The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৩, ০২ পৌষ ১৪২০, ১২ সফর ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ সাতক্ষীরায় যৌথ বাহিনীর অভিযানে নিহত ৫ | পেট্রোল বোমায় আহত অটোরিকশা চালকের মৃত্যু | আলোচনার মাধ্যমে সংবিধানের মধ্যে থেকে নির্বাচন : হানিফ | গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলনে জনগণের বিজয় হবে : ফখরুল | পরাজিত শক্তি জাতিকে বিভক্ত করতে তত্পর : তোফায়েল | আবার ৭২ ঘণ্টার অবরোধ | সিরিরায় বিমান হামলায় নিহত ২২ | চীনের জিনজিংয়াংয়ে সংঘর্ষে ২ পুলিশসহ নিহত ১৬

অর্থনৈতিক স্বয়ম্ভরতা অর্জনে বিকল্প নেই

ড. মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ

দীর্ঘদিনের ঔপনিবেশিক শাসনামলে অর্থনৈতিক শোষণ, বঞ্চনা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে বাংলাদেশের জনগণ ১৯৪৭ সালে বৃটিশ ভারত থেকে এবং ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করে। সুদীর্ঘকাল বিদেশি শাসন ও শোষণে বিপর্যস্ত এদেশের অর্থনৈতিক জীবনযাত্রায় মৌল পরিবর্তনের প্রত্যাশা ও প্রয়াসও দীর্ঘদিনের। এদেশের রাজনীতি মূলত এবং মুখ্যত আপামর জনসাধারণের অর্থনৈতিক মুক্তি এবং সম্পদের বন্টন ব্যবস্থায় বৈষম্য দূরীকরণের দাবিকে কেন্দ্র করে, বিশেষ করে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার অনির্বাণ আকাঙ্ক্ষাকে ঘিরে দানা বাঁধে।

বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের এমন একটি উন্নয়নকামী দেশ যেখানে সর্বোচ্চ ত্যাগস্বীকারে প্রস্তুত সাধারণ জনগোষ্ঠীর শ্রম ও কৃচ্ছ্রতায়, অবকাঠামোগত উন্নয়নহেতু সৃষ্ট সক্ষমতায় এবং সর্বোপরি সুজলা সুফলা মাটি ও মৌসুমী আবহাওয়ার অবদানে প্রকৃতির উদার সমর্থনে অর্জিত সাফল্য আত্মসাত্ অপব্যবহারে জাতীয় সম্পদ ও স্বার্থের অপচয় অবক্ষয়ের শিকার বলে বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা যায়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, দৈব দুর্বিপাক ছাড়াও যথার্থ জবাবদিহিতার দুর্বলতায় এবং স্বচ্ছতার অস্বচ্ছতায় দায়িত্বহীন পদক্ষেপে অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রয়াস প্রচেষ্টায় প্রত্যাশিত ফল লাভ ঘটেনি। আপামর জনসাধারণের অযুত কল্যাণ-প্রতিশ্রুতিদানকারী নেতৃত্বের উদাত্ত আহ্বানে সাড়া দিয়ে অগণিত আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত রাজনৈতিক স্বাধীনতা সত্ত্বেও অর্থনৈতিক সাফল্যের ফসল অবৈধ আত্মসাতে হারাবার আশংকায় যখন সংক্ষোভ ও নেতিবাচক মনোভাব পরিব্যপ্ত হয়ে ওঠে তখন সংকট সন্ধিক্ষণে অকুতোভয় দৃঢ়চিত্ত জাতিগোষ্ঠীর মধ্যেও উন্নয়ন অভীপ্সায় অনীহা ও উন্নাসিকতা দেখা দিতে পারে, নৈতিক মূল্যবোধের ভিত নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে এবং এরূপ পরিবেশ পরিস্থিতিতে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার পথে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার ১৯০ বছর শাসন ব্যবস্থা থেকে ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময় 'মুসলমান অধ্যুষিত অঞ্চলসমূহের রাষ্ট্র' পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে তদানীন্তন পূর্ববাংলার জনগণের সামনে প্রথম যে রাজনৈতিক স্বাধীনতা আসে তা ছিল একটি অনগ্রসরমান জনপদের সহসা সম্বিত ফিরে পাবার মত অবস্থা। পূর্ববাংলা ধান ও পাট উত্পাদনে অগ্রগণ্য হলেও ১৯৪৭ পূর্ব প্রেক্ষাপটে এখানে কোন কার্যকর শিল্প গড়ে ওঠেনি, এমনকি এখানে খাদ্য ও কৃষিনির্ভর শিল্প গড়ে ওঠার পর্যাপ্ত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও। বিভাগ পূর্ব কালে কার্যত কলকাতা কেন্দ্রিক শিল্প পরিবেশ প্রতিবেশের পশ্চাদ ভূমি ছিল পূর্ববাংলা। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগোত্তর রাজনৈতিক স্বাধীনতা লাভের সময় দেখা যায় পূর্ববাংলার ভাগে শিল্প কলকারখানা তেমন কিছুই নেই। নেই প্রশিক্ষিত কোন প্রশাসক, দক্ষ শ্রমিক কিংবা শিল্পোদ্যোক্তা । শিল্পায়নের পূর্বশর্ত উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। সে ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি ছিল আরো নাজুক । ভারত বিভাগের পর হাজার মাইল দূরের পশ্চিম পাকিস্তানি শিল্প মালিকানায় পূর্ববাংলায় এখানকার কাঁচামাল ব্যবহার করে কয়েকটি পাট, কাগজ, দিয়াশলাই শিল্প কারখানা স্থাপিত হয়। পুরো পাকিস্তানি শাসল আমলে (১৯৪৭ - ১৯৭১) অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা, সরকারের সিদ্ধান্তহীনতা এবং কেন্দ্রের পক্ষপাতিত্বের ফলে সংখ্যা গরিষ্ঠ জনসংখ্যা অধ্যুষিত এবং প্রাকৃতিক সম•দ সম্ভারের প্রদেশ হয়েও পূর্ববাংলার (১৯৫৬'র পর পূর্ব পাকিস্তান) স্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তাদের দ্বারা কোন ভারি শিল্প প্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি হয়নি। অনুকূল পরিবেশ তথা রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য সহায়তা ক্ষুদ্র এমনকি মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও ছিল মহার্ঘ। সে সময় ইপিআইডিসি এবং ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থার পত্তন হলেও স্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তাদের মধ্যে এগিয়ে আসার আগ্রহ জাগিয়ে তোলার মত কার্যকর পৃষ্ঠপোষকতা দানের বিষয়টি ছিল বরাবরই দুর্বল। পূর্ব পাকিস্তানের কাঁচা পাট এবং পাটকলগুলোতে উত্পদিত পাটজাত সামগ্রী, এখানকার চামড়া ও চা গোটা পাকিস্তানের সিংহভাগ রপ্তানি আয়ের উত্স হলেও সে বাবদ অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা এখানকার শিল্প পরিবেশ উন্নয়নে কার্যকর প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগে ব্যবহূত হয়নি। অথচ একই সময়ে পশ্চিম পাকিস্তানে ভারি শিল্প প্রতিষ্ঠা এবং কাঁচামাল আমদানি করে সেখানকার নানান শিল্প কলকারখানাকে স্বয়ম্ভর করে তোলার প্রয়াস চলেছে।

শিল্প ব্যবসা বাণিজ্যে বঞ্চনার প্রত্যক্ষ শিকার পূর্ব পাকিস্তানি জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক অধিকারসহ অর্থনৈতিক উন্নয়নে স্বাধিকার আদায়ের চেতনা জাগ্রত হয়। অফিস আদালতে চাকরি, পদোন্নতি ও দায়িত্বপ্রাপ্তিসহ জাতীয় বিভিন্ন পর্যায়ে পূর্ব পাকিস্তানীদের ন্যায্য হিস্যা প্রাপ্তি নানান অজুহাতে উপেক্ষিত হচ্ছিল। পাকিস্তানের উভয় অংশের মধ্যে বৈষম্যের বিষয়গুলো ক্রমান্বয়ে স্পষ্টতর হতে থাকলে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষিত তরুণ সমাজের মধ্যে ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে প্রথমে এবং পরে সমগ্র জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভক্তির মূলে দীর্ঘদিনে বৃটিশ শাসনে শোষণ বঞ্চনার বিষয় থাকলেও র্অথনৈতিক মুক্তিলাভের আকাঙ্ক্ষা সে সময় ততটা স্পষ্ট ছিল না যতটা স্পষ্ট ছিল ধর্মীয় অনুভূতি উত্সারিত স্বাতন্ত্র্য স্বীকৃতি লাভের আকাঙ্ক্ষা । ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে স্বাধীনতা সংগ্রামের পরিণতি তার সার্বিক চিন্তা চেতনার মূলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে ঔপনিবেশিক শাসন শোষণে শিল্প বাণিজ্যে তথা অর্থনৈতিক জীবনযাত্রায় দৃশ্যমান ও সৃষ্ট বৈষম্য, বঞ্চনা ও বেদনার অবসান।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি আন্তঃসহায়ক শক্তি সর্বদা বিদ্যমান। শত সংকট সন্ধিক্ষণেও একটি অন্তঃসলীল (শক্তি) প্রেরণা অর্থনীতিকে সচল রাখতে সচেষ্ট থাকে। তা না হলে শত দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং অপচয়-অবচয়- অবক্ষয়- আত্মসাত্ আর নানান ভুল-ভ্রান্তিতে ভরা লোকসানি পদক্ষেপের কবলে থেকেও অর্থনীতিতে বিদ্যমান ও দৃশ্যমান গতি থাকত না, অর্থনৈতিক-প্রবৃদ্ধির ধারাও এমন পর্যায়ে রাখা সম্ভব হতো না। অর্থনীতিকে বেগবান করার প্রতিশ্রুতি ও প্রয়াসের কথা বলে নানান মডেলে এক্সপেরিমেন্ট চালানোয় বিভিন্ন সময়ে ভিন্নধর্মী নীতি গ্রহণ এবং তাতে মল্যবান সময় ব্যয়, অসচ্ছতা ও জবাবদিহিতার দুর্বলতায় আত্মসাত্ ও অপব্যয় সত্ত্বেও অর্থনীতির স্বাভাবিক অগ্রগতি বিদ্যমান। যদিও এই স্বত:প্রণোদিত সাফল্যকে অনেক সময় নীতি নির্ধারকদের নিজেদের সাফল্য হিসেবে প্রচার ও দাবিও করা হয়ে থাকে। অথচ এরূপ আত্মপ্রচারণা অব্যাহত থাকায় অনুত্পাদনশীল পদক্ষেপে অর্থনীতির অন্তঃসলীল শক্তি যেমন অবক্ষয়ের শিকার হয় তেমনি গণঅংশায়নে স্বতস্ফূর্ত প্রেরণায় ঘটে বিচ্যুতি ও বিভ্রান্তি। নেতিবাচক মনোভাবে সামাজিক অস্থিরতায় অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভাবনার স্বর্ণতোরণ সুদূরে মিলায়।

দেশের বিপুল জনসমষ্টিকে মানবসম্পদে রূপান্তরের মধ্যেই সার্বিক অর্থনৈতিক মুক্তির উপায় নিহিত। স্বনির্ভর অর্থনীতি উত্সারিত আত্মমর্যাদাবোধ জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের অন্যতম রক্ষাকবচ। সে লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে মানবসম্পদের উন্নয়ন আবশ্যক। বলিষ্ঠ চরিত্র চেতনা বিকাশের ক্ষেত্রে এটি এক মুখ্য বিবেচ্য বিষয়। নৈতিকতা, দেশপ্রেম এবং আত্মমর্যাদাবোধের ভিত্তি রচনা করে যে সকল চরিত্র চেতনা তার বলিষ্ঠ ও বাঞ্ছিত বিকাশ প্রয়োজন। ইতিহাসের বিচিত্র পরিক্রমণে কখনো মানুষের নেতৃত্বে যুগের পরিবর্তন ঘটে, কখনো বা ঘটনার নেতৃত্বাধীনে মানুষ পরিবর্তিত মূল্যবোধে সংস্কৃত হয়ে উঠে। বিজয় দিবসের চেতনা এ মুহূর্তে দেশবাসীকে সেই প্রত্যয় ও প্রতিজ্ঞার কথা স্মরণ করিয়ে দিতে পারে এবং জাগাতে পারে শক্তি ও সাহস।

লেখক:সরকারের সাবেক সচিব এবং জাতীয়

রাজস্ব বোর্ডের প্রাক্তন চেয়ারম্যান

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মো. নাসিম বলেছেন, 'বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হওয়া সুখবর না হলেও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে নির্বাচন করতে হচ্ছে'। আপনিও কি তাই মনে করেন?
2 + 8 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
আগষ্ট - ১৯
ফজর৪:১৬
যোহর১২:০৩
আসর৪:৩৭
মাগরিব৬:৩২
এশা৭:৪৮
সূর্যোদয় - ৫:৩৫সূর্যাস্ত - ০৬:২৭
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :