The Daily Ittefaq
ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ ডিসেম্বর ২০১২, ১১ পৌষ ১৪১৯, ১১ সফর ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ উত্তর প্রদেশে পুলিশের কাছে গিয়ে ফের ধর্ষিত | সাংবাদিক নির্মল সেন লাইফ সাপোর্টে | হলমার্ক জালিয়াতি:ঋণের নথি জব্দে সোনালী ব্যাংকে দুদকের অভিযান | ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশে ৯৭ কিলোমিটার জুড়ে যানজট | রোহিঙ্গাদের স্বীকৃতি দিন: মিয়ানমারকে জাতিসংঘ | বিশ্বজিত্ হত্যাকাণ্ড: এমদাদুল ৭ দিনের রিমান্ডে | গণসংযোগে সহযোগিতা করবে সরকার :স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী | স্বাধীনতার পাশাপাশি গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীলও হতে হবে : প্রধানমন্ত্রী | গণসংযোগে বাধা দেবে না আওয়ামী লীগ : সাজেদা চৌধুরী | চট্টগ্রামে কোটি টাকার হেরোইন উদ্ধার | সম্পর্ক উন্নয়নে ভারত-পাকিস্তান সিরিজ শুরু আজ | জনসংযোগে বাধা দিলে কঠোর কর্মসূচি: বিএনপি

[ রা জ নী তি ]

দেশ কি সংঘাতের দিকেই যাবে

মো. আবদুল লতিফ মন্ডল

বড় দুই দল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও প্রধান বিরোধী দল বিএনপির সাংঘর্ষিক রাজনীতির কারণে দেশ একটি অবশ্যম্ভাবী সংঘাতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে মত প্রকাশ করেছেন দেশের সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যম। আলোচনার মাধ্যমে এ সংঘাতের নিরসন না হলে দেশের গণতন্ত্র বিপদাপন্ন হবে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। কারণ এ দুই দলের রাজনীতি এখন সভ্যতা ও ভব্যতার খোলস ছাড়িয়ে যুদ্ধংদেহি রূপ নিয়েছে।

গত দুই সপ্তাহের রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে চোখ বুলালে দেখা যাবে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশ নিপতিত ছিল অবরোধ, হরতাল, বিক্ষোভের কবলে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি পুনর্বহালের দাবিতে বিরোধী জোট ৯ ডিসেম্বর দেশব্যাপী রাজপথ অবরোধের ডাক দেয়। ওই অবরোধ চলাকালে যে হিংসাত্মক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়, তা দেখে সারা দেশের মানুষ হয় হতভম্ব ও স্তম্ভিত। এর সূত্র ধরে বিরোধী জোটের ডাকে ১১ ও ১৩ ডিসেম্বর সারাদেশে পালিত হয় হরতাল। ওইসব কর্মসূচি চলাকালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট এবং আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন জোটের কর্মী-সমর্থকদের বেপরোয়া সংঘর্ষের বলি হয়েছে কয়েকটি তাজা প্রাণ, আহত হয়েছে শত শত মানুষ, নষ্ট হয়েছে দেশের কোটি কোটি টাকার সম্পদ, ব্যাহত হয়েছে স্কুল, কলেজ ও ইউনিভার্সিটির শিক্ষা কার্যক্রম, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য, উপোষ করতে হয়েছে দিন আনা দিন খাওয়া মানুষদের।

এসব অবরোধ ও হরতালের রেশ মিলিয়ে না যেতেই জামায়াতসহ সকল সামপ্রদায়িক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ, একাত্তরের মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচার কাজ দ্রুত সম্পন্ন এবং জনজীবনে বিরাজমান নানা সমস্যা দূর করার দাবিতে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ও বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) ১৮ ডিসেম্বর সারাদেশে হরতাল পালন করে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী 'কোনো সহিংসতা না হওয়ায়' ওই হরতালের প্রশংসা করে সুশীল সমাজের সমালোচনার মুখে পড়েছেন। তারা বলেছেন, হরতাল সহিংস না হলেও এতে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়, অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সুতরাং হরতাল প্রশংসীয় কর্মকাণ্ড হতে পারে না। বিএনপি এই হরতালের নিন্দা জানিয়ে বলেছে, 'সরকারের ছত্রছায়ায় বাম ফ্রন্ট হরতাল করেছে। সরকার-সমর্থিত এই হরতাল দেশে নজিরবিহীন ঘটনা। কোনো দেশে এই ধরনের হরতালের দৃষ্টান্ত নেই।' বাম সংগঠনগুলোর ওই হরতালের প্রতিবাদে খেলাফত আন্দোলনসহ কয়েকটি সমমনা দল ২০ ডিসেম্বর সারা দেশব্যাপী হরতাল পালন করে। গণমাধ্যমের খবর মোতাবেক ওই হরতাল ছিল 'উত্তাপবিহীন ও শান্তিপুর্ণ।' 'যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন করার দাবি এবং বিএনপি-জামায়াত জোটের সন্ত্রাস, নৈরাজ্যমূলক কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দল ২২ ডিসেম্বর রাজধানীর বায়তুল মোকাররম মসজিদের দক্ষিণ গেটে সমাবেশ করে। সমাবেশ শেষে আগামী ৭ জানুয়ারি 'যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার দাবিতে দেশব্যাপী ১৪ দলের মানবন্ধন এবং বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ২৬ মার্চ পর্যন্ত মাঠে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন নেতৃবৃন্দ। 'নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন, বর্তমান সরকারের দুর্নীতি, দুঃশাসন ও জনদুর্ভোগের বিরুদ্ধে ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ নেতাদের মুক্তির দাবিতে' বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দল ২৩ ডিসেম্বর রাজধানীর নয়াপল্টনে গণবিক্ষোভ করেছে। সারা দেশের জেলা, উপজেলা এবং পৌরসভায়ও এ বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে মর্মে কোনো কোনো পত্রিকায় বলা হয়েছে।

কেন এ সংঘাত? সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য নির্বাচনকালে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবিতে ১৯৯৪ ও ১৯৯৫ সালে প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ এবং অন্য দুইটি বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় পাটির আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ক্ষমতাসীন বিএনপি ১৯৯৬ সালে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করে। এ ব্যবস্থার অধীনে ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০০৮ সালে তিনটি সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এবং ২০০১ সালের বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট জয়লাভ করে সরকার গঠন করে। সম্পূর্ণ ত্রুটিহীন না হলেও এসব নির্বাচনের নিরপেক্ষতা দেশে ও বিদেশে প্রশংসিত হয়। চলতি মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার গত বছরের জুনে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে। ফলে বিলুপ্তি ঘটে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির। আওয়ামী লীগ যে কারণে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির জন্য আন্দোলন করেছিল, বিএনপি একই কারণে অর্থাত্ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে বাতিলকৃত নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের জন্য আন্দোলন করছে; বিরত আছে সংসদ অধিবেশনে যোগদান করা হতে। এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদ নির্বাচনকালে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবি একাধিকবার নাকচ করে দিয়েছেন। তার যুক্তি হলো, দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রীম কোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি করেছে এবং শুধু জনগণের দ্বারা নির্বাচিত জাতীয় সংসদের সদস্যগণ দ্বারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের পক্ষে রায় দিয়েছে। সুতরাং অনির্বাচিত ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে। তাছাড়া সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের আলোকে জাতীয় সংসদ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি প্রবর্তনকারী ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করেছে।

এদিকে কেউ কেউ বলছেন, বড় দুইটি দলই অস্তিত্বের লড়াইয়ে নেমেছে। বিরোধী দলের আন্দোলন থামাতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার একদিকে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি বলছে, তাদের সামনে আর কোনো বিকল্প নেই। বিএনপি নেতৃবৃন্দ মনে করছেন, সরকারকে চাপে ফেলে বাধ্য না করলে তারা কোন দাবি মানবে না। তাই বড় ধরনের ঝুঁকি নেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে দলটি। 'গণভ্যুত্থানের দিন ঘনিয়ে আসছে' বলেও হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন তাদের কেউ কেউ।

এ সংঘাতের সমাধানে দেশের সুশীল সমাজ, ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ ও গণমাধ্যম আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে আলোচনায় বসতে অনুরোধ জানিয়েছেন। তাগিদ দিয়েছেন হরতাল, অবরোধ ও হিংসাত্মক রাজনীতির বিকল্প পন্থা খুঁজে বের করতে। শুধু দেশের সুশীল সমাজ, ব্যবসায়ী সমাজ, মিডিয়া এবং সচেতন জনগণ বড় দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে আলোচনার মাধ্যমে তাদের রাজনৈতিক সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথ খুঁজে বের করার অনুরোধ জানায়নি, গত প্রায় দুই বছরে বাংলাদেশ সফরে আসা বিদেশী প্রতিনিধিরাও এ দুই দলকে আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক সংকট নিরসনের জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন ও রাজনীতি বিষয়ক সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানাকো, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন ও সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট ও ব্লেক।

প্রশ্ন হচ্ছে, এ সংঘাতের সমাধানে বড় দুই দল কি এগিয়ে আসবে না? তাদের কি বোধোদয় হবে না। তারা কি জানে না এরকম সংঘাত ও হিংসাত্মক রাজনীতির পরিণাম কী হতে পারে?৫ পত্র-পত্রিকা থেকে দেখা যায়, দুই দলের অনেক নেতা এর পরিণাম নিয়ে শংকিত। তারা নিজ নিজ দলের নেত্রীকে তাদের কঠোর অবস্থান থেকে সরিয়ে আনতে পারছেন না। এর অবশ্য কারণ রয়েছে। একজন আর একজনকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ না ভেবে 'শত্রু' ভাবেন। তাদের মধ্যে বাক্যালাপের সম্পর্কটুকু পর্যন্ত নেই। একজন আর একজনের আচরণ, জীবনযাত্রা নিয়ে 'রুচিহীন' মন্তব্য করেন। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে এর মূল কারণ হলো, তাদের উভয়ের মধ্যে 'পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যে স্বপ্ন' রয়েছে, তা বাস্তবায়নে একে অপরজনকে বড় বাধা হিসেবে দেখেন।

সবশেষে যা বলা দরকার তা হলো, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শুভবুদ্ধির উদয় হোক। নিকট অতীত থেকে শিক্ষা গ্রহণ করুক। এক নেত্রী আর এক নেত্রীকে 'শত্রু' না ভেবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ভাবুন। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোর ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের নেতাদের আচরণ থেকে শিক্ষা লাভ করুন। অগণতান্ত্রিক শক্তির উত্থান রোধে আলোচনার মধ্য দিয়ে চলমান সংকটের সমাধান বের করুন। তাদের এ বোধোদয় না হলে শুধু তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না, ব্যাহত হবে গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা।

 :সাবেক সচিব

E-mail: [email protected]

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
সংসদীয় আসনের সীমানা পুন:নির্ধারণে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের আপত্তি যৌক্তিক বলে মনে করেন?
8 + 6 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
সেপ্টেম্বর - ২৫
ফজর৪:৩৩
যোহর১১:৫১
আসর৪:১২
মাগরিব৫:৫৫
এশা৭:০৮
সূর্যোদয় - ৫:৪৮সূর্যাস্ত - ০৫:৫০
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :