The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০১৩, ১৬ পৌষ ১৪২০, ২৬ সফর ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ শমসের মবিন চৌধুরী আটক | বুধবার সকাল ছয়টা থেকে লাগাতার অবরোধের ডাক ১৮ দলের | কাল ব্যাংক ও পুঁজিবাজার বন্ধ | বিএনপি নেতা শমসের মবিন চৌধুরী আটক | ২ দিনের রিমান্ডে হাফিজ | বিরোধী দলের আন্দোলনের মূল লক্ষ্য মানুষ হত্যা: প্রধানমন্ত্রী | ছাড়া পেলেন সেলিমা হীরা হালিমা | ৩১ ডিসেম্বর রাতে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ : ডিএমপি | রাজশাহীতে ৪৪টি তাজা ককটেল ও সাড়ে ৪ কেজি গানপাউডার উদ্ধার | মোহাম্মদপুরে ২০০ হাতবোমাসহ আটক ৩ | প্রাথমিকে পাস ৯৮.৫৮

রা জ নী তি

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের টানাপোড়েন

সীমা সিরোহি

আগামী ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রবল ঝড় বয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘকাল ধরে সৃষ্ট রাজনৈতিক সংকটের মোকাবেলায় ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র দৃশ্যত বিপরীতমুখী অবস্থান গ্রহণ করেছে। গত অক্টোবরের শেষের দিক থেকে বিরোধী দল বিএনপির ডাকে পালিত হয় উপর্যুপরি ও সিরিজ হরতাল। এসব হরতালে ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপক সহিংসতা। প্রথমদিকে সহিংসতায় নিহত হয় ৫০ জন। এরপর আন্তর্জাতিক সমপ্রদায় ঢাকায় উচ্চ পর্যায়ের পরিদর্শকদের প্রেরণ করেন। তন্মধ্যে ঢাকায় আসেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং। তারা সকলেই বিবদমান শীর্ষ স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় আসার পরামর্শ দেন। কিন্তু তার ফলাফল এখনও অস্পষ্ট। সুজাতা সিং এরপর ওয়াশিংটন সফর করেন। সেখানে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে আঞ্চলিক পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করেন।

খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি ও ১৮ দলীয় জোটের শরিক জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য উগ্রপন্থী দল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবিতে সমপ্রতি স্থল, রেল ও নৌপথ অবরোধ করে এবং বিভিন্ন বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। ফলে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। সরকার নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি মেনে না নেয়ায় বিএনপি আসন্ন নির্বাচন ইতোমধ্যেই বয়কট করেছে। সংবিধান পরিপন্থী বলে সরকার বিরোধী দলের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। বেগম জিয়ার মতে, কেবল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। আর শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে কারচুপি হতে পারে। তবে এটা স্রেফ রাজনৈতিক বক্তব্য ছাড়া আর কিছু নয়। শেখ হাসিনার সরকারের অধীনে দেশে বেশ কিছু স্থানীয় সরকারের নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে। ঐসব নির্বাচনে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তার দল পরাজিত হয়েছে। অন্যদিকে সহিংসপূর্ণ আন্দোলনের কারণে বেগম জিয়ার জনপ্রিয়তা দিন দিন কমছে। তাছাড়া বিএনপি রাজপথের আন্দোলনে লোকবল ও পেশি শক্তি সরবরাহের ক্ষেত্রে জামায়াতের ওপর অধিক মাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতি কানাগলিতে চলে যাওয়ার এটাই প্রধান কারণ।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের এই প্রকৃতি নির্ণয় ও সম্ভাব্য সমাধানের ক্ষেত্রে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি কিছুটা পৃথক ও আলাদা। নয়াদিল্লীর মতে, ভারতের জন্য বিপজ্জনক বাংলাদেশের ইসলামী শক্তিগুলির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেয়ার ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগই শেষ ভরসা। গত এক দশক জুড়ে এই শক্তিগুলির আকার-আয়তন ও পেশিশক্তি যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। নিকটতম প্রতিবেশী হিসেবে ভারত চায় না তার পূর্ব সীমান্তে আরেকটি পাকিস্তানের জন্ম হোক। ইসলামী উগ্রবাদের এই জোয়ার ঠেকানো ভারতের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগ এর বিরুদ্ধে শক্তিশালী অবস্থান নিয়েছে। জামায়াতে ইসলামী, হেফাজতে ইসলাম ও অন্যান্য উগ্রপন্থী দলগুলির তথাকথিত ইসলামী পরিচিতির বিপক্ষে ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালী পরিচিতিকে বড় করে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। প্রধানমন্ত্রী নয়াদিল্লীর সাথে সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখছেন। ভারতের জন্য বিপজ্জনক সশস্ত্র জঙ্গিদের শায়েস্তা করছেন ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হস্তান্তর করছেন।

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনের মনোভাব সম্পূর্ণ ভিন্ন। ওয়াশিংটন বলছে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ছাড়া বাংলাদেশের নির্বাচন জনগণের কাছে বৈধতা পাবে না। এই পরিস্থিতিতে আরো সংঘাত অনিবার্য। বলাবাহুল্য, এই সংঘাতের পিছনের শক্তি কারা? যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা জামায়াত ক্যাডারদের আকস্মিক ও নির্মম হামলাকে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছেন। তারা বিরোধী নেতা-কর্মীদের হত্যা করছে যা ইসলামী তরবারির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। একইভাবে হিন্দু, বৌদ্ধ ও আহমেদিয়া সমপ্রদায়ের ওপর তাদের আক্রমণ দুঃখজনক।

ওয়াশিংটন বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ব্যাপারেও বিরোধী অবস্থান গ্রহণ করেছে। এই ট্রাইব্যুনাল ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীকে সহযোগিতা ও মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচার করছে। ১৭ জন অভিযুক্ত ব্যক্তির মধ্যে ১৩ জনই জামায়াতে ইসলামীর। তারা যুদ্ধে পাকিস্তানকে সুস্পষ্টভাবে সমর্থন করে। তারপরও ওয়াশিংটন বলছে, রাজনৈতিক ও গৃহবিবাদ থেকে এই বিচার করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সমপ্রদায় এই ট্রাইব্যুনালের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারাও এ সংক্রান্ত আইনের আন্তর্জাতিক মান নিয়ে সমালোচনা করেছেন। এভাবে তারা প্রকারান্তরে বাদীর অধিকারকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছেন। আর আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এই ধরনের আসামীর আপিলের কোন অধিকার নেই। বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এই ট্রাইব্যুনালের বিচারকে সমর্থন করেন। তারা একাত্তরের ঘাতকদের ফাঁসিও সমর্থন করেন।

শেখ হাসিনার সরকারের ভূ-কৌশলগত প্রকৃতি ও এ সম্পর্কিত কতিপয় পদক্ষেপের ব্যাপারেও যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ থাকতে পারে। ওয়াশিংটন কুতুবদিয়ার সন্নিকটবর্তী বঙ্গোপসাগরের সোনাদিয়া দ্বীপে একটি সমুদ্র বন্দর নির্মাণ ও উন্নয়নের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু ঢাকা এই প্রস্তাব অপ্রত্যাশিতভাবে প্রত্যাখ্যান করে। তার বদলে ৯৯ ভাগ তহবিল যোগানের প্রতিশ্রুতিতে চীন সেই কাজ লাভ করে। বন্দরের প্রথম ধাপের কাজ আগামী ২০১৫ সাল নাগাদ শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। শেখ হাসিনা সামরিক অস্ত্র কেনার ক্ষেত্রেও বহুমুখী নীতি গ্রহণ করেছেন। রাশিয়ার কাছ থেকে ক্রয় করেছেন যুদ্ধবিমান। এতে ওয়াশিংটন বিরক্ত। এই সরকারের আরেকটি মেয়াদে ক্ষমতায় আসা মানে ঐসব বিরোধী দেশের প্রতি আরও হেলে পড়া। স্বাভাবিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র এতে অস্বস্তিবোধ করছে।

তাছাড়া বাংলাদেশ এশিয়ায় প্রভাব বৃদ্ধি ও সম্পদ আহরণের গভীর লড়াইয়ের ফ্রন্টলাইন রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। আর দুর্ভাগ্যজনকভাবে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র এতদঞ্চলে কৌশলগত অংশীদার। অনেক ব্যাপারে তারা ঐকমত্যে পৌঁছতে পারলেও সর্বসম দৃষ্টিভঙ্গির উন্নয়নে এখনও অক্ষম। এক্ষেত্রে ভারতের ঝুঁকি খুব বেশি। বাংলাদেশে ইসলামী চরমপন্থার বিকাশ তার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি স্বরূপ। নয়াদিল্লী দেখেছে স্নায়ুযুদ্ধের সময় কমিউনিজম ঠেকানোর কৌশলগত যুদ্ধে পাকিস্তান কিভাবে ইসলামী উগ্রবাদ দ্বারা আচ্ছন্ন হয়েছে। সেসময় উগ্রপন্থীরা আর্থিক ও সামরিক সাহায্য পেয়েছে ওয়াশিংটন থেকে। প্রায় একই ঘটনা ঘটেছে বাংলাদেশে। এখানে বছরের পর বছর সৌদি আরব, কুয়েত ও ইউনাইটেড আরব আমিরাতের অর্থের ছড়াছড়ি হয়েছে। ফলে তাদের সাহায্যে গড়ে উঠেছে অনেক এনজিও ও বিশেষ প্রকৃতির মাদ্রাসা। জামায়াত নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানগুলি দক্ষিণ এশিয়ায় ইসলামের আরবীয়করণে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র জামায়াতকে মডারেট তথা মধ্যপন্থী ইসলামী দল হিসেবেই বিবেচনা করছে।

গত জুন মাসে ব্রিটিশ সাংবাদিক ফ্রান্সেস হ্যারিসনের একটি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় ইনস্টিটিউট অব কমনওয়েলথ স্টাডিজের জার্নালে। সেখানে তিনি এক পরিসংখ্যান তুলে ধরেছেন। তা হল প্রায় ১০ মিলিয়ন বা এক কোটি ছাত্র ১৯ হাজার মাদ্রাসায় (মূলত কওমি) লেখাপড়া করছে। তারা সেখানে কোন বিজ্ঞান, শিল্প বা সাহিত্য শিখছে না। তাছাড়া মাদ্রাসাগুলি ছাত্রীদের জন্য যেন নানা প্রকারের কারাগার।

বাংলাদেশে এখন যা চলছে তা কারোর জন্যই শুভ নয়। চাপে পড়ে রাজনীতিকরা নির্বাচন বয়কট করছেন। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের দরকার সুস্পষ্ট পথ অনুসরণ। বাংলাদেশের সুবৃহত্ সামাজিক শক্তিগুলিকে ওয়াশিংটনের অবহেলা করা অনুচিত। একই সঙ্গে ভারতের উচিত একটি অভিন্ন ও সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তার কৌশলগত অংশীদারের সাথে সর্বউপায়ে বোঝাপড়া করা ।

ভাষান্তর : ফাইজুল ইসলাম

লেখক : ওয়াশিংটন ভিত্তিক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক এবং গেট ওয়ে হাউজ : ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অন গ্লোবাল রিলেশনস-এর প্রদায়ক

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, 'এক এগারোর কুশলিবরা আবার সক্রিয় ও সোচ্চার হয়েছেন।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
6 + 7 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
মে - ৯
ফজর৩:৫৬
যোহর১১:৫৫
আসর৪:৩৩
মাগরিব৬:৩৪
এশা৭:৫৩
সূর্যোদয় - ৫:১৮সূর্যাস্ত - ০৬:২৯
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :