The Daily Ittefaq
ঢাকা, রবিবার ১৬ ডিসেম্বর ২০১২, ২ পৌষ ১৪১৯, ২ সফর ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মৃতিসৌধে লাখো মানুষ

[ বি জ য় ]

স্বাধীনতার স্বপ্ন আজও অধরা

সাদেক হোসেন খোকা

স্বাধীনতা হচ্ছে রাষ্ট্রের কাঠামোগত ও ব্যবস্থাপনাগত পরিবর্তনের স্বপ্ন। আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলতে আমরা বুঝেছি রাজনৈতিক পরাধীনতা ও অর্থনৈতিক বৈষম্য বা অনগ্রসরতার অভিশাপ থেকে মানুষের সমষ্টিগত মুক্তির চেতনা, যার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হবে একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং মানবিক সমাজ। কিন্তু জাতি হিসাবে আমাদের দুর্ভাগ্য হলো, বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের নিগড়মুক্ত হওয়ার পর আমরা অল্প সময়ের ব্যবধানে দু'বার স্বাধীনতা লাভ করলেও রাষ্ট্র এবং সমাজব্যবস্থায় মৌলিক গুণগত কোন পরিবর্তন আমরা সাধন করতে পারিনি। কেবলমাত্র চেহারার পরিবর্তন ছাড়া আর সর্বক্ষেত্রেই আজও আমরা রয়ে গেছি বৃটিশ শাসন-ব্যবস্থাপনার কাঠামোর মধ্যে। গণতন্ত্রের মূল কথা হলো মানুষের ইচ্ছা ও অধিকারের প্রতি কার্যকর সম্মান প্রদর্শন এবং সুযোগের সমতা। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে সকল স্তরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার অর্থবহ বিকাশ ঘটানো ব্যতীত গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া তথা এই ব্যবস্থার প্রকৃত সুফল পাওয়া সম্ভব নয়।

১৯৪৭ সালে আমরা যখন দেশ ভাগের মধ্য দিয়েই স্বাধীন হয়েছিলাম, তখন প্রকৃত অর্থে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বৃটিশদের হাত থেকে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে হস্তান্তরিত হয়েছিল মাত্র। সেই ক্ষমতা হস্তান্তরের ক্ষেত্রেও মূল কর্তৃত্ব রয়ে যায় উর্দুভাষী তত্কালীন পশ্চিম পাকিস্তানিদের হাতে। যে কারণে নামসর্বস্ব স্বাধীনতা লাভের পরও এই ভূখণ্ডের মানুষ কার্যত রাষ্ট্রীয় বৈষম্য ও বঞ্চনার নতুন এক অধ্যায়ে প্রবেশ করে মাত্র। যে কারণে মাত্র সল্প সময়ের ব্যবধানেই শুরু হয় ভাষা আন্দোলন। তারপর ধারাবাহিকভাবে স্বায়ত্তশাসন, স্বাধিকার এবং সর্বশেষ স্বাধীনতা সংগ্রাম। ১৯৭১ সালে দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, অনেক প্রাণ এবং বহু মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে আমরা ছিনিয়ে আনি বিজয়ের লাল সূর্য। প্রতিষ্ঠিত হয় আমাদের নিজের রাষ্ট্র। স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ।

সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা এই রাষ্ট্রের বয়স আজ প্রায় ৪২ বছর। কিন্তু আজও যেন আমাদের স্বাধীনতার স্বপ্ন রয়ে গেছে অধরা। কিছুতেই যেন আমরা স্পর্শ করতে পারছি না স্বপ্নের সোনালী রোদ্দুর। আজ যখন কথায় কথায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে গত্বাঁধা বক্তৃতার ফুলঝুরি দেখি, তখন নিজের মধ্যেই প্রশ্ন জাগে, কি লক্ষ্যে, কোন চেতনা নিয়ে সেদিন জীবন বাজি রেখে অবতীর্ণ হয়েছিলাম মক্তিযুদ্ধে? এই প্রশ্নের জবাব তো সবারই জানা। আমরা চেয়েছিলাম পরাধীনতার নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়ে নিজেদের মতো করে একটি কল্যাণমুখী প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যেখানে থাকবে না কোনোরকম শোষণ-বৈষম্য, বঞ্চনা কিংবা অধিকার হরণের কালো থাবা। মত প্রকাশের অবাধ স্বাধীনতায় যেখানে কেউ বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। আমরা চেয়েছিলাম নিজেদের জন্য একটি নিরাপদ ও মানবিক সমাজ, যেখানে থাকবে না কোনো হিংসা-প্রতিহিংসা কিংবা কোনো ধরনের দমন-পীড়ন। কিন্তু আবারও স্বপ্নভঙ্গের পালা।

সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের সূচনাতেই হোঁচট খেয়ে গেল সমষ্টিগত স্বপ্ন। দ্রুত স্পষ্ট হতে থাকলো ব্যক্তির প্রাধান্য, গোষ্ঠীর দৌরাত্ম্য। সেইসাথে বিকশিত হলো একশ্রেণীর চাটুকার-বশংবদের ধারা। এভাবেই এক ধরনের নৈতিক পরাজয়ে পর্যবসিত হলো আমাদের অনেক সাধের বিজয়, স্বপ্নের স্বাধীনতা। খুব অল্প সময়ের ব্যবধানেই হতাশা গ্রাস করলো গোটা জাতিকে। তা থেকে নানারকম অস্বাভাবিক ও অপ্রত্যাশিত ঘটনাপ্রবাহ। মূলত মুক্তিযুদ্ধের সত্যিকার চেতনাকে ধারণ করে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হতে না পারার পটভূমিতে সৃষ্ট ঘটনাপ্রবাহের দায়ভার তত্কালীন রাজনৈতিক নেতৃত্বের। স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে পথ চলার ক্ষেত্রে প্রারম্ভিক সেই ব্যর্থতা ও অদূরদর্শিতার জের আজও টানতে হচ্ছে জাতিকে। আমাদের জাতীয় জীবন আজও মারাত্মক উদভ্রান্ত দিশেহারা। সরকার পরিবর্তন তথা রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনার পদ্ধতি নিয়ে এক বিরামহীন বিতর্কের বেড়াজালে আটকে দেয়া হয়েছে সমগ্র জাতিকে। আমাদের নতুন প্রজন্ম দারুণভাবে বিভ্রান্ত। অতীত সম্পর্কে বিতর্কমুক্ত কোনো ইতিহাস যেমন তাদের সামনে নেই, তেমনি নেই ভবিষ্যতের জন্য কোনো উপযুক্ত দিক-নির্দেশনাও। রাজনীতির কথা শুনলে আজকের মেধাবী তরুণ ও কিশোররা রীতিমতো আঁতকে উঠে। অরাজনৈতিক যেসব বিশিষ্টজন দেশে-বিদেশে সমাদৃত, তাদেরকে বিতর্কিত করে দেয়া হচ্ছে সুপরিকল্পিতভাবে। আমাদের রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো এতদিনে শক্তিশালী হওয়া দূরের কথা, উল্টো দিনে দিনে এগুলো আজ মারাত্মক ভঙ্গুর দশায় নিপতিত হয়েছে। বিচার বিভাগের ওপর মানুষের আস্থার প্রশ্নটি আজকাল অনেক বেশি বেশি উচ্চারিত হচ্ছে। বিজয়ের চার দশকেরও বেশি সময় পর এই যখন আমাদের জাতীয় জীবনের বিবর্ণ চিত্র, সেই অবস্থায়ও কিছু মতলবাজ মানুষকে আমরা সকাল-বিকাল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ফেরি করতে দেখি। মূলত গোষ্ঠীস্বার্থের চেতনায় উজ্জীবিত লোকেরাই নিজেদের চিন্তাগত সংকীর্ণতার পটভূমিতে দাঁড়িয়ে প্রতি মুহূর্তে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে চলেছেন।

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হিংস্র আক্রমণের মুখে জাতির যে সমস্ত সূর্য সন্তান সেদিন নিজেদের প্রাণ হাতের মুঠোয় নিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে শামিল হয়েছিল, তাদের অন্তরজুড়ে তখন ছিল কেবল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা লাভের এক দুর্নিবার চেতনা। তারা এমন রাষ্ট্র গঠনের প্রত্যয়ে সেদিন অস্ত্র হাতে শত্রুর মোকাবিলায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, যে রাষ্ট্রে প্রতিটি নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত হবে পূর্ণ মানবিক মর্যাদা এবং সুযোগের সমতার ভিত্তিতে। কোনো ধর্ম, গোত্র বা অন্য কোনো ক্ষুদ্র গোষ্ঠীগত বিভাজনের চেতনা তাদের মধ্যে ছিল না। একটি রাষ্ট্রে যদি আইনের আওতায় প্রতিটি নাগরিকের অধিকার এবং মর্যাদা সুনিশ্চিত করা যায়, তাহলে সেখানে কোনো ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য পৃথক আন্দোলন-সংগ্রামের প্রশ্ন অবান্তর। দুর্ভাগ্য হলো, বিগত চার দশকে আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের বড় একটি অংশ সামগ্রিকভাবে সকল নাগরিকের অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তার বিষয়টিকে পাশ কাটিয়ে গোষ্ঠীর স্বার্থে কাজ করেছেন, এখনও করছেন। মূলত তাদের এমন মনোবৃত্তির কারণেই দেশে এতদিনেও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে জাতীয় ঐকমত্য সৃষ্টির ধারা সৃষ্টি হয়নি। উল্টো বিভাজন এবং প্রতিহিংসার রাজনীতিই এখানে হূষ্টপুষ্ট হচ্ছে।

প্রতিটি রাষ্ট্রেই রাজনীতির বাইরে সিভিল সোসাইটি বা সুশীল সমাজের প্রভাব বিস্তারকারী একটা ভূমিকা থাকে। কিন্তু এখানেও জাতি হিসাবে আমরা অত্যন্ত দুর্ভাগা। সুশীল সমাজ তথা বুদ্ধিবৃত্তিক পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গের অধিকাংশই এখন আর নিরপেক্ষ অবস্থানে নেই। মিডিয়ার অবস্থাও প্রায় একইরকম। এমন পরিস্থিতিতে যে কোনো ক্রান্তিকালে সাধারণ মানুষের সামনে আশার আলো জ্বালানোর মতো মানুষের সংখ্যা নিতান্তই হাতেগোনা। স্বল্পসংখ্যক যে ক'জন গ্রহণযোগ্য ইমেজের মানুষ এখনো দলীয় বৃত্তের বাইরে একটা স্বতন্ত্র ও নিরপেক্ষ অবস্থানে টিকে থাকবার চেষ্টা করছেন, তাদের ভাবমূর্তি নিয়েও দেখা যায় নোংরা রকমের টানা-হেঁটড়া। এসব দেখে নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিরা আরও হতাশ এবং আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে জাতির ভবিষ্যত্ নেতৃত্ব কি প্রক্রিয়ায় গড়ে উঠবে তা আজ এক বিরাট প্রশ্ন।

জাতির মহান জনযুদ্ধের একজন ক্ষুদ্র সৈনিক হিসাবে ভয়াল সেসব যুদ্ধদিনের কথা ভাবলে মনটা বেদনায় ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করে ভাগ্যগুণে আমরা সেদিন জীবন নিয়ে ফিরে আসতে সক্ষম হলেও আমাদের লাখ লাখ সহযোদ্ধা নিজেদের প্রাণ দিয়েছেন আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমিকে স্বাধীন করার জন্য। স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে আজ যদি আমরা কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পারতাম, নতুন প্রজন্মের জন্য যদি আমরা একটি নিরাপদ আবাসস্থল ও নিশ্চিত ভবিষ্যত্ দিয়ে যেতে পারতাম, তাহলে হয়তো মনটাকে প্রবোধ দেয়া যেত। কিন্তু আজ যখন চোখের সামনে কেবলই প্রতিহিংসার ছড়াছড়ি দেখি, বিশ্বজিতের মতো নির্বিরোধ খেটে খাওয়া একজন টগবগে তরুণকে প্রকাশ্যে রাজপথে মধ্যযুগীয় কায়দায় কুপিয়ে হত্যা করতে দেখি, সর্বক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থের প্রাধান্য দেখি, নতুন প্রজন্মের সামনে যখন অনিশ্চিত ভবিষ্যত্ দেখি, তখন বুকটা সত্যিই হাহাকার করে ওঠে।

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক মেয়র ঢাকা সিটি করপোরেশন

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
সিপিবি-বাসদের হরতাল কর্মসূচির প্রতিবাদে ১২টি ইসলামি দলের হরতাল আহ্বান যথার্থ হয়েছে বলে মনে করেন?
3 + 2 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
মে - ২০
ফজর৩:৪৯
যোহর১১:৫৫
আসর৪:৩৪
মাগরিব৬:৩৯
এশা৭:৫৯
সূর্যোদয় - ৫:১৩সূর্যাস্ত - ০৬:৩৪
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :