The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৩, ০২ পৌষ ১৪২০, ১২ সফর ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ সাতক্ষীরায় যৌথ বাহিনীর অভিযানে নিহত ৫ | পেট্রোল বোমায় আহত অটোরিকশা চালকের মৃত্যু | আলোচনার মাধ্যমে সংবিধানের মধ্যে থেকে নির্বাচন : হানিফ | গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলনে জনগণের বিজয় হবে : ফখরুল | পরাজিত শক্তি জাতিকে বিভক্ত করতে তত্পর : তোফায়েল | আবার ৭২ ঘণ্টার অবরোধ | সিরিরায় বিমান হামলায় নিহত ২২ | চীনের জিনজিংয়াংয়ে সংঘর্ষে ২ পুলিশসহ নিহত ১৬

বীরাঙ্গনা নাম যেভাবে হলো

মো. আব্দুল বাকী চৌধুরী নবাব

একাত্তরের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আজ আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছি। এ জন্য ত্রিশ লক্ষ শহীদের প্রায় চৌদ্দ হাজার টন রক্তের বদৌলতে আলপনা আঁঁকা সবুজের মধ্যে উদীয়মান টকটকে লাল সূর্য সম্বলিত পতাকা। অবশ্য এ অবদানের আর একটি বিষয় খুব একটা আমলে আনি না, তা হলো সম্ভ্রম ও ইজ্জত হারানো নারীদের আর্তনাদ। এ প্রেক্ষাপটে উল্লেখ্য যে, নারীদের অমূল্য সম্পদ হলো তাদের নারীত্ব প্রসূত সম্ভ্রম বা ইজ্জত (Chastity)। সত্যিকার অর্থে এ ইজ্জত হারানো মা-বোনদের সংখ্যা কত, তা বলা সুকঠিন। কেননা এ ধরনের নেতিবাচক ঘটনা ঘটলেও অনেকে মান-সম্মানের ভয়ে গোপন রেখেছে এবং সঙ্গত কারণেই প্রকাশ করেনি। আর যেগুলো জানাজানি বা আহত অবস্থায় গোচরে এসেছে এবং স্বামী বা সংসার থেকে সমর্থন পায়নি, তাদের নাম কেবল জনসমক্ষে উঠে এসেছে।

সত্তর দশকে পাবনা জেলার বেড়া, সুজানগর ও সাথিয়া উপজেলায় প্রায় প্রতিবছর যমুনা নদীর পানিতে প্লাবিত হয়ে লক্ষ লক্ষ একর জমির আমন ধান নষ্ট হয়ে যেতো। স্থানীয় অধিবাসীদের এটি বাঁচা-মরার দাবী ছিল। যদিও বিষয়টি বঙ্গবন্ধু তত্কালীন পাকিস্তান আমল থেকেই জানতেন। এ বড় মনের অধিব্যক্তিত্ব বিশেষ ব্যবস্থায় বিদেশী অনুদান নিয়ে একটি বন্যা প্রতিরোধক বাঁধ দেয়ার কথা ভাবলেন। যে কথা সেই কাজ। বাঁধটি নগরবাড়ী ঘাটের আগ হতে কাজীর হাট পর্যন্ত তৈরী করার মনস্থ করলেন। সব ঠিক হয়ে গেল। পূর্ব প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেল। পাবনার বেড়া উপজেলাস্থ নগরবাড়ীর উত্তর দিকে বসন্তপুর গ্রাম সংলগ্ন মেঠো জমিতে মঞ্চ তৈরী করা হলো। কাজের শুভ উদ্বোধন করবেন স্বয়ং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

সেদিন ছিল ১৯৭২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি, রোজ শনিবার সকাল ১০ টায় অনুষ্ঠানসূচী মোতাবেক বঙ্গবন্ধু যথারীতি হেলিকাপ্টারে আসলেন। উল্লেখ্য, যে মাঠে এ মহতী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল, এত লোকের সমাগম হয়েছিল যে, সেথায় লোক আর ধরে না। যাহোক, বঙ্গবন্ধু কোদাল দিয়ে মাটি কেটে টুকরীর মধ্যে করে বাঁধের স্থানে ফেলে শুভ উদ্বোধন করলেন (বর্তমানে স্থানীয়ভাবে সেটি মুজিব বাঁধ হিসেবে পরিচিত)। পরবর্তী কার্যক্রম হিসেবে যথারীতি সভা শুরু হলো, পূর্বদিকে মুখ করা মঞ্চে উপবিষ্ট ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, মোস্তাক আহমেদ, মধ্যে বঙ্গবন্ধু, তত্পর এমপিদ্বয় যথাক্রমে অধ্যাপক আবু সাঈদ এবং আহমেদ তোফিজ উদ্দিন। নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে অন্যতম হিসেবে এর দায়িত্বে আমিও ছিলাম। তাই এখনও মনে পড়ে, এত জনস্রোত হয় যে, গেট সামলানো অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। এখানে একটি কথা না বললেই নয়। স্থানীয়ভাবে এর তদারকীতে ছিলেন এমপি আবু সাঈদ। তবে এক্ষেত্রে তত্কালীন ডাক-সাইটে যুব নেতা আব্দুল কাদের (পাবনা জেলা ছাত্র লীগের সভাপতি ও পাবনা শহরস্থ বুলবুল কলেজের ছাত্র সংসদের ভিপি) এর ভূমিকা বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। সভা শুরু হলে পূর্বের সিডিউল অনুযায়ী আবুল কাদের ঘোষকের দায়িত্বে থেকে পর্যায়ক্রমে ইতিবৃত্ত তুলে ধরে নাম ঘোষণা করতে থাকেন। যাহোক, স্থানীয় এমপি আবু সাঈদ সাহেব শানে নুযুলসহ স্বাগত ভাষণ রাখলেন। তত্পর যথা নিয়মে বক্তৃতা চলছে, হঠাত্ করে মঞ্চের উত্তর পশ্চিম কর্নারে দুই/তিন জন মহিলার শোরগোল শোনা গেল। তারা বঙ্গবন্ধুর কাছে আসতে চায়। কিন্তু এহেন সময় বারণ করার কারণে তারা বেপরোয়া হয়ে উঠে এবং জোরে চিত্কার করতে থাকে। বিষয়টি তখন বঙ্গবন্ধুর নজরে পড়ে। বিশাল সাদা মনের মানুষ বঙ্গবন্ধু বললেন "ওদের আসতে দাও"। এ সুযোগে তারা তীর বেগে ছুটে আসে এবং বঙ্গবন্ধুর পায়ে আছড়ে পড়ে। তাদের মধ্যে একজন নীল কাপড় পড়া ৩০/৩৫ বছর বয়সী মহিলা পাকবাহিনী কর্তৃক লাঞ্চনার যে বর্ণনা দিলেন, তাতে গা শিহরিত হয়ে উঠে। সর্বোপরি ঐ মহিলা বলেন, আগে স্বামীর সাথে খুবই সু-সম্পর্কসহ সুখের সংসার ছিল। কিন্তু বর্তমানে এ অবাঞ্চিত কারণেই স্বামী তাকে ঘরে তুলছেন না এবং আশে পাশের সমাজের মানুষ নাকি মুখ চেপে হাসে, আর টিপ্পনী কাটে। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, যতদূর আমি শুনেছি ঐ মহিলাটি গাজনা বিলের উত্তর পার্শ্বের চরদুলাই গ্রামের বাসিন্দা। বঙ্গবন্ধু সব কিছু মনোযোগ সহকারে শুনলেন এবং মাথায় হাত দিয়ে বললেন, "আচ্ছা মা, বিষয়টি বিশেষভাবে আমি দেখবো।"

এর মধ্যে অন্যান্যদের বক্তৃতাপর্ব শেষ হয়ে গেল। বঙ্গবন্ধু বক্তৃতা দিতে উঠলেন উপর্যুপরি করতালি বাজতে লাগলো। তিনি প্রথমে শুভেচ্ছা বিনিময়পূর্বক যে কথা বললেন, "আজ থেকে পাকবাহিনী নির্যাতিতা মহিলারা সাধারণ মহিলা নয়, তারা এখন থেকে বীরাঙ্গনা খেতাবে ভূষিত। কেননা দেশের জন্য তাঁরাই ইজ্জত দিয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের চেয়ে তাদের অবদান কম নয় বরং কয়েক ধাপ উপরে, যা আপনারা সবাই জানেন, বুঝিয়ে বলতে হবে না। তাই তাদের বীরাঙ্গনার মর্যাদা দিতে হবে এবং যথারীতি সম্মান দেখাতে হবে। আর সে স্বামী বা পিতাদের উদ্দেশ্যে আমি বলছি যে আপনারাও ধন্য। কেননা এ ধরনের ত্যাগী ও মহত স্ত্রীর স্বামী বা পিতা হয়েছেন।" যাহোক, সে দিন থেকে "বীরাঙ্গনা" নামক সম্মানসূচক উপাধি প্রবর্তিত হয়েছে। তাই মনে করি বীরাঙ্গনার জন্য এ দিনটি (২৬/০২/১৯৭২) খুবই তাত্পর্যপূর্ণ। আজ দেশপ্রেমিক বঙ্গবন্ধু এ ভূবনে নেই। কিন্তু তাঁর কথাটি চির ভাস্বর হয়ে থাকবে, যতদিন বাংলাদেশ থাকবে। ঐ নির্যাতিতা মহিলারা কি সে মর্যাদা পাচ্ছে? হয়তো বয়োবৃদ্ধের কারণে অনেকেই বেঁচে নেই। যদি বেঁচে থাকা কোন নির্যাতিতা মহিলা আপনাদের আশে-পাশে থাকে, তাহলে কিছু না দিতে পারলেও সম্মানটুকু দেবেন। মনে রাখবেন আমরা সবাই তাদের ত্যাগের কাছে ঋণী ও দায়বদ্ধতায় আবদ্ধ।

লেখক:গবেষক

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মো. নাসিম বলেছেন, 'বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হওয়া সুখবর না হলেও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে নির্বাচন করতে হচ্ছে'। আপনিও কি তাই মনে করেন?
2 + 3 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
জুন - ২০
ফজর৩:৪৩
যোহর১২:০০
আসর৪:৪০
মাগরিব৬:৫১
এশা৮:১৬
সূর্যোদয় - ৫:১১সূর্যাস্ত - ০৬:৪৬
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :