণের ঝুঁকি থেকেই যায়। ঝুঁকির বোঝা মাথায় নিয়েই বুঝতে চেয়েছি যুদ্ধোত্তরকালে সাহিত্যের বয়ান ও দৃষ্টিভঙ্গিতে ঠিক কোন কোন পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। অনুমান করি, আধুনিকতাকে ঘিরে গড়ে ওঠা প্রশ্নবিদ্ধ বিবেচনা সংঘবদ্ধভাবে বড় একটি পরিবর্তনের দিকে নিয়ে গেছে বাংলাদেশের সাহিত্যকে। এই বিবেচনা আমাদের সাহিত্যকে স্বভাবে 'নিম্নবর্গীয়', 'উত্তরাধুনিক', 'লৈঙ্গিক আধিপত্যবিরোধী', 'উগ্র জাতীয়তাবাদমুক্ত' হতে শিখিয়েছে। বলাবাহুল্য, বাংলাদেশের সাহিত্যের একাংশের ক্ষেত্রে এসব কথা প্রযোজ্য। সাহিত্যের এমন একটি অংশ আছে, যেটি এর সম্পূর্ণ বিপরীত। অপর একটি অংশ উদার মানবিকতা ও প্রগতিশীলতার ছাঁচে আধুনিকতার প্রতিধ্বনি করে চলেছে।

জনপ্রিয় সাহিত্যের এমন দুই বর্গ বিদ্যমান, যেগুলোর একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর পাঠ্য, অপরটি নিম্নবর্গীয়-স্বল্পশিক্ষিত-নিরক্ষর শ্রেণীর পাঠ্য। প্রথম ভাগে উপন্যাসের আসন, দ্বিতীয় ভাগে পুঁথি। উপন্যাসে হুমায়ূন আহমেদের জন্ম ও অধিষ্ঠান এক আশ্চর্য ঘটনা। 'সিরিয়াস', 'নিরীক্ষাবাদী', 'অ্যাকাডেমিক', 'ক্ল্যাসিক' ঘরানার পাঠক ও সমালোচক অবশ্য হুমায়ূনীয় সাহিত্যের ব্যাপারে আগ্রহী নন; আবার শিল্পের সমাজবাদী ব্যাখ্যাতাদের তরফেও হুমায়ূন সাধারণত অগ্রহণযোগ্য। আরেক পক্ষ আছে, যারা অবিরল হুমায়ূন-বন্দনায় মুখর। অস্বীকার করবার উপায় নেই, হুমায়ূনের পাঠকেরা সমাজের প্রায় প্রতিটি বর্গভুক্ত। আর হুমায়ূনও কেবল একটি ভঙ্গিতে গল্প বলেননি; কথকের ভূমিকা বদলে নানা ভঙ্গিতে গল্পের আসর বসিয়েছেন। ঠাট্টা, রসিকতা আর অবিশ্বাস্য জগতের এই গল্পগাথাকে ক্যাননিক্যাল সাহিত্যের ভাষিক ও নন্দনতাত্ত্বিক শর্ত দিয়ে পড়া জরুরি নয়। আসলে জনপ্রিয় সাহিত্যকে এভাবে পড়লে 'সিরিয়াস' বা 'ক্ল্যাসিক' ইত্যাদি তকমা দেওয়া কঠিন, তকমা দেওয়া আবশ্যকও নয়।

ইতিহাসের প্রায় প্রতিটি পর্বে লোক, অভিজাত (মান্য বা ধ্রুপদি) ও জনপ্রিয় সাহিত্য গড়ে উঠেছে। একটিকে অপরটির প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং সাংস্কৃতিক নির্মিতি হিসেবে ভাবা যেতে পারে। সেদিক থেকে হুমায়ূন আহমেদ, ইমাদাদুল হক মিলন, মুহম্মদ জাফর ইকবাল বা আনিসুল হকের হয়ে ওঠার ইতিহাসটি জরুরি। একইভাবে বোঝা জরুরি, জনপ্রিয় সাহিত্যের ভেতর থেকে উত্পাদিত কোন মতাদর্শ, কী বা কোন প্রক্রিয়ায় পাঠকের দপ্তরে পৌঁছাচ্ছে। জনপ্রিয় সাহিত্যের প্রতি অমনোযোগের অন্যতম অর্থ জনচিত্তের প্রতি অবজ্ঞা।

আর তাই বাংলাদেশের গ্রাম, আধা-শহর ও মফস্বলীয় অঞ্চলে রচিত ও প্রচারিত পুথিপত্র বা কাব্য-পুস্তিকার প্রতি মনোযোগ না দিয়ে পারা যায় না। আধুনিকতার প্রতি সমর্পণের দিনগুলোতে আমরা জনচিত্তের প্রতি মনোযোগী হতে পারিনি। স্বাক্ষর মধ্যবিত্ত শ্রেণীলিখিত সাহিত্যের মধ্যস্থতায় সমাজের কেবল একটি অংশের মতাদর্শিক অবস্থান বোঝা সম্ভব; কিন্তু সমাজের অধস্তন শ্রেণীর চর্যা ও চর্চায় বিরাজমান মতাদর্শ বুঝব কী করে? খেয়াল করব, ঢাকার ফুটপাতে 'অনভিজাত' বইয়ের দোকানগুলোতে অসংখ্য উপন্যাস বিক্রি হচ্ছে, যেগুলোর লেখক 'মান্য', 'মার্গীয়', 'মূল ধারা'র সঙ্গে সম্পর্কিত নন। গ্রমীণ বা মফস্বলীয় পরিসরে বহুল পঠিত সেসব বই। জনচিত্তের আকাঙ্ক্ষা ধারণে এঁরা ব্যর্থ নন। বাংলাদেশের চল্লিশ বছরের লেখালেখির হদিস নিতে গেলে জনপ্রিয় এই সাহিত্যের অবস্থান দেখে নেওয়ার জরুরত আছে।

এ তো গেল বাঙালি জনগোষ্ঠীর লেখা বাংলা সাহিত্যের সালতামামি। কিন্তু বাংলাদেশেই স্বাধীনতার চল্লিশ বছর ধরে চর্চিত হচ্ছে অপরাপর জনগোষ্ঠী ও ভাষার সাহিত্য; ইংরেজি, চাকমা, মারমা, মণিপুরী, উর্দু ভাষার সাহিত্য তো এ দেশেরই ঐশ্বর্য। গত চল্লিশ বছর ধরে বাংলাদেশের বাংলা সাহিত্য বিষয়ে যতটা কাজ হয়েছে বা বিবেচনাবোধ তৈরি হয়েছে, তার খুব কম অংশই তৈরি হয়েছে বাংলাদেশে বিদ্যমান অপরাপর ভাষাসমূহের সাহিত্য বিষয়ে। আমরা নগুগির খবর জানব অথচ কায়সার হকের কাজের খবর জানব না, তা হয় না। আমরা ভৈকম মুহম্মদ বশিরের গল্প পড়ব, নির্মল বর্মার উপন্যাস হাতড়াব অথচ মৃত্তিকা চাকমা-রণজিত্ সিংহের সাহিত্যের ছায়াও মাড়াব না, তা অনভিপ্রেত। বাংলাদেশের সাহিত্য-ইতিহাস ও সাহিত্য-সমালোচনা মূলত আধুনিক ও জাতীয়তাবাদী পরিকাঠামোর ভেতরই ঘুরপাক খাচ্ছে। ফলে অন্য জাতিগোষ্ঠীর ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি মনোযোগের ঘাটতি আছে।

তবে হ্যাঁ, সাহিত্য-সমালোচনার সমকালীন চর্চায় নতুন কিছু বৈশিষ্ট্যের সংযোজন ঘটেছে। তরুণতর লেখকদের কেউ কেউ সাহিত্যের সমাজতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক সমালোচনায় উত্সাহী; কাবেরী গায়েনের সুকুমার রায়-বিষয়ক লেখায়, সুমন রহমানের চটিসাহিত্য-খোয়াবনামা বা শহিদুল জহির-বিষয়ক লেখায়, মোহাম্মদ আজমের হুমায়ূন পাঠের বিবরণে সাংস্কৃতিক সমালোচনার ধরন চোখে পড়ে, আধুনিকদের মতো করে যা লেখার নান্দনিক গুণাবলি নিরূপণে ব্যতিব্যস্ত নয়। বুদ্ধদেব বসুপন্থী আবদুল মান্নান সৈয়দ, হায়াত্ মামুদ, হুমায়ুন আজাদের সাহিত্য-সমালোচনা থেকে এঁদের লেখা নিঃসন্দেহে মেরুদূরে অবস্থান নিয়ে আছে।

৪.

চল্লিশ বছর পেরিয়ে, এখনকার এই বাংলাদেশে প্রত্যাশা তাহলে কী? নিশ্চয়ই চাইব, বাংলাদেশের সাহিত্য স্বদেশের সীমানা ডিঙিয়ে যাক, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সাহিত্যগুলোর সঙ্গে আমাদের সাহিত্যের সংযোগ ঘটুক, অনূদিত হোক পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায়—যেভাবে ছড়িয়ে পড়েছে লাতিন আমেরিকা বা আফ্রিকার সাহিত্য। তার আগে চাই লেখালেখির কাজের প্রতি লেখকের নিবিড় নিরবচ্ছিন্ন মনোযোগ। নেতিবাচক দলবদ্ধতার মড়ক লাগা এই বাংলাদেশে লেখকেরাও যখন লেখার 'বাইরে'র উগ্র দলবাজিতা নিয়ে মত্ত থাকেন, তখন আশার গুড়ে বালি জমে।

সাহিত্য পত্রিকাগুলোকে সতর্ক পদক্ষেপে কাজ করতে হবে। এমনিতেই আমাদের দেশে সাহিত্য পত্রিকার আয়ুর দৈর্ঘ্য খুব কম। তার ওপর যদি সস্তা গোষ্ঠীবদ্ধতার আছর লেগে যায়, তাহলে পত্রিকার আদর্শগত মৃত্যু অনিবার্য। ইদানীং অনলাইন গণমাধ্যমের ফলে লেখালেখির দুনিয়া অনেক বেশি মুক্তপায়ে হাঁটতে পারছে। মুদ্রণসংস্কৃতির একক আধিপত্যের ওপর অনলাইনভিত্তিক গণমাধ্যমের সাঁড়াশি আক্রমণ পত্রিকাকেন্দ্রিক গোষ্ঠীবদ্ধতার পাটাতন নড়বড়ে করে দিয়েছে; লেখকও আর সম্পাদকের করুণাধারার ওপর নির্ভরশীল নন। অতি দ্রুত পাঠক ও লেখকের সন্ধি ঘটছে। লেখক ও লেখার মাধ্যম, লেখক ও পাঠকের এই নৈকট্য যত ইতিবাচকভাবে ব্যবহূত হবে, সাহিত্য ততই হবে জনমুখী ও সামপ্রতিক, চিনতে পারবে দেশ-কাল-জনপদের মুখশ্রী। আপাতত শুরু হোক কাজ আর অপেক্ষার পালা।

লেখক :শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
সিপিবি-বাসদের হরতাল কর্মসূচির প্রতিবাদে ১২টি ইসলামি দলের হরতাল আহ্বান যথার্থ হয়েছে বলে মনে করেন?
3 + 4 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
এপ্রিল - ২৬
ফজর৪:০৮
যোহর১১:৫৭
আসর৪:৩১
মাগরিব৬:২৭
এশা৭:৪৪
সূর্যোদয় - ৫:২৮সূর্যাস্ত - ০৬:২২
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :