The Daily Ittefaq
ঢাকা, রবিবার ১৬ ডিসেম্বর ২০১২, ২ পৌষ ১৪১৯, ২ সফর ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মৃতিসৌধে লাখো মানুষ

মুক্তিযুদ্ধ

৭১-এর স্মৃতি

বাবু সারোয়ার

মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতির বড় গর্বের ধন। এই মুক্তিযুদ্ধের জন্যই অপেক্ষা করেছিলাম কখন আমাদের প্রিয় নেতা আহ্বান জানাবে আর আমরা ঝাঁপিয়ে পড়বো পশ্চিমাদের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত করতে। অবশেষে সে দিনটি এলো। এবং রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর শক্রুকে পরাস্ত করে বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলাম। আজ বিজয়ের দিনে বার বার মনে পড়ছে কেন যুদ্ধ করেছিলাম। আমরা যে স্বাধীনতা চেয়েছিলাম এই ৪২ বছর পরও কি আমরা পেয়েছি সেই স্বাধীনতা? আজ যা দেখছি তাতে মনে হয় আমরা যেনো স্বাধীনতা পেয়ে আরও বেশি অস্বাধীন হয়ে পড়ছি। আমরা পারছি না আমাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে, যা দেশের দিকে তাকালেই স্পস্ট হয়ে ওঠে। আমরা তো চাইনি এরকম স্বাধীনতা। যাক সে কথা। মনে পড়ছে যুদ্ধকালীন সময়ের সেই কঠিন দিনগুলোর কথা। যুদ্ধকালীন সময়ে আমার বয়স মাত্র ২১। সে সময় আমি ছাত্রলীগের একজন পরিচিত নেতা ছিলাম। সবচেয়ে যে বিষয়টি সবার নজরে পড়তো তা হলো আমি বঙ্গবন্ধুর একজন কাছের মানুষ ছিলাম। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেশের আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়িয়েছি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দেশের মানুষকে সংগঠিত করার মানসে।

১৯৭১ সালের ১লা মার্চ। ইয়াহিয়া খান হঠাত্ পাকিস্তানের সংসদ অধিবেশন স্থগিত করলে আমি নিজ উদ্যোগে ইকবাল, রেজা, শাহজাহান ও খসরুকে সাথে নিয়ে নারায়ণগঞ্জ রাইফেল ক্লাব থেকে অস্ত্র লুট করে সোজা চলে আসি বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির বাড়িতে (এটাই ছিল স্বাধীনতা যুদ্ধে অস্ত্র লুটের প্রথম ঘটনা)। গিয়ে দেখি বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে শেখ হাসিনা ও আবদুর রাজ্জাক ভাইকে। আমি তাদেরকে বঙ্গবন্ধু কোথায় জানতে চাইলে রাজ্জাক ভাই বঙ্গবন্ধু এই মুহূর্তে হোটেল পূর্বাণীতে বাংলাদেশের সংবিধান লেখার কাজে রয়েছেন বলে জানান। আমি রাজ্জাক ভাইকে বলি এই অস্ত্রগুলো এখন কোথায় রাখবো? উত্তরে রাজ্জাক ভাই আমাকে অস্ত্রগুলো আবু সাঈদ হলের পাশে মাটিতে পুঁতে রাখার কথা বলেন। কথাটা শুনে আমি উত্তেজিত হয়ে যাই। এবং বলি, অস্ত্র লুট করেছি পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে, মাটিতে পুঁতে রাখার জন্য নয়। এই কথা বলেই আমি অস্ত্রগুলো নিয়ে চলে যাই। দু'দিন পর অস্ত্রগুলো দিয়ে ইকবাল হলের মাঠে আমি খসরু, আসম আবদুর রব, আবদুল কুদ্দুস মাখন, শাহজাহান সিরাজ, রেজা শাহজাহান, ইকবাল ও মোস্তফা মন্টু ছাত্রছাত্রীদের ট্রেনিং দেয়া শুরু করি। এবং মাঝে মাঝে নারায়ণগঞ্জ গিয়ে নিজ উদ্যোগে সেখানকার সহপাঠীদের মাঝে অস্ত্রও বিতরণ করি। এমন সময় হঠাত্ আমার পিতা মারা যান। পিতার মৃত্যু শোকে আমি ধরাশায়ী হয়ে পড়ি এবং ফ্লুতে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়ি। আস্তে আস্তে চলে আসে সেই ভয়াল ২৫শে মার্চ। রাত্রে নারায়ণগঞ্জ থেকে দেখা যাচ্ছে ঢাকা জ্বলছে। সে সাথে খবর আসলো ইকবাল হল জ্বালিয়ে দিয়েছে।

হত্যা করা হয়েছে শত শত ছাত্র-ছাত্রীকে। ২৫ মার্চের পর ২৬ মার্চ সব জায়গাতে আতংক। নীরব-নিঃশব্দ। বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার, নেতাশূন্য দেশবাসী। ২৭ মার্চ নারায়ণগঞ্জের শত শত ছাত্রছাত্রী মিছিল নিয়ে উপস্থিত হয় আমাদের বাসায়। তারা বলছে ঢাকা যখন আক্রান্ত হয়েছে তখন নারায়ণগঞ্জও হবে। মনে পড়লো আমাকে আর বসে থাকলে হবে না। নারায়ণগঞ্জকে বাঁচাতে হবে। দেশকে বাঁচাতে হবে। সহযোদ্ধাদের সঙ্গে নিয়ে ফতুল্লা থেকে চাষাড়া পর্যন্ত গাছ কেটে ইট দিয়ে রাস্তায় ব্যারিকেড তৈরি করি। আমি বেশ কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে নারায়ণগঞ্জের কবরস্থানের উল্টো দিকে ব্যারিকেট দিয়ে পাকিস্তানী সৈন্যদের আগমনের জন্য অপেক্ষা করছি। হঠাত্ দেখি পাকিস্তানি পতাকা উড়িয়ে পাক সেনাবাহিনীর দু'টি জিপ সামনের দিকে এগিয়ে আসছে। সাথে সাথে পজিশন নিয়ে আমি আর আমার সঙ্গীরা জিপকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়তে থাকি। ফলে মারা যায় বেশ কজন পাক সৈন্য। শুরু হয় যুদ্ধ। এক সময় পাক সেনাদের আধুনিক অস্ত্রের আক্রমণের মুখে আমরা পালিয়ে যেতে বাধ্য হই। এবং আমরা বালু নদী পার হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। তাকিয়ে দেখি আমার সহযোদ্ধারা কেউ নেই। আমি যখন নদীর ঘাটে পৌঁছি তখন দেখলাম হাজার হাজার মানুষ নদী পার হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। এবং লোকজন বলাবলি করছে যুদ্ধে বাবু সারোয়ার মারা গেছে। কথা কটি শুনে আমি আমার শরীর জুড়ে কাদা মেখে নেই। যাতে লোকজন চিনতে না পারে। হাতে রাইফেল ও কোমরে পিস্তল নিয়ে আমি নদী পার হয়ে আশ্রয় নেই স্কুল জীবনের বন্ধু সাংবাদিক জহিরের বাড়িতে। কিন্তু একদিন দেখি পাকিস্তানি সৈন্যরা আগমনের খবর পেয়ে তারা বাড়িতে পাকিস্তানি পতাকা উড়িয়ে দেয়। এ দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে পালিয়ে মুন্সিগঞ্জে চলে আসি। এবং এক হিন্দুর বাড়িতে আশ্রয় নেই। সেখান থেকে পালিয়ে বাড়িতে এসে পিতার চল্লিশা সমাপ্ত করে বড় বোন জাহানারা আমির ও শিশুকন্যা তানিয়াকে (বর্তমানে ব্যারিস্টার তানিয়া) সাথে নিয়ে দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ মাইল পায়ে হেঁটে ও নৌকা করে কলকাতায় চলে আসি। পরে বড় বোন জাহানারা ও শিশুকন্যা তানিয়াকে ভগ্নিপতি ব্যারিস্টার আমিরুলের কাছে রেখে আমি আবার নারায়ণগঞ্জে চলে আসি এবং দীর্ঘ ৯ মাস বেশকিছু সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে দেশমাতৃকাকে হায়েনামুক্ত করি।

লেখক-মুক্তিযোদ্ধা

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
সিপিবি-বাসদের হরতাল কর্মসূচির প্রতিবাদে ১২টি ইসলামি দলের হরতাল আহ্বান যথার্থ হয়েছে বলে মনে করেন?
9 + 4 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
মে - ২০
ফজর৩:৪৯
যোহর১১:৫৫
আসর৪:৩৪
মাগরিব৬:৩৯
এশা৭:৫৯
সূর্যোদয় - ৫:১৩সূর্যাস্ত - ০৬:৩৪
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :