The Daily Ittefaq
ঢাকা, রবিবার ১৬ ডিসেম্বর ২০১২, ২ পৌষ ১৪১৯, ২ সফর ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মৃতিসৌধে লাখো মানুষ

বিজয়ের স্মৃতি

বিজয়ের সুমহান দিনগুলো

তোফায়েল আহমেদ

বিজয়ের দিনের স্মৃতি তর্পণে যখন দেখি আমাদের সেই পুলিশ বাহিনী যারা ২৫ মার্চের কালরাতে রাজার-বাগে গর্জে উঠেছিল স্বাধীনতার পক্ষে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে, আজ তাদের ওপর যুদ্ধাপরাধী-মানবতাবিরোধী অপরাধে যারা অপরাধী '৭১-এর সেই পরাজিত শক্তির আক্রমণ চলে, তখন খুব খারাপ লাগে। আমরা কি কখনো ভেবেছিলাম যে, এমনটি হবে? কি দুর্ভাগ্য আমাদের? পরাজিত শক্তির পুনরুত্থানে প্রতি মুহূর্তে যে বাস্তবতার মুখোমুখি হই, তাতে কেবলি মনে হয়, বিজয়ের আনন্দ ক্ষণস্থায়ী, আর পরাজয়ের গ্লানি দীর্ঘস্থায়ী!

প্রতি বছর ১৬ ডিসেম্বর যখন আমাদের জীবনে ফিরে আসে তখন কত কথা, কত স্মৃতি মনে পড়ে। দীর্ঘ ৯ মাস বন্ধু রাষ্ট্র ভারতে অবস্থান করেছি। দেরাদুনে আমাদের ট্রেনিং হতো। ট্রেনিংপ্রাপ্ত মুজিববাহিনীর সদস্যদের যুদ্ধের সাজে রণাঙ্গনে প্রেরণের পূর্বে অশ্রুসজল চোখে বঙ্গবন্ধু মুজিবকে উদ্দেশ করে আমরা সমস্বরে বলতাম, প্রিয় নেতা, তুমি কোথায় আছ, কেমন আছ, জানি না! যতক্ষণ আমরা প্রিয় মাতৃভূমি তোমার স্বপ্নের বাংলাদেশকে হানাদার মুক্ত করতে না পারবো, ততক্ষণ আমরা মায়ের কোলে ফিরে যাবো না। বিজয়ের অপার আনন্দ সত্ত্বেও বেদনা-ভারাক্রান্ত হূদয়ে স্মরণ করি আমার সেইসব বীর ভাইদের, যারা মায়ের কোল খালি করে, দেশমাতৃকার স্বাধীনতার জন্য নিজেদের জীবন উত্সর্গ করেছেন।

১৬ ডিসেম্বর বিকাল ৪টা ৩০ মিনিটে ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণ আর আমাদের মহান বিজয় সূচিত হওয়ার সাথে সাথে আমি ছুটে গিয়েছিলাম থিয়েটার রোডে অবস্থিত মুজিবনগর সরকারের সদর দপ্তরে। সেখানে অবস্থান করছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি শ্রদ্ধেয় সৈয়দ নজরুল ইসলাম, সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ, মন্ত্রিপরিষদ সদস্য মনসুর আলী এবং কামারুজ্জামান-সহ অন্য নেতৃবৃন্দ আমাদের বুকে টেনে নিয়ে আদর করেছিলেন। আজ প্রিয় মাতৃভূমিকে আমরা হানাদার মুক্ত করতে পেরেছি, মনের গভীরে যে কি উচ্ছ্বাস কি আনন্দ,সেই আনন্দ-অনূভূতি অনির্বচনীয়! স্বাধীন বাংলার যে ছবি জাতির জনক হূদয় দিয়ে অঙ্কন করে নিরস্ত্র বাঙালি জাতিকে সশস্ত্র করে বজ্রকণ্ঠে বলেছিলেন, কেউ আমাদের দমাতে পারবে না। পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মধ্যদিয়ে বাঙালি জাতি নেতার কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিল।

১৮ তারিখ আমি এবং রাজ্জাক ভাই হেলিকপ্টারে ঢাকায় ফিরে যখন স্বাধীন বাংলার মাটি স্পর্শ করি, তখন চতুর্দিকে আনন্দের বন্যা। আমরা প্রথমেই ছুটে গিয়েছিলাম ধানমণ্ডির ১৮ নং বাড়িতে, যেখানে বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী শ্রদ্ধেয়া ভাবী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা ও শেখ রাসেলসহ বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যবৃন্দ বন্দী করে রাখা হয়েছিল।

যে বাংলার শ্লোগান তুলেছিলাম রাজপথে, যে বাংলার জন্য বঙ্গবন্ধুর গতিশীল নেতৃত্বে কাজ করেছি, পরমাকাঙ্ক্ষিত সেই বাংলাদেশ আজ স্বাধীন হয়েছে। আজ আমরা হানাদার মুক্ত, স্বাধীন। মুজিবনগর সরকারের নেতৃবৃন্দ অপূর্ব দক্ষতার সাথে, দল-মত-শ্রেণী নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে, আস্থা ও বিশ্বাস নিয়ে, সফলভাবে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন ২২ ডিসেম্বর। বিমানবন্দরে নেতৃবৃন্দকে বিজয়মালা দিয়ে অভ্যর্থনা জানাই। চারদিকে লক্ষ লক্ষ মানুষ। মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনি 'জয়বাংলা' শ্লোগানে চারদিক মুখরিত। সর্বত্র মুক্তিযোদ্ধাদের সমাবেশ আর আনন্দ মিছিল। মানুষ ছুটে আসছে আমাদের দেখতে। বিজয়ের সেই দিনগুলোতে বাংলার মানুষের চোখে-মুখে গৌরবের যে দীপ্তি আমি দেখেছি,সেই রূপ চিরবিজয়ের গৌরবমন্ডিত আলোকে উদ্ভাসিত। স্বজন হারানোর বেদনা সত্ত্বেও প্রত্যেক বাঙালির মুখে ছিল পরম পরিতৃপ্তির হাসি,যা আজও আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কিন্তু বিজয়ের আনন্দ ছাপিয়ে কেবলই মনে পড়ছিল প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধুর কথা। যার সাথেই দেখা হয়, সকলেই জানতে চান, বঙ্গবন্ধু কোথায় আছেন, কেমন আছেন, কবে ফিরবেন? বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য সর্বস্তরের মুক্তিকামী বাঙালির ঘরে ঘরে রোজা রাখা, বিশেষ দোয়ার আয়োজন চলছিল। বঙ্গবন্ধুবিহীন বিজয় অপূর্ণ। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে অক্টোবরে বঙ্গবন্ধুর ফাঁসির আদেশ হয়েছিল। দেশ স্বাধীন না হলে ডিসেম্বরেই তাঁকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলানো হতো। কিন্তু আমরা জানতাম বীর বাঙালির ওপর নেতার আস্থার কথা। তিনি তো গর্ব করে বলতেন, তারা আমাকে হত্যা করতে পারে। কিন্তু বাংলার মানুষকে তারা দাবিয়ে রাখতে পারবে না। ওরা আমাকে হত্যা করলে লক্ষ মুজিবের জন্ম হবে। ১৬ ডিসেম্বর হানাদার মুক্ত হয়ে বিজয় অর্জন করার পরেও আমরা নিজদেরকে স্বাধীন ভাবতে পারি নাই। কারণ, বঙ্গবন্ধু তখনও পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী। আমরা পরিপূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন করেছি সেদিন,যেদিন '৭২-এর ১০ জানুয়ারি বুকভরা আনন্দ আর স্বজন-হারানোর বেদনা নিয়ে জাতির পিতা তাঁর স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে এসেছিলেন।

লেখক:সংসদ সদস্য ও সভাপতি, শিল্প মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয়

স্থায়ী কমিটি [email protected]

এই পাতার আরো খবর -
font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
সিপিবি-বাসদের হরতাল কর্মসূচির প্রতিবাদে ১২টি ইসলামি দলের হরতাল আহ্বান যথার্থ হয়েছে বলে মনে করেন?
3 + 9 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
সেপ্টেম্বর - ২৭
ফজর৪:৩৩
যোহর১১:৫০
আসর৪:১০
মাগরিব৫:৫৩
এশা৭:০৬
সূর্যোদয় - ৫:৪৮সূর্যাস্ত - ০৫:৪৮
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected]com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :