The Daily Ittefaq
ঢাকা, রবিবার ১৬ ডিসেম্বর ২০১২, ২ পৌষ ১৪১৯, ২ সফর ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মৃতিসৌধে লাখো মানুষ

স্বপ্নপূরণ না হলেও বেড়েছে প্রত্যাশা

আশিস সৈকত

১৯৯৫ সালের জুন মাসে পঞ্চম জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন সাংবাদিক হিসেবে কভার করতে গিয়ে দেখেছিলাম, বিরোধী দলের আসনগুলো শূন্য। ওই সময়ের সরকারি দল বিএনপি অনেকটা একাই চালাচ্ছে সংসদ। আর ওই সময়ের বিরোধী দল বর্তমান সরকারি দল আওয়ামী লীগ সংসদ বর্জন করছে।

১৮ বছর পর গত ২৯ নভেম্বর নবম জাতীয় সংসদের গত অধিবেশন কভার করতে গিয়ে দেখা গেল সেই একই চিত্র। সংসদে স্পিকারের বাঁ-পাশ অর্থাত্ বিরোধী দলের আসনগুলো শূন্য পড়ে রয়েছে। এবার বিরোধী দল বিএনপির টানা অনুপস্থিতিতেই সংসদ চালাচ্ছে সরকারি দল আওয়ামী লীগ।

টানা প্রায় দেড় যুগের বেশি সময় পেশাগত কারণে সংসদের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে অধিকাংশ সময়ই বিরোধী দলের বর্জনের এ সংস্কৃতি দেখতে হয়েছে। অবশ্য সাংবাদিক হিসেবে এসব ঘটনায় লেখার খোরাক বেড়েছে। কিন্তু তারচেয়ে পাল্লা দিয়ে বেশি বেড়েছে বিরোধী দলের সংসদ বর্জনের ইতিহাস। পাঁচ বছরমেয়াদি চলতি সংসদের সময়কাল চার বছর পার হওয়ার আগেই এবার বর্জনের অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে ফেলেছে বিরোধী দল, বিএনপি। নবম সংসদে এ পর্যন্ত ৩৩৭ কার্যদিবসের মধ্যে বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া মাত্র ৮ দিন সংসদে যোগ দেন। আর বিরোধী দল বিএনপি মাত্র ৫২ কার্যদিবস সংসদে যোগ দেয়। এই হলো বর্তমান সংসদের চিত্র। অর্থাত্, সংসদে বিরোধী দলের উপস্থিতি ক্রমেই কমছে।

একটু ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, গত চার দশকেও জাতীয় সংসদ একটি কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠতে পারেনি। 'সার্বভৌম' সংসদ প্রতিষ্ঠার বিষয়টি এখনো স্লোগানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। সংসদকে ঘিরে জনগণের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে একটি বড় ধরনের ব্যবধান থেকেই যাচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনীতি এখনো রাজপথমুখী। কোনোভাবেই এটাকে 'সংসদমুখী' করা যাচ্ছে না। আইন প্রণয়ন ও সরকারের ওপর নজরদারি—এ দুটি প্রধান কাজের ক্ষেত্রে সংসদের সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। উল্লেখ্য, বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতেই সপ্তম, অষ্টম ও নবম সংসদের (এখন পর্যন্ত) অধিকাংশ কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।

সংসদের পাওয়া তথ্য অনুসারে বিরোধী দল সপ্তম সংসদের ৩৮২ কার্যদিবসের মধ্যে ১৬৩ দিন, অষ্টম সংসদের ৩৭২ কার্যদিবসের মধ্যে ২২৩ এবং নবম সংসদের ১৫তম অধিবেশন পর্যন্ত ৩৩৭ কার্যদিবসের মধ্যে ২৮৫ দিন সংসদের কার্যক্রম বর্জন করেছে। সব বিষয়ে বিরোধিতা করা বিরোধী দলগুলোর একধরনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়াদি ছাড়া সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে ঐকমত্যের কোনো উদাহরণ দেখা যায়নি। এ কথা তো সত্যি, বিরোধী দলবিহীন একটি দেশের জাতীয় সংসদ কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠতে পারে না। বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে সংসদের কার্যক্রম বাধা ও তর্ক-বিতর্ক ব্যতিরেকে দ্রুত নিষ্পন্ন হওয়ার সুযোগ থাকলেও তাতে পূর্ণতার অভাব এবং সীমাবদ্ধতা থেকেই যায়।

অবশ্য তুলনামূলক বিচারে ১৯৯১ সালে নির্বাচিত পঞ্চম সংসদ এবং এর পরবর্তী সংসদগুলো স্বাধীনতার প্রথম দুই দশকে এবং এরও আগে নির্বাচিত সংসদের তুলনায় বেশি কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে। বিশেষ করে, পঞ্চম সংসদের প্রথম তিন বছরকে বাংলাদেশের সংসদের 'স্বর্ণযুগ' বললে অত্যুক্তি হবে না। পঞ্চম সংসদে সরকার ও বিরোধী দল সমঝোতার ভিত্তিতে অনেক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল, যার মধ্যে অন্যতম সিদ্ধান্ত হলো সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন। ১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারব্যবস্থা চালুর ১৫ বছর পর ১৯৯১ সালে সব দলের সম্মতিক্রমে সংসদীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন হয়। বিএনপি প্রথমে এ পরিবর্তনের বিপক্ষে থাকলেও পরবর্তী সময় তীব্র জনমত ও নিজদলীয় সাংসদদের চাপের মুখে সরকারব্যবস্থা পরিবর্তনে সম্মত হয়। পঞ্চম সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের সমঝোতার ভিত্তিতে গৃহীত অন্যান্য সিদ্ধান্তের মধ্যে স্বাধীন জাতীয় সংসদ সচিবালয় প্রতিষ্ঠা এবং সংসদীয় কমিটির ক্ষমতা বৃদ্ধি করার বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তা ছাড়া বিরোধী দলের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তত্কালীন সরকারি দল পঞ্চম সংসদে গঠিত সর্বদলীয় কমিটিগুলো অন্য সংসদের এ ধরনের কমিটিগুলোর তুলনায় অনেক বেশি সক্রিয় ও কার্যকর ছিল। সংসদীয় কাজে বিরোধী দলের স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণ পঞ্চম সংসদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। এ সংসদের প্রথম ১২ অধিবেশনের ২৬৭ কার্যদিবসের মধ্যে আওয়ামী লীগ ২৫১ দিন উপস্থিত ছিল এবং সংসদ কার্যক্রমে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে। অন্য কোনো সংসদে বিরোধী দলের সদস্যরা একনাগাড়ে এত দিন সংসদ-কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেননি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে মাগুরা উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট জটিলতা (যা শেষপর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে রূপ নেয়) বিরোধীদের লাগাতার সংসদ-বর্জনের সংস্কৃতির রেওয়াজ চালু করে।

সংসদীয় ব্যবস্থা আরও কার্যকর করতে সপ্তম সংসদ বেশ কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করে, যার মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্ব চালু, সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদে মন্ত্রীর পরিবর্তে সাধারণ সদস্যদের নিয়োগ এবং পুরো সংসদ-কার্যক্রমে রেডিওতে এবং প্রশ্নোত্তর পর্ব ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারের উদ্যোগ গ্রহণ প্রণিধানযোগ্য। এখন তো সংসদ টেলিভেশনে পুরো সংসদ-কার্যক্রম প্রচারিত হচ্ছে।

এ ছাড়া সাধারণ সদস্যদের, বিশেষ করে বিরোধীদের কথা বলার বাড়তি সুযোগ দেওয়ার লক্ষ্যে প্রতি কার্যদিবসের শেষ ৩০ মিনিট অনির্ধারিত বিতর্কের জন্য বরাদ্দ করা হয়। সাংসদদের আইন প্রণয়নে অধিকতর সম্পৃক্তকরণ ও আইনের পূর্ণতা বিধানের লক্ষ্যে সংসদে উত্থাপিত সব বিল সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো শুরু হয়। তবে আশার কথা হলো, সংসদ অধিবেশন বর্জন করলেও বিরোধী দলের সদস্যরা সংসদীয় কমিটিতে নিয়মিত যোগ দিচ্ছেন। বর্তমান সংসদে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির দুজন সাংসদ দুটি সংসদীয় কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। আওয়ামী লীগের বাইরে অন্যান্য দল থেকে এবার ৭ জন সাংসদকে কমিটির সভাপতি করা হয়েছে। বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে বিরোধী দল থেকে সংসদীয় কমিটির সভাপতি করার নজির এটাই প্রথম। আমাদের জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্বও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একমাত্র ব্রিটেন ছাড়া অন্য কোনো সংসদীয় গণতন্ত্রে এ ধরনের নিয়ম দেখা যায় না। কিন্তু বিরোধীদলীয় নেতার অনাগ্রহের কারণে সত্যিকার অর্থে এ ব্যবস্থা এখনো কার্যকর হয়নি। সপ্তম সংসদে চালু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর কোনো প্রশ্নোত্তর পর্বে কোনো বিরোধীদলীয় নেতা উপস্থিত থাকেননি। অথচ ব্রিটেনে প্রধান বিরোধীদলীয় নেতাই প্রধানমন্ত্রীকে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন করে থাকেন।

সংসদের প্রতি কার্যদিবসের এজেন্ডা পূর্বনির্ধারিত থাকে। বিশেষ কারণ ছাড়া এর ব্যতিক্রম হয় না। বিরোধী দলের সদস্যদের সংসদ বর্জনের কারণে সরকারি দলের সদস্যদেরও সংসদীয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণের আগ্রহ কমছে। উপযুক্ত আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে, সংসদ যেভাবে কাজ করার কথা, সেভাবে করেনি। বিভিন্ন সংস্কারের ফলে যে ধরনের পরিবর্তন আশা করা হয়েছিল, তা অনেকটাই হয়নি। তার মানে এই নয় যে, ১৯৯১ সাল থেকে এ পর্যন্ত নির্বাচিত সংসদগুলো কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেনি। বরং এ কথা অনেকটা জোর দিয়ে বলা চলে যে, সাম্প্রতিক সময়ে নির্বাচিত সংসদগুলোর নেওয়া সিদ্ধান্তের ফলে সংসদ-কার্যক্রম বেগবান হয়েছে। ফলে সংসদ একটি কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

এক হিসাবমতে, অষ্টম সংসদে কমিটিতে পাঠানো ৬৫ শতাংশ বিলই সংশোধিত আকারে পাস হওয়ার জন্য সংসদে এসেছে। কমিটিতে সংশোধিত বিলের ৯৩ শতাংশই হয় ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে। একাধিক ক্ষেত্রে কমিটি অনেক মৌলিক সংশোধনীর প্রস্তাব করে, যা পরবর্তী সময়ে সংসদে গৃহীতও হচ্ছে।

মন্ত্রণালয়ের কাজ সম্পর্কে কমিটির সামনে সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যাখ্যা দেওয়ার যে ব্যবস্থা চালু হয়েছে, তা কার্যকর করতে পারলে সরকারের জবাবদিহি নিঃসন্দেহে বাড়বে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, সংসদীয় কমিটিগুলো শুধু আইন পর্যালোচনাই করে না, এগুলো মন্ত্রণালয়ের কাজের হিসাব নেয়। কমিটি ও মন্ত্রণালয়ের মধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে বিরোধ দেখা দেওয়ার বিষয়টি অস্বাভাবিক নয়। কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয় গড়িমসি করে অনেক সময়।

এ সমস্যার সমাধান করতে হলে, মন্ত্রণালয়কে কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন-সম্পর্কিত বিষয়ে একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রিপোর্ট দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে হবে। অর্থাত্, সব সুপারিশই মানতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। তবে সুপারিশের অবস্থা কী, তা সময়মতো কমিটিকে জানানো প্রয়োজন। অনেক গণতান্ত্রিক দেশেই এ বিধান কার্যকর আছে।

এসব সীমাবদ্ধতার কারণেই বাংলাদেশে একে একে ৯টি সংসদ কাজ করলেও জাতীয় সংসদ এখনো জাতীয় রাজনীতি ও নীতিনির্ধারণের প্রাণকেন্দ্র হতে পারেনি। বিশেষ করে বিরোধী দলের অবিরাম সংসদ-বর্জন এবং সরকার ও বিরোধী দলের বৈরী সম্পর্ক সংসদকে কার্যকর করার ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা হিসেবে বিবেচিত হয়। অবশ্য, সংসদের কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করে সাংসদদের আচরণের ওপর। বিগত সংসদগুলোতে যাঁরা নির্বাচিত হয়েছেন, তাঁদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ব্যবসায়ী। রাজনীতি তাঁদের খণ্ডকালীন পেশা। সংসদে সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি নিয়ে ব্যয় করার মতো বাড়তি সময় তাঁদের অধিকাংশেরই নেই। তবে এটাও হয়তো ঠিক নয় যে, পেশাদার রাজনীতিবিদেরা অধিকসংখ্যায় সংসদে এলে সংসদ কার্যকর হয়ে যাবে; তেমনটা আশা করাও বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাস্তবসম্মত নয়। তবে এটা ঠিক যে, পূর্ণকালীন রাজনীতিবিদদের পক্ষে সংসদে অধিকতর সময় দেওয়া সম্ভব।

বাংলাদেশে সংসদীয় কার্যক্রমে সাধারণ সদস্যদের অংশগ্রহণের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। এক হিসাবমতে, গড়ে প্রতি বছর একজন সাধারণ সদস্য সংসদে কথা বলার জন্য এক ঘণ্টা সময়ও পান না। প্রধানত দুটি কারণে এটা হয়ে থাকে। সংসদের বেশির ভাগ সময় সরকারি কার্যাবলির জন্য নির্ধারিত থাকে এবং বাংলাদেশে প্রতি কার্যদিবসের স্থায়িত্ব অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। অষ্টম সংসদে প্রতি কার্যদিবস গড়ে ৩ দশমিক ৩২ ঘণ্টা স্থায়ী হয়েছিল। পঞ্চম সংসদে এ সময়কাল ছিল প্রায় পাঁচ ঘণ্টা। অন্যান্য দেশের সংসদ বা আইন সভায় কার্যদিবসের সময়কাল আমাদের তুলনায় অনেক বেশি। সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি এ ক্ষেত্রে একটি অন্যতম বাধা। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়, সংসদের অধিবেশন যত কম দিন চলে, ততই সরকার খুশি। সংসদকে বোঝা হিসেবে বিবেচনা করা আমাদের দেশের সরকারগুলোর একটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এরূপ মনোভাবের পরিবর্তন প্রয়োজন।

বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৭৩-এর প্রথম সাধারণ নির্বাচনেও মানুষের ইচ্ছার পূর্ণ প্রতিফলন ঘটেনি। পাকিস্তান আমলে বাঙালি রাজনীতিকেরা আন্দোলন করেছেন 'অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচনের' জন্য। স্বাধীন দেশের প্রথম নির্বাচন সম্পূর্ণ অবাধ ও নিরপেক্ষ ছিল না। ভয়ভীতি প্রদর্শন ও কারচুপির মতো ঘটনাও ঘটে। অনেক প্রার্থী 'বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়' নির্বাচিত হন। বিরোধী দলের অনেক প্রার্থীকে হারিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ফলে সংসদ ছিল প্রায়-বিরোধী দল শূন্য। বলা যায়, একধরনের একদলীয় নির্বাচিত সরকার। বস্তুত, সংসদীয় একনায়কত্ব। ওই অবস্থাটিও জনগণ মেনে নিয়েছিল। কিন্তু ওই সংসদেই সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী পাস হয়। সব দল নিষিদ্ধ করে যে একদলীয় শাসন প্রবর্তিত হয়, তা ছিল জনগণের বহুকালের লালিত প্রত্যাশার ওপর প্রচণ্ড আঘাত। সংসদীয় পদ্ধতির পরিবর্তে রাষ্ট্রপতিশাসিত পদ্ধতি প্রবর্তিত হলো। সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিকভাবে সংসদের মেয়াদও বাড়ানো হলো। রাষ্ট্রপতিকে দেওয়া হলো সীমাহীন ক্ষমতা, অনেকটা রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অবস্থা। তাতে জনগণের মধ্যে শুধু ক্ষোভ নয়, দেখা দেয় গভীর হতাশা। সেই ক্ষোভ ও হতাশার সুযোগ ব্যবহার করে ৭৫-এর ঘাতকেরা। সবচেয়ে বেদনাদায়ক যা, তা হলো—বঙ্গবন্ধুর মর্মান্তিক মৃত্যুর পরও দলের ভেতর থেকে কোনো প্রতিবাদ হয়নি। তার কারণ ১৫ই আগস্টের ঘটনা ঘটিয়েছিল সেনাকর্মকর্তাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগেরই একটি অংশ। তারাই সুবিধাভোগী।

আসলে এর পরই শুরু হয় বাংলাদেশের রাজনীতিতে নীতি-আদর্শের পরিবর্তে সুবিধাবাদের রাজনীতি। বাংলাদেশের মানুষ ১৯৫৮ সাল থেকে সামরিক শাসনকে ঘৃণা করে এসেছে। সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে লড়াই করে দেশ স্বাধীন হয়। ৪৩ মাস পরই তাদের জীবনে আবার নেমে আসে সামরিক শাসনের অভিশাপ। যেকোনো সামরিক শাসকের মতো আমাদের সামরিক শাসকেরাও দোহাই দিলেন যে, দুর্নীতিবাজ রাজনীতিকদের কারণেই তাঁরা দেশের শাসনভার গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছেন। দেশকে রক্ষা করতেই তাঁরা এসেছেন। বেশি দিন ক্ষমতায় থাকার ইচ্ছা তাঁদের আদৌ নেই। অবিলম্বে নির্বাচন দিয়ে বেসামরিক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে তাঁরা ব্যারাকে ফিরে যাবেন। কিন্তু ক্ষমতার স্বাদ পেলে ব্যারাকে কেন, নিজের বাড়িতেও কেউ ফিরে যায় না। নির্বাচন দিয়ে জিয়াউর রহমান সামরিক শাসক থেকে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হলেন। তারপর জাতীয় সংসদ নির্বাচন ১৯৭৯ সালে। বাংলাদেশে সিভিল ও মিলিটারির মিলিত শাসন প্রবর্তিত হয়। আমাদের রাজনীতিকেরা তাতে খুব একটা অখুশি ছিলেন না।

সত্তর ও আশির দশকে বাংলাদেশে কয়েকটি রাষ্ট্রপতি ও সংসদনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। জিয়ার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জনমতের প্রতিফলন ঘটলেও তা ছিল এক ব্যক্তির হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়ার উপায়মাত্র। ওই পদ্ধতিতে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ ছিল রাষ্ট্রপতির আজ্ঞাবহ। তা সত্ত্বেও যতটুকু কাজ দ্বিতীয় ও তৃতীয় সংসদ করতে পারত, তা-ও করেনি। জিয়া-এরশাদ একনায়ক হিসেবেই দেশ পরিচালনা করেছেন। রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারের সময়টি ছিল সংক্ষিপ্ত। বাংলাদেশে চার দশকের রাজনীতি বিচিত্র ঘটনা ও দুর্ঘটনায় পরিপূর্ণ। অসামরিক একনায়কত্ব, সামরিক একনায়কত্বের দুঃশাসন, আধাসামরিক অপশাসন, নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের শাসন প্রভৃতি। কোনো সরকারই জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সাধ্যমতো চেষ্টা করেনি। তার অর্থ এই নয় যে, দেশ কিছুই অর্জন করেনি। সেনানায়ক এইচ এম এরশাদের সময়কালেও দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। পোশাকশিল্প বিকশিত হয়েছে, অবকাঠামোর উন্নতি হয়েছে। সত্তরের দশকের শেষদিক থেকেই সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা বা এনজিওগুলোর মাধ্যমে গ্রামীণ দারিদ্র্য অনেক পরিমাণে কমে এসেছে। শিক্ষার হার বেড়েছে। নারীশিক্ষার ক্ষেত্রে অসামান্য অগ্রগতি হয়েছে। গত চার দশকে রাষ্ট্র ও সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বলিষ্ঠভাবে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে।

রাজনীতির একটি প্রধান লক্ষ্য জনগণের জীবনযাত্রার মান বাড়ানো। আধুনিক রাষ্ট্রের রাজনীতি অর্থনীতিকে বাদ দিয়ে হয় না। অনেকটা খারাপ ধরনের রাজনীতির আবর্তে থেকেও গত সাড়ে তিন দশকে দারিদ্র্যের হার ৬০ থেকে ৪০ শতাংশের নিচে নেমেছে। মা ও শিশুমৃত্যুর হার কমেছে। স্বাধীনতার আগে নদ-নদীতে পানি ছিল; কিন্তু মানুষের বাড়িতে টিউবওয়েল ছিল না। গত তিন দশকে বিশুদ্ধ পানির অভাব অনেকটা দূর হয়েছে। ধান-গমসহ কৃষি-উত্পাদন বেড়েছে কয়েক গুণ। রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প ধ্বংস হয়ে গেলেও ব্যক্তির উদ্যোগে গড়ে উঠেছে শিল্প-কারখানা। জনগণের গড় আয় ও আয়ু বেড়েছে। বহু নতুন নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

আমাদের ভূ-খণ্ড ছোট, জনসংখ্যা বেশি। একাত্তরের আগের বছরগুলোয় স্বাধিকার আন্দোলনে দেশের নিম্ন-মধ্যশ্রেণীর মানুষই সবচেয়ে বেশি ত্যাগস্বীকার করেছে। রাজপথের বিক্ষোভে নিহত বা শহীদদের তালিকার দিকে তাকালে দেখা যাবে, সেখানে উচ্চশ্রেণীর মানুষ নেই, সবই নিম্ন ও মধ্যশ্রেণীর মানুষ। মুক্তিযুদ্ধে যাঁরা সক্রিয় অংশ নিয়েছিলেন, তাঁদের অধিকাংশই নিম্ন-মধ্যবিত্ত। তাঁরা পাকিস্তান আমলে বেকারত্বের অভিশাপ ভোগ করেছেন। তাঁরা আশা করেছিলেন, স্বাধীনতার পর কাজ পাবেন এবং পাবেন বাঁচার মতো মজুরি। কিন্তু স্বাধীনতার পরবর্তী ৪১ বছরে জনসংখ্যাও বেড়েছে, বেকারত্বও বেড়েছে। মানবসম্পদ তৈরিতে রাজনৈতিক সংগঠনগুলো তেমন কোনো ভূমিকা পালন করেনি। আর রাজনীতিতে দক্ষ জনবল তৈরি না হওয়ায় সংসদও গত চার দশকে আলোকিত করতে পারেনি দেশকে। তবে নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্র যে এগিয়ে চলছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

গত চার দশকে সংসদে হয়তো বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায়নি কিন্তু সংসদীয় ব্যবস্থাকে জনগণ গ্রহণ করেছে। এখন আলোচনা চলছে, আরও কার্যকর একটি সংসদ গড়ে তোলার। অর্থাত্, স্বপ্নপূরণ না হলেও প্রত্যাশার ব্যাপ্তিটা বাড়ছে। বাংলাদেশের জন্য এটিও কম অর্জন নয়।

লেখক : সাংবাদিক

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
সিপিবি-বাসদের হরতাল কর্মসূচির প্রতিবাদে ১২টি ইসলামি দলের হরতাল আহ্বান যথার্থ হয়েছে বলে মনে করেন?
6 + 4 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
নভেম্বর - ১২
ফজর৪:৫৩
যোহর১১:৪৩
আসর৩:৩৯
মাগরিব৫:১৭
এশা৬:৩২
সূর্যোদয় - ৬:১১সূর্যাস্ত - ০৫:১২
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :