The Daily Ittefaq
ঢাকা, রবিবার ১৬ ডিসেম্বর ২০১২, ২ পৌষ ১৪১৯, ২ সফর ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মৃতিসৌধে লাখো মানুষ

অর্জনের শীর্ষে কৃষি

শাইখ সিরাজ

আজ মহান বিজয় দিবস। বিজয়ের বিয়াল্লিশ বছরে পৌঁছে গেছি আমরা। আর মাত্র আট বছর পরই বাংলাদেশ পৌঁছে যাবে তার অর্ধশতকে। সময়ের হিসেবে বাংলাদেশের এখনকার বয়সটি বেশ পরিণত। স্বাধীনতার পর একটি দেশ সার্বিকভাবে গুছিয়ে উঠতে কত বছর সময় লাগে- এ নিয়ে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে নানা রকম হিসেব রয়েছে। তবে আমাদের সম্পদ আর শক্তিকে কাজে লাগিয়ে এই একচল্লিশ বছরে আমরা একটি ক্ষেত্রে অন্তত গুছিয়ে উঠেছি। আর তা হচ্ছে খাদ্য উত্পাদন। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত আমাদের খাদ্য উত্পাদন বৃদ্ধির হার জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে একরকমের সমতা রেখেই এগিয়েছে। চাহিদা যেমন তৈরি হয়েছে উত্পাদনও এসেছে। স্বাধীনতার পর পরই একের পর এক উচ্চ ফলনশীল ধান কৃষক পর্যায়ে ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানী ও সম্প্রসারকদের ঐক্যবদ্ধ তত্পরতা আর মাঠে ফসল উত্পাদনে কৃষকের প্রাণান্ত পরিশ্রম আজ ১৬ কোটি মানুষকে অন্তত একটি বিষয়ে নিশ্চিন্ত রেখেছে, তা হচ্ছে খাদ্য। সরকারি হিসেবে, এখন এদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এর আগে স্বাধীনতার চল্লিশ বছর ধরেই আমাদের বছরে ১০ লাখ থেকে শুরু করে ৩০ লাখ টন পর্যন্ত খাদ্যশস্য আমদানি করতে হয়েছে। এখন আর আমদানির চিন্তা থেকে মুক্ত হয়ে সরকার ভাবছে রফতানির কথা। একাত্তর সালে এক কোটি টন খাদ্যশস্যের জায়গায় এখন দেশে উত্পাদিত হচ্ছে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টন খাদ্যশস্য। এই বিশাল অর্জনের জন্য আমরা কাকে কতখানি মূল্যায়ন করছি সেটি বিবেচ্য।

খাদ্য উত্পাদনে এমন একটি সফল প্রেক্ষিত রচনা করতে কৃষককে কতটা ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে- সেই কথাটি বিজয়ের বিয়াল্লিশ বছরে এসে আমরা কি ভাবছি? দেশের মানুষের মুখে খাদ্য তুলে দিতে গিয়ে কৃষক কোথা থেকে কোথায় পৌঁছেছে সে বিষয়টিই আজ খতিয়ে দেখার দিন। দৃশ্যত আমরা স্বাধীনতার বিয়াল্লিশ বছর ধরে কৃষকের দুর্দশা ও দুর্ভোগ বলতে যা দেখেছি তা হচ্ছে উপকরণের জন্য কৃষকের দীর্ঘ অপেক্ষা, হয়রানি আর উপেক্ষা। এর বাইরে তেমন কিছু আমাদের চোখে পড়েনি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে স্বাধীনতার বিয়াল্লিশ বছরে লক্ষ লক্ষ কৃষক ভূমিহীন হয়েছে। বাপ-দাদার পৈত্রিক পেশা কৃষি ছেড়ে শহরে পাড়ি জমাতে বাধ্য হয়েছে। বেড়েছে সার্বিক দারিদ্র। অর্থনীতিবিদদের হিসেবেই দেশে বর্তমানে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৪ কোটি। কারো কারো হিসেবে দেশে মোট দরিদ্র জনগোষ্ঠি ৫৪ শতাংশ। ১৯৮৪-৮৫ সালে গ্রামীণ জনসংখ্যার ৬১ ভাগ ছিল ভূমিহীন, এখন তা দাঁড়িয়েছে ৭১ ভাগে। সরকারি হিসাব নিকাশে বলা হচ্ছে, দারিদ্র ৪০ ভাগ থেকে কমে ৩১ ভাগে এসেছে। বাস্তবতা হচ্ছে দারিদ্র ও দরিদ্র কোনোটাই কমেনি। একই সঙ্গে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান বেড়ে হয়েছে অনেক দীর্ঘ। সরকারিভাবে দরিদ্র মাপা হয়, প্রতিদিন একজন মানুষ ২ হাজার ১'শ ২২ ক্যালরি খাদ্য গ্রহণ করছে কি-না সে হিসাবের ওপর। কিন্তু শুধু চাহিদা মত ক্যালরি গ্রহণের হিসাবই কি দারিদ্রমুক্তির মাপকাঠি হতে পারে? মানুষের বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এগুলোও তো সংবিধান স্বীকৃত মৌলিক অধিকার। এ চাহিদা পূরণ না হওয়া পর্যন্ত মানুষের দারিদ্রমুক্তির কোনো হিসাবই করা সম্ভবপর বলে আমি মনে করি না। দাতাগোষ্ঠি আর স্থানীয় উন্নয়ন সংগঠনগুলো দারিদ্রের নতুন নতুন নাম দিয়েছেন। অতিদরিদ্র, হতদরিদ্র, দরিদ্র ইত্যাদি।

আমাদের শত প্রতিবন্ধকতা। জলবায়ু পাল্টাচ্ছে। এককটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ কাটিয়ে স্বাভাবিক হতে কেটে যাচ্ছে বহুদিন। বিপন্ন প্রকৃতিতে মানুষ খুঁজে বেড়াচ্ছে টিকে থাকবার নিশানা। সিডর ও আইলার মত প্রাকৃতিক দুর্যোগ কবলিত এলাকায় শত শত কোটি টাকার অর্থ সহায়তা এ পর্যন্ত বিভিন্ন দাতাগোষ্ঠি, এনজিওসহ নানা মাধ্যমে

পৌঁছেছে, কিন্তু সঠিক পরিকল্পনার অভাবে ওই অঞ্চলগুলোর কৃষি এখনো সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। দাঁড়াতে পারেনি কৃষক পরিবারগুলো। বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরে ধানের লবণসহিষ্ণু, বন্যাসহিষ্ণু, খরাসহিষ্ণু জাত উদ্ভাবনে নিয়োজিত রয়েছেন। কিন্তু দেশের উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর প্রাকৃতিক বৈরিতা যেভাবে বাড়ছে তাতে বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত ধানের জাতগুলো কোনো কোনো জায়গায় মোটেই কাজে আসছে না।

আজ আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন ও কৃষি সাফল্য শুধু দেশে নয় বিশ্বের কৃষি উন্নত দেশগুলোর কাছে একটি দৃষ্টান্ত। কিন্তু এর পাশাপাশি একটি নেতিবাচক দিকও সূচিত হয়েছে। তা হচ্ছে, আমাদের কৃষকরা বছরের পর বছর তাদের বহু কষ্টে উত্পাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। আমরা কোনো পদ্ধতিতেই নিশ্চিত করতে পারছি না কৃষি পণ্যের সঠিক মূল্য। একের পর এক সব কৃষি উপকরণেরই দাম বাড়ছে। বৈরী প্রকৃতি মোকাবিলা করে ফসল উত্পাদন করতে গিয়ে কৃষকের সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিক বাবদ যা ব্যয় করতে হচ্ছে, সে হিসাবে ফসলের দাম পাচ্ছেন না। পর পর তিন বছর আমন-বোরো কোনো মৌসুমেই কৃষক ধানের দাম পাননি। কেবল বাজারে যাওয়া কৃষকের আমন ধানের মূল্যও পাচ্ছেন না কৃষক। প্রতি মণ ধান উত্পাদনে কৃষকের যেখানে ব্যয় হয়েছে সর্বনিম্ন ৬'শ টাকা ও সর্বোচ্চ ৭'শ টাকা (বর্গা চাষির জন্য)। সেখানে ধানের মণ ৫'শ থেকে ৫'৬০ টাকা পর্যন্ত। আজকের সময়ের আমাদের কৃষককুল অনেক সচেতন, বিচক্ষণ ও পরিশ্রমী। বছরের পর বছর কৃষি পণ্যের মূল্য না পেয়ে হতাশ হয়ে তাই সে উচ্চারণ করছে, ' আমাদের ভর্তুকি দরকার নেই, আমাদের উত্পাদিত কৃষি পণ্যের ১০ ভাগ লাভ নিশ্চিত করলেই যথেষ্ট।'

এটি কৃষকের হতাশা আর আবেগের কথা। বাস্তব অর্থে তার জন্য কৃষি উত্পাদনে পর্যাপ্ত ভর্তুকি ও কৃষি পণ্যের ন্যায্যমূল্য দুই-ই প্রয়োজন। প্রয়োজন কৃষি গবেষণা ও সম্প্রসারণে কার্যকর দৃষ্টি দেয়া। এমনকি, কৃষকের জন্য নীতি পরিকল্পনা ও জাতীয় বাজেট আরো সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবমুখি হওয়া দরকার। কারণ, জনসংখ্যার বিস্ফোরণ, দ্রুত অবাদি জমি কমে আসা ও জলবায়ুর বিরূপ পরিস্থিতি আমাদের আগামীর খাদ্য নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রসঙ্গত বলতে চাই, ১৯৭১ সালে দেশে ধনী মানুষের সংখ্যা ছিল হাতেগোনা। এখন মোট জনগোষ্ঠির ২.৯ ভাগ মানুষ ধনী। লক্ষাধিক মানুষের ব্যাংক হিসেবে রয়েছে কোটি টাকার উপরে। তাদের সম্পদ আগের তুলনায় বহুগুণ বেশি। একাত্তরে একেবারে হতদরিদ্র ছিল এমন বহু মানুষ এখন কোটিপতি। হিসাব কাঠামো এগোচ্ছে হিসেবের জায়গায়, কিন্তু মানুষের কষ্ট, পাওয়া না পাওয়ার হিসাবটি অন্যরকম। কিন্তু এখনো রাষ্ট্রের সিংহভাগ প্রান্তিক মানুষ, যারা রক্ত ঘাম একাকার করে এই দেশের অর্থনীতি টিকিয়ে রাখছেন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করছেন- তারা সব সময় রাজনৈতিক দলগুলোর হানাহানির বিপক্ষে।

আজ মহান বিজয় দিবসে কৃষকের পক্ষ থেকে সরকার, নীতি-নির্ধারক, রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ থেকে শুরু করে সবার কাছে আহ্বান- আসুন লালসবুজের পতাকা শোভিত প্রিয় মাতৃভূমির শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্যে স্বাধীনতার পর এদেশে সবচেয়ে বড় অর্জন যাদের, সেই কৃষকের পাশে দাঁড়াই। ভাবি আগামীর জন্য টেকসই একটি খাদ্য নিরাপত্তা শৃংখলের কথা।

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
সিপিবি-বাসদের হরতাল কর্মসূচির প্রতিবাদে ১২টি ইসলামি দলের হরতাল আহ্বান যথার্থ হয়েছে বলে মনে করেন?
7 + 3 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
জুলাই - ১৮
ফজর৩:৫৬
যোহর১২:০৫
আসর৪:৪৪
মাগরিব৬:৫১
এশা৮:১৩
সূর্যোদয় - ৫:২১সূর্যাস্ত - ০৬:৪৬
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsect[email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :