The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০১৩, ১৬ পৌষ ১৪২০, ২৬ সফর ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ শমসের মবিন চৌধুরী আটক | বুধবার সকাল ছয়টা থেকে লাগাতার অবরোধের ডাক ১৮ দলের | কাল ব্যাংক ও পুঁজিবাজার বন্ধ | বিএনপি নেতা শমসের মবিন চৌধুরী আটক | ২ দিনের রিমান্ডে হাফিজ | বিরোধী দলের আন্দোলনের মূল লক্ষ্য মানুষ হত্যা: প্রধানমন্ত্রী | ছাড়া পেলেন সেলিমা হীরা হালিমা | ৩১ ডিসেম্বর রাতে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ : ডিএমপি | রাজশাহীতে ৪৪টি তাজা ককটেল ও সাড়ে ৪ কেজি গানপাউডার উদ্ধার | মোহাম্মদপুরে ২০০ হাতবোমাসহ আটক ৩ | প্রাথমিকে পাস ৯৮.৫৮

রা জ নী তি

আসন্ন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তাত্পর্য

দিলীপ বড়ুয়া

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সুদীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে আমরা অর্জন করেছি স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। অসাম্প্রদায়িকতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় দর্শনের মৌলিক দিক। এর ওপর ভিত্তি করে রচিত বাংলাদেশের সংবিধান একটি অমূল্য দলিল। অকমিউনিস্ট দেশ হিসেবে আমাদের সংবিধান যে একটি উত্তম সংবিধান, তা রাজনৈতিক সচেতন ব্যক্তি মাত্রই স্বীকার করবেন। এই সংবিধানের মূল্য নির্যাস হল, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তন ও রাষ্ট্র পরিচালিত হবে। স্বাভাবিকভাবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যে ক্ষমতায় যারা অধিষ্ঠিত থাকবেন অথবা বিরোধী দলে অবস্থান করবেন, তারা সকলেই রাষ্ট্রীয় দর্শন সম্পর্কে ঐকমত্য পোষণ করে চলবেন-এটাই দেশের নাগরিক হিসেবে সংশ্লিষ্ট সকলের দায়িত্ব। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনককে সপরিবারে হত্যার পর আমাদের দেশে যে রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির উম্মেষ ঘটেছে, তার ফলস্বরূপ দেশ অগণতান্ত্রিক, স্বৈরাচারী ও সাম্প্রদায়িক জঞ্জালের উর্বর ভূমিতে পরিণত হয়। এতে করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতার পরিবর্তন না হয়ে অগণতান্ত্রিক পন্থায় বার বার ক্ষমতার পরিবর্তন ও দখলের চেষ্টা করা হয়েছে। কিংস পার্টি তৈরির মাধ্যমে ক্ষমতার ভিতেক শক্তিশালী করে ক্ষমতা প্রলম্বিত করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে। এই প্রক্রিয়াতে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থি মূল্যবোধে উজ্জীবিত রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তি দ্রুত বিকশিত হবার সুযোগ পেয়েছে। ফলে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ৪২ বছর পরও ক্ষমতায় যারা থাকে অথবা বিরোধী দলে যাদের অবস্থান, তাদের সকল পক্ষের মধ্যে রাষ্ট্রীয় দর্শন সম্পর্কে ঐকমত্যে পৌঁছানো আজও সম্ভব হয়নি। এ কারণে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমৃদ্ধ রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষে একই সাথে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার এবং বিরোধী দলে অবস্থানের দুর্লভ সুযোগ আসেনি। উল্লেখ করা প্রয়োজন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নির্মমভাবে হত্যার পর দীর্ঘদিন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক-বাহক রাজনৈতিক শক্তি দেশ পরিচালনার সুযোগ পায়নি। সাম্প্রদায়িকতা ও স্বৈরাচার-বিরোধী দীর্ঘ গণআন্দোলনের বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থনে বিজয়ী হয়ে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি ১৯৯৬-২০০১ এবং ২০০৯'র ৬ জানুয়ারি থেকে অদ্যাবধি দেশ পরিচালনা করছে। বঙ্গবন্ধুর কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এ শক্তি রাজনৈতিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে, লাইনচ্যুত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ট্রেনকে পুনরায় লাইনে তুলে উন্নয়নের ধারায় অগ্রসর হচ্ছে। কিন্তু এ সময় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধী মৌলবাদী অপশক্তি ও সাম্প্রদায়িক চক্রের প্রতিক্রিয়া থেমে থাকেনি। ইতোমধ্যে দেশে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে বিকশিত দক্ষিণপন্থি ধর্মীয় রাজনৈতিক ধারা এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে চিরস্থায়ীভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার লক্ষ্যে এক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। এই অপশক্তির মূল লক্ষ্য হলো, নীতি-নৈতিকতার তোয়াক্কা না করে পবিত্র ইসলাম ধর্মের আড়ালে বাংলাদেশকে একটি প্যান-ইসলামিক রাষ্ট্রে পরিণত করা। এর জন্য তারা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কায়েমী স্বার্থবাদীদের যোগসাজশে বিভিন্ন ধরনের নাশকতামূলক কাজে অগ্রসর হচ্ছে। আমাদের দেশে বিকশিত লুটেরা ধনিক শ্রেণিও তাদের স্বার্থে ধর্মকে ব্যবহার করার ফলে ধর্মের বিকৃত রূপ ও ব্যবহার নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এক ধরনের প্রকাশ্য প্রতিযোগিতা চলছে। অন্যদিকে, বিশ্বায়নের ফলে সংস্কৃতির সাযুজ্য বিধান ও একাত্মীকরণের নামে পশ্চিমা বিশ্ব যেভাবে আধিপত্য চালিয়ে যাচ্ছে এবং দ্বৈতনীতি অনুসরণ করছে, তাতে বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্বে মৌলবাদী চিন্তার সামাজিকীকরণ ঘটেছে।

১৯৭১ সালে সাম্প্রদায়িক ও স্বৈরতান্ত্রিক রাজনৈতিক দর্শনের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সশস্ত্র সংগ্রাম করে বাঙালি জাতির বিজয় অর্জন হলেও, বিশ্ব ও দেশীয় বাস্তবতায় সে সময়ের পরাজিত রাজনৈতিক দর্শন বর্তমানে আবার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মুখোমুখি ও প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অপশক্তি শুধুমাত্র দেশীয়ভাবে অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারাকে প্রতিপক্ষ হিসেবে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়নি, বরং আন্তর্জাতিকভাবেও এর একটি শক্তিশালী লবি ও নেটওয়ার্ক তৈরিতে সক্ষম হয়েছে। যারা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ সৃষ্টির বিরোধিতা করেছিল, সে অপশক্তিগুলো বিভিন্ন ভেক ধরে একটি অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের বিরোধিতা করছে। আমাদের দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মূল ধারাতে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপিকে জনগণ ক্ষমতার পালাবদলের দু'টি রাজনৈতিক দল হিসেবে বিবেচনা করে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসার সময় যে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক অবস্থানে ছিল, ২০১৩ সালের শেষপ্রান্তে এসে বিএনপির রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক অবস্থা সে রকম নেই। বাস্তবতা হচ্ছে, রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে বিএনপি জামায়াতের নিকট আত্মসমর্পণ করেছে এবং সাংগঠনিকভাবে জামায়াতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বর্তমানে বিএনপি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে জামায়াত দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এবং হরতাল ডাকলেই মাঠে কর্মীবাহিনীও হচ্ছে জামায়াত-শিবির। ফলে বর্তমানে ১৮ দলীয় জোটের নিয়ামক শক্তি হচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। অর্থ, লোভ এবং বিভিন্ন অপকৌশলের মাধ্যমে দেশে ১৮ দলীয় জোটকে জামায়াতে ইসলামের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জোটে পরিণত করা হয়েছে। বিএনপি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা পরিবর্তনে বিশ্বাসী হলেও জামায়াতের কাছে জিম্মি হয়ে আজ নির্বাচন বানচালের লক্ষ্যে পরিচালিত ষড়যন্ত্রের অংশীদার হিসেবে ভূমিকা পালন করছে। এর সুযোগ নিয়ে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের চলমান প্রক্রিয়াকে সুকৌশলে বাধাগ্রস্ত করে দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে Vertically দ্বিধাবিভক্ত করা হয়েছে। দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টির মাধ্যমে একটি অচলাবস্থার দিকে দেশকে ঠেলে দেয়ার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। যার মূল লক্ষ্য হলো, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ভন্ডুল করা।

বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট জামায়াতে ইসলামীকে সন্ত্রাসী দল হিসেবে বিবেচনা করায় নির্বাচন কমিশন দলটিকে ইতোমধ্যে নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে, রাজাকার কাদের মোল্লার রায় কার্যকর করার পর ১৮ দলীয় জোটের এজেন্ডা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের এজেন্ডার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং জোটের অন্যতম নিয়ামক শক্তি জামায়াত-শিবির চক্র দেশের সর্বত্র খুন, অগ্নিসংযোগ, পেট্রোল বোমার মাধ্যমে গণপরিবহন পোড়ানো, ভাংচুর, গাছ নিধন, সংখ্যালঘুদের নির্যাতন, রেল লাইন উপড়ে ফেলে এক ধরনের সন্ত্রাসী ও নাশকতামূলক উম্মত্ততায় মেতে উঠেছে। এসব নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের অন্যতম লক্ষ্য হলো, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে ভন্ডুল করা। বিভিন্ন অজুহাতে খালেদা জিয়াকে নির্বাচন থেকে বিরত রেখে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন যাতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর হবার পর সারা দেশে উল্লিখিত নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড জামায়াত-শিবির প্রকাশ্যভাবে পরিচালনা করলেও পশ্চিমা বিশ্বের কাছে তা দৃশ্যত গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে না। ঘাতক ও সন্ত্রাসী জামায়াত-শিবিরকে জঙ্গি-মৌলবাদী তথা সন্ত্রাসী বলে তাদের কাছে বিবেচিত হচ্ছে না। জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে বিশেষ রাজনৈতিক শক্তিকে ক্ষমতার আসনে বসানোর তাগিদে হত্যা, ধ্বংস ও নাশকতামূলক ঘটনাবলির বিনিময়ে সকল দলের অংশগ্রহণের লেবাসে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচনের ব্যবস্থা পশ্চিমা বিশ্বের জন্য জরুরি হয়ে পড়েছে। আল-কায়েদা ও তালেবান বা অনুরূপ ইসলামী শক্তি পশ্চিমা বিশ্বের শত্রু হিসেবে বিবেচিত হলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ইসলামী জঙ্গি চরিত্রের রাজনৈতিক শক্তি তাদের কাছে সেরকম মনে না-ও হতে পারে। অবশ্য আমাদের দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস, ড. কামাল হোসেন, ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, আ.স.ম. আবদুর রব প্রমুখ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও বিশিষ্টজনেরা পশ্চিমা বিশ্বের চিন্তা-চেতনা মোতাবেক ট্রয়ের ঘোড়া হিসেবে কাজ করছেন। তারা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে চলমান সংকটের জন্য একমাত্র সমস্যা হিসেবে দেখছেন। কাদের মোল্লার ফাঁসি এবং জামায়াত-শিবিরের নাশকতামূলক কাজ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তাঁরা নির্বাক। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একজন জাতীয়তাবাদী ও গণতান্ত্রিক নেতা হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্ভাসিত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। যার মূল লক্ষ্য হলো, ২০২১ সাল নাগাদ বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের শিল্পসমৃদ্ধ দেশে পরিণত করা।

বাংলাদেশের বিরাজমান রাজনৈতিক সংকটকে বস্তুনিষ্ঠভাবে উপলব্ধি করতে হলে, জামায়াতের এজেন্ডা বাস্তবায়ন থেকে খালেদা জিয়াকে বের হয়ে আসতে হবে। অন্যথায় এ সংকটের কার্যকর সমাধান আদৌ সম্ভব হবে না। ১৯৭১ এবং বর্তমানের কর্মকাণ্ডে জামায়াতে ইসলামী শুধু ১৪ দলীয় জোট বা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয়। বরং এরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সমগ্র দেশের সাধারণ জনগণ ও রাজনৈতিক শক্তির গণদুশমন। ৪২ বছর পরও এরা দেশে দলমত নির্বিশেষে গণশত্রু হিসেবে প্রমাণিত। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে বিএনপি প্রতিষ্ঠিত হলেও বর্তমানে জামায়াতের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে বিএনপি সহায়ক শক্তির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে এবং জামায়াত-বিএনপি রাজনৈতিকভাবে একই মেরুতে অবস্থান করছে। ফলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতার পালাবদলের বিষয়টি জটিল ও কন্টকাকীর্ণ হয়ে পড়েছে। এ কারণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক করার লক্ষ্যে বিভিন্ন ছাড় দিয়ে সমঝোতার চেষ্টা করলেও জামায়াতের খপ্পর থেকে বিএনপি বেরিয়ে আসতে পারেনি। ফলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল থেকে জটিলতর হয়েছে।

উল্লিখিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিষয়টি বিবেচনা করলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে আমার কাছে প্রতিভাত হচ্ছে। ১৯৭০ সালের ইয়াহিয়া খানের L.F.O এর মাধ্যমে নির্বাচনে অংশগ্রহণ প্রশ্নে মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীসহ শক্তিশালী বাম রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন বর্জন করেছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু L.F.O এর মধ্যে নির্বাচনে অংশগ্রহণের ফলে জনগণ আওয়ামী লীগকে তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানে জাতীয় সংসদের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসনে বিজয়ী করেছিল। যার ধারাবাহিকতায় একটি নিরস্ত্র জাতিকে সশস্ত্র সংগ্রামের অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে। ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ক্ষেত্রে ১৯৭০ সালের নির্বাচন একটি Turning Point হিসেবে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাও বর্তমান প্রেক্ষাপটে সাম্প্রদায়িক ও জঙ্গিবাদী গোষ্ঠির স্বপ্নের প্যান-ইসলামিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অপকৌশলের বিরুদ্ধে তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও নেতৃত্বের দৃঢ়তা দিয়ে অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক রাজনীতির ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে অকুতোভয় অগ্রসেনানী হিসেবে অগ্রসর হচ্ছেন। অসাম্প্রদায়িক এবং গণতান্ত্রিক রাজনীতির সিপাহশালার শেখ হাসিনার সাহসিকতাপূর্ণ এই বলিষ্ঠ ভূমিকার মধ্যদিয়ে আসন্ন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বর্তমান বাস্তবতায় এ নির্বাচন অনুষ্ঠান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আপাত দৃষ্টিতে অনেকে এই নির্বাচনের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে না পারলেও নির্বাচনোত্তর রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহ এর যথার্থতা প্রমাণ করবে। এই নির্বাচনের মধ্যদিয়ে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের অনেকটা বিস্মৃত চেতনা পুরোপুরিভাবে পুনর্জাগ্রত হবার ক্ষেত্র তৈরি হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, জননেত্রী শেখ হাসিনা একজন ব্যক্তি নন। তিনি বঙ্গবন্ধুত্তোর প্রগতিশীল অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির মূর্তপ্রতীক। তাকে ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা না করে সমস্ত প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক শক্তির মুখপাত্র হিসেবে রাজনৈতিকভাবে বিবেচনা করলে সমস্যা উত্তরণের ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবেশ সৃষ্টি হবে।

দশম জাতীয় সংসদের নির্বাচনের বিষয়টিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার লক্ষ্যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কায়েমী স্বার্থবাদী মহল শুরু থেকেই খুব সচেতনভাবে অগ্রসর হতে থাকে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যাতে পুনরায় ক্ষমতায় আসতে না পারেন এবং দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক ধরনের সংকট সৃষ্টি করে জামায়াত নিয়ন্ত্রিত ১৮ দলীয় জোটকে অথবা অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতার হাত বদলের বিষয়াদিকে গুরুত্ব দিয়ে সমস্ত কর্ম-পরিকল্পনা নিয়ে উল্লিখিত অপশক্তিরা এগিয়েছে। আসন্ন নির্বাচনকে নিয়ে যে সংকট সৃষ্টি করা হয়েছে, তা জামায়াত ও তার আন্তর্জাতিক প্রভুদের পূর্ব পরিকল্পিত এক ধরনের ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের অংশ। এ ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের চূড়ান্ত পরিণতিই হচ্ছে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সকল দলের অংশগ্রহণের প্রশ্নে এই নাটক। অনেক পোড় খাওয়া এবং ১/১১ এর রাজনৈতিক এসিড টেস্টের মধ্যদিয়ে সফল, প্রজ্ঞাবান ও দূরদৃষ্টি সম্পন্ন রাজনৈতিক নেতা, জননেত্রী শেখ হাসিনা চলমান রাজনৈতিক সমস্যার গভীরতা ও বাঙালি জনগোষ্ঠির জীবনে এর ভবিষ্যত্ প্রভাব মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছেন বলেই আজ দীপ্ত পদভারে রাজনৈতিক সংকট মোকাবেলা করে সামনের দিকে অগ্রসর হওয়া ছাড়া তার হাতে বিকল্প কিছু নেই। তাই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কায়েমী স্বার্থবাদীদের সৃষ্ট রাজনৈতিক সংকট মোকাবেলা করার লক্ষ্যে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সকল প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক শক্তিকে ইস্পাত কঠিন ঐক্য স্থাপন করতে হবে।

আন্তর্জাতিক কায়েমী স্বার্থবাদীদের মুখপাত্র "দ্য ইকোনোমিস্ট পত্রিকা" সম্প্রতি মন্তব্য করেছে, আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জিতলেও বাংলাদেশ হারবে। কিন্তু আমি বলতে চাই, আসন্ন নির্বাচনে শেখ হাসিনা জিতলে, বাংলাদেশ জিতবে। আর এ যুদ্ধে শেখ হাসিনা হারলে, বাংলাদেশ হারবে। এবার শেখ হাসিনা হারলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসম্পন্ন বাঙালি জাতি মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে না, যেমন করে ১৭৫৭ সালে বৃটিশ ও তাদের এদেশিয় কায়েমী স্বার্থবাদীদের ষড়যন্ত্রের ফলে বাংলার সর্বশেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ্-দৌলা পলাশির প্রান্তরে হেরেছিলেন। যার ফলস্বরূপ বাঙালি জাতি তথা ভারতবাসী প্রায় দুইশ' বছর ধরে এ পরাজয়ের খেসারত দিয়েছিল।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিজয় লাভের পরও ইয়াহিয়া-ভুট্টোর ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের ফলে তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে পারেননি। কিন্তু পরবর্তীতে তার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে অনেক আত্ম-ত্যাগের বিনিময়ে আমরা একটি স্বাধীন দেশ পেয়েছি। মুক্তিযুদ্ধের সময় আন্তর্জাতিকভাবে যে সমস্ত দেশ আমাদের বিরোধিতা করেছিল, আজও তারা এক কোরাসে মিলিত হয়েছে। বর্তমানেও সকল দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে পারব। ১৯৭০-এর নির্বাচনে জয় লাভের পর ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে গোটা বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। সে সময় বাঙালি জাতির কাছে শত্রু প্রকাশ্যভাবে চিহ্নিত ছিল। বর্তমানে শত্রু ঘরে ঘরে। কাজেই বর্তমান সংগ্রাম আরো কঠিন ও জটিল। এই কঠিন ও জটিল পথ পাড়ি দেয়ার মত সাহস ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আছে বলে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি হিসেবে আমরা বিশ্বাস করি।

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সংঘটিত রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মাধ্যমে মূলত মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকেই রাজনৈতিকভাবে নির্বাসিত করার অপচেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু জননেত্রী শেখ হাসিনা স্বীয় রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা দিয়ে সকল ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে আজকের অবস্থানে এসেছেন। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে বর্তমানে একের পর এক যে ষড়যন্ত্রের জাল বুনা হচ্ছে, তাও সফলভাবে মোকাবেলা করে তিনি দীপ্ত পদভারে এগিয়ে যাবেন ও বিজয়ী হবেন-এটাই দেশবাসীর কাম্য। এ প্রসঙ্গে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সনের একটি বিখ্যাত উক্তি উল্লেখ করতে চাই, "The finest steel has to pass through the hottest fire". আজকের জননেত্রী শেখ হাসিনা রাজনৈতিক hottest fire এর মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছেন এবং সুনিশ্চিতভাবে চলমান চ্যালেঞ্জে বিজয় লাভ করবেন, যা নতুন প্রজন্মের মধ্যে শুধুমাত্র বিস্ময় সৃষ্টি করবে না বরং ভবিষ্যতে সমৃদ্ধ জাতি বিনির্মাণে তাদের জন্য অনুপ্রেরণারও উত্স হয়ে থাকবে।

লেখক:মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কৃষি, শিল্প ও সমাজকল্যাণ বিষয়ক উপদেষ্টা

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, 'এক এগারোর কুশলিবরা আবার সক্রিয় ও সোচ্চার হয়েছেন।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
6 + 1 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
ফেব্রুয়ারী - ২৫
ফজর৫:০৮
যোহর১২:১২
আসর৪:২২
মাগরিব৬:০৩
এশা৭:১৫
সূর্যোদয় - ৬:২৪সূর্যাস্ত - ০৫:৫৮
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :