The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার, ৩১ ডিসেম্বর ২০১২, ১৭ পৌষ ১৪১৯, ১৭ সফর ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ রাজধানীতে বর্ষবরণে নাশকতা ঠেকাতে মাঠে নেমেছে ৮টি ভ্রাম্যমাণ আদালত | নতুন বছরে খালেদা জিয়ার শুভেচ্ছা | নতুন বছরে আন্দোলনে ভেসে যাবে সরকার: তরিকুল ইসলাম | দক্ষিণ এশিয়ায় সাংবাদিক হত্যার শীর্ষে পাকিস্তান | ঢাবি শিক্ষক সমিতির নির্বাচন নীল ৮, সাদা ৭ পদে জয়ী | জোর করে ক্ষমতায় থাকতে চাইলে ৭৫ এর মতো পরিণতি হবে: খন্দকার মোশাররফ | দুর্নীতিবাজদের ভোট দেবেন না : দুদক চেয়ারম্যান | ট্রেনের ধাক্কায় ৫ হাতির মৃত্যু | এখন বাবা-মাকে বই নিয়ে চিন্তা করতে হয় না : প্রধানমন্ত্রী | আপাতত পাকিস্তান সফর করছে না বাংলাদেশ ক্রিকেট দল | মিরপুরে ঢাবি অধ্যাপকের স্ত্রীকে গলাটিপে হত্যা | তাজরীনে আগুন পরিকল্পিত: বিজিএমইএ | ১৩ জানুয়ারি থেকে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার নিবন্ধন | সমস্যা সমাধানে আলোচনার বিকল্প নেই : সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম

বি শে ষ র চ না

কী রেখে গেল ২০১২

আবুল কাসেম ফজলুল হক

২০১২ সাল চলে যাচ্ছে আজ। বছরের ঘটনাগুলো স্মরণ করতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু অনেক কিছুই মনে থাকে না। অনেক কিছুই মনে রাখতে পারি না। রবীন্দ্রনাথের উক্তি মনে পড়ে : 'কালস্রোতে ভেসে যায় জীবন যৌবন ধন ও মান।' ইংরেজ কবি গ্রের উক্তি স্মরণ হয় :'The boast of heraldry,

the pomp of power/All but leads to the grave.' তবু স্বভাবগত সামাজিক দায়িত্ববোধ মনের মধ্যে কাজ করে। প্রগতির তাগিদ ও চেতনায় ক্রিয়াশীল আছে।

ঘটনাবলি স্মৃতিতে ঠিকমতো না থাকার এবং আলোচনার পরিসর ক্ষুদ্র হওয়ার কারণে কোনো কিছুই ঠিকমতো বর্ণনা করতে পারব না। মনের মধ্যে ঘটনাবলি থরে থরে সাজানো না থাকলেও অনেক ঘটনারই ছাপ মনে আছে। তার উপর নির্ভর করেই কিছু কথা বলতে ইচ্ছা করছে।

কেউ কেউ বলেন, লেখেনও—ইতিহাসের শিক্ষা এই যে, ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না। দেশের রাজনৈতিক নেতাদের এবং প্রধান রাজনৈতিক ধারাগুলোতে (সিভিল সোসাইটি ও এনজিও একটি সক্রিয় রাজনৈতিক ধারা) সক্রিয় বুদ্ধিজীবীদের আচরণ লক্ষ করেই এ কথা বলা যায়। আমার মনে হয় কেবল কর্তৃত্বশীলেরাই সব নয়, সমাজের আরও নানা অংশ আছে, সবার অনুভূতি উপলব্ধি ও চিন্তা এক রকম নয়। কেবল শাসক শ্রেণীর দিকে তাকিয়ে যারা চিন্তা করেন তাদের চিন্তা কি ঠিক? কেবল উপস্থিত অস্থিরতায় বিচলিত হয়ে যারা চিন্তা করেন তাদের চিন্তা কি ঠিক? আমার মনে এ ধারণা দৃঢ়মূল আছে যে, উন্নত ভবিষ্যত্ সৃষ্টির প্রয়োজনে ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। যেকোনো সরকার ক্ষমতায় থাকার জন্য জনস্বার্থে কিছু কাজ করার চেষ্টা করে। কোনো আদর্শবাদী দল হলে অনেক কিছু করতে চায়, করে—সে কথা আমি বলছি না। আমাদের দেশে শাসক শ্রেণীর ক্ষমতাসীন দল কিছু করার চেষ্টা করলে বিরোধী দল তা ব্যর্থ করে দেওয়ার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালায়। আমাদের শাসক শ্রেণীতে—সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে—এই অন্ধ ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ২০১২ সালে আগের মতোই দেখা গেছে, এবং জাতীয় সংসদের নির্বাচন (২০১৪) সামনে নিয়ে এটা এখন তীব্রতার দিকে যাচ্ছে। এরই মধ্যে সরকার বিদ্যুতের উত্পাদন বাড়াবার ও বিদ্যুতের ঘাটতি কমাবার চেষ্টা করেছে। বিদ্যুত্ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি দেখা যাচ্ছে। তবে বিদ্যুত্ খাতে বিপুল ব্যয়ের মধ্যে দুর্নীতির ও অর্থ-আত্মসাতের অভিযোগ আছে। সরকার নতুন শিক্ষানীতি জারি করেছে এবং শিক্ষাক্ষেত্রে যুগান্তকারী উন্নয়ন সাধন করা হয়েছে বলে শিক্ষামন্ত্রণালয় থেকে প্রচার চালানো হয়েছে। আমার কাছে এই প্রচারকে একেবারেই অন্তঃসারশূন্য মনে হয়। সরকার ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসেই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের বিনামূল্যের পাঠ্যপুস্তুক সারা দেশে স্কুলে স্কুলে পাঠিয়ে দেবে—এতে সরকারের নৈপুণ্যের পরিচয় আছে। দুঃখজনক ব্যাপার এই যে, পাঠ্যপুস্তকসমূহের অন্তর্গত পাঠ্যসূচি ও পাঠক্রম আগের মতোই খারাপ। এতে পরাশক্তির সাম্রাজ্যবাদী নীতির প্রকাশ আছে, বাংলাদেশের কল্যাণে জাতীয়তাবাদ ও তার সম্পূরক আন্তর্জাতিকতাবাদের প্রকাশ নেই। এতে পরাশক্তির লিবারেল ডেমোক্রেসির প্রকাশ আছে, বাংলাদেশের জনগণের গণতন্ত্রের প্রকাশ নেই। ধর্ম শিক্ষার ও ধর্মীয় নীতি শিক্ষাদানের যে ব্যবস্থা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য করা হয়েছে, তা মারাত্মকভাবে ত্রুটিপূর্ণ। তৃতীয় শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত ইসলাম শিক্ষার বইগুলোতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ইসলামের অলৌকিক বিষয়গুলোর উপর। এর দ্বারা শিক্ষার্থীদের অদৃষ্টবাদী করে তোলার এবং নৈতিক দিক দিয়ে দুর্বল করে ফেলার গভীরতর ও ব্যাপকতর আয়োজন করা হয়েছে। ব্রিটিশ আমলে, পাকিস্তান আমলে, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরেও এমন ছিল না। স্কুলের এমপিও-ভুক্তির রীতিকে কি উন্নত করা হয়েছে? কোচিং সেন্টার, গাইড বুক ইত্যাদি আছে। এসবের ব্যবসা জোরদার হয়েছে পঞ্চম শ্রেণীতে ও অষ্টম শ্রেণীতে পাবলিক পরীক্ষার ব্যবস্থা করার ফলে। ছাত্রদের থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত টাকা আদায়ের প্রবণতা কমাবার চেষ্টা সরকার করছে। কিন্তু পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থায় এটা কি সফল হতে পারে? আগের মতোই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিল্প বহুধা বিভক্ত আছে। এমনিভাবে সরকার যেসব সদর্থক কাজ করছে, সেগুলোর মূল্য বিচার করে দেখার চেষ্টা করা যেতে পারে। কিন্তু মূল্য বিচার করবেন কারা। যাদের সবচেয়ে বেশি যোগ্যতা আছে, তারা সবাই তো বিভিন্ন সিভিল সোসাইটির বুদ্ধিজীবী এবং বিভিন্ন এনজিওর কর্তাব্যক্তি। যে ছকে তাদের চিন্তা ধাঁধা, তা দিয়ে হবে না।

আওয়ামী লীগ ছাড়া চৌদ্দ-দলীয় জোটের যেসব দল আছে সেগুলোর মধ্যে গতানুগতির বাইরে সদর্থক কোনো চিন্তা নেই, কাজ তো নেই-ই। আওয়ামী লীগকে ধরে তারা সুবিধা হাসিল করতে তত্পর।

বিএনপি-জামায়াতকে নিয়ে আছে। বিএনপির ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ ও নির্যাতন দুটোই সীমাহীন। মনে হয়, দৃশ্যমান ঘটনাবলির বাইরে অদৃশ্যও অনেক কিছু আছে। বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর গুম হওয়ার পর আন্দোলনের যে চরমপন্থা বিএনপি অবলম্বন করেছিল, সরকার তা অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে দমন করেছে এবং দল হিসেবে বিএনপিকে বিপন্ন করে দিয়েছে। বিএনপি নৈতিক দিক দিয়ে দুর্বল, সাহস কম। যে বছরটা চলে গেল তাতে বিএনপি তার আন্দোলনে আর কোনো অগ্রগতি সাধন করতে পারেনি। সবচেয়ে বড় কথা হলো, ক্ষমতার লড়াই ছাড়া বিএনপির কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য নেই। রাজনৈতিক বক্তব্য আওয়ামী লীগেরও নেই। তবে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক এবং উন্নয়নমূলক কিছু বিক্ষিপ্ত কথা আওয়ামী লীগ বলে থাকে। পত্রিকায় খবর দেখেছি, আওয়ামী লীগ তার নির্বাচনী ইশতিহার প্রস্তুত করছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই দলের কোনোটাই শক্তি হিসেবে বাংলাদেশের জনসাধারণকে ঐক্যবদ্ধ করতে, জাতীয় একমত্য প্রতিষ্ঠা করতে, রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে সচেষ্ট নয়। ক্ষমতা দখল করা আর ক্ষমতা উপভোগ করাই দুই দলেরই মূল রাজনীতি। স্বাধীনতার বোধ নেই, প্রগতির চেতনা নেই।

বামপন্থী দলগুলোর অবস্থা উন্নত হয়নি। বাংলাদেশে বামপন্থী রাজনীতি ক্ষয়িষ্ণুদশায় পৌঁছে গেছে। এসব দল অন্যায়-অবিচারের প্রতিবাদ করে, ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন ছাড়া জনস্বার্থে সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করে; কিন্তু রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে নিজেদের আদর্শ ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন করার কথা ভাবে না। তেল-গ্যাস-বিদ্যুত্-বন্দর রক্ষায় আন্দোলনে অধিকাংশ বামপন্থী দল সক্রিয় আছে। চাপ সৃষ্টি করে সমস্যার সমাধান করার জন্য সরকারের সঙ্গে সঙ্গে যে নীতিভিত্তিক সুসম্পর্ক দরকার, জাতীয় সম্পদ রক্ষা আন্দোলনের তা নেই। আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি কোনোটার সঙ্গেই তাদের আন্তরিক সুসম্পর্ক নেই। চাপ সৃষ্টির আন্দোলন কখনও কখনও পুলিশের সঙ্গে সংঘাতে রূপ নেয় এবং আন্দোলনের উদ্দেশ্য সফল হয় না। ২০১২ সালে একটি পনেরো দফা কর্মসূচি নিয়ে সিপিবি ও বাসদ দ্বিদলীয় জোট গঠন করেছে। কিন্তু জনসাধারণের কাছে তারা পনেরো দফা কর্মসূচি প্রচার করছে না। মনে হয় পনেরো দফা বাস্তবসম্মত হয়নি। বামপন্থী দলগুলোর সামনে বিকাশের সুযোগ আছে। তবে যেভাবে তারা কাজ করছে, চিন্তা করছে, তা নিয়ে তারা ক্ষয়িষ্ণুতা কাটাতে কিংবা বিকশিত হতে পারবে না। নতুন বাস্তবতাকে উপলব্ধি করে নতুন কর্মসূচি ও কর্মনীতি প্রণয়ন দরকার। কিছু সংগঠন নক্সালপন্থী ধারায় ও সর্বহারা পার্টির ধারায় সশস্ত্র কর্মকাণ্ডে সক্রিয় আছে। বর্তমান সরকারের আমলে তারা র্যাব দ্বারা বিনা বিচারে কথিত বন্দুকযুদ্ধে প্রাণ হারাচ্ছেন। ২০০৪ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে তারা ক্লিনহার্ট অপারেশন, এনকাউন্টার ও ক্রসফায়ারের নামে বিনা বিচারে প্রাণ হারিয়ে চলছেন। ২০১২ সালে পৌঁছে দেখা যাচ্ছে, আমাদের সমাজ এই বন্দুকযুদ্ধ, ক্রসফায়ার, এনকাউন্টার ও ক্লিনহার্ট অপারেশনকে স্বাভাবিক ব্যাপার বলে মেনে নিয়েছে।

রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি ব্যবস্থাপনায় সরকারের চরম দুর্বলতা ও অযোগ্যতা স্পষ্ট হয়ে গেছে। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ জোট ক্ষমতায় আসার পর থেকেই শেয়ার মার্কেটে নানা কেলেঙ্কারির উত্তেজনাকর সব খবর প্রচারমাধ্যমের খোরাক হয়েছে। প্রতারণার ব্যবসা অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করে সামনে এসেছে। চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণা, হাউজিং সোসাইটির নামে প্রতারণা, মানবসম্পদ রফতানির নামে আদম বেপারিদের প্রতারণা, বড় বড় অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বেশি লাভের লোভ দেখিয়ে লোকের কাছে শেয়ার বিক্রি করে সুদ-আসল কোনোটাই না দেওয়া, রাষ্ট্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পরিশোধ না করা, ভর্তি বাণিজ্য, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, মুক্তিপণ ইত্যাদির ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। এর মধ্যে এসব অতীতের সকল রেকর্ড অতিক্রম করে গেছে। সরকার এ ক্ষেত্রে শৈথিল্যের, দুর্বলতার ও অযোগ্যতার পরিচয় দিয়ে চলছে। ডেসটিনির ব্যবসা এ ক্ষেত্রে বৃহত্তম। লক্ষ লক্ষ মানুষ লাভ পাচ্ছে না, মূল টাকা ফেরত পাচ্ছে না, ভবিষ্যতের ভরসা নেই। সরকার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বন্ধ রেখে, কর্তাব্যক্তিদের জেলে নিয়ে প্রায় নিষ্ক্রিয় আছে। প্রতারিত মানুষদের ক্ষতি কোনোভাবে পূরণ করা যায় কি-না, সে সম্পর্কে সরকারের পরিচ্ছন্ন কোনো বক্তব্য নেই। কেবল ডেসটিনিই নয়, আরও কিছু প্রতিষ্ঠানের বৃহদায়তন প্রতারণার খবর এর মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। সরকার যেন শাস্তি দেওয়ার কথা বলে হাম্বিতাম্বি করার ও দু-চারজনকে গ্রেফতার করার মাধ্যমেই কর্তব্য সমাধা করে ফেলেছে। ভাবখানা এমন যে, সরকারের কোনো দায়-দায়িত্বই নেই। আইন নিজস্ব গতিতে চলছে? আইনের নিজস্ব গতিটা কাদের হাতে? ব্যাংকিং ব্যবস্থায়ও অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গকারী কেলেঙ্কারির তুল্য কেলেঙ্কারির রেকর্ড পৃথিবীতে কয়টি আছে? হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনাকে অর্থমন্ত্রী খুব সহজভাবে মামুলি ব্যাপার বলে উড়িয়ে দেন! এর মধ্যে ঘুষ-দুর্নীতির অনেক ব্যাপ্তি ঘটেছে। কয়েকটি নতুন প্রাইভেট ব্যাংক সরকারের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ২০১২ সালে। বেশ কয়েকটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় সরকারের অনুমোদন নিয়ে কাজ আরম্ভ করেছে। উল্লেখ্য যে, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের একাডেমিক অটোনোমি বলে কিছুই দেওয়া হয়নি, পাঠ্যসূচি প্রণয়নের ক্ষমতাও সরকার নিজের হাতে রেখেছে। তবে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আর্থিক ব্যাপারে অটোনোমি দেওয়া হয়েছে। এগুলোর ব্যবস্থাপনা যতটা একাডেমিক, তার চেয়ে বেশি ফিন্যান্সিয়াল।

সরকার ক্ষমতায় আসার পরেই দলীয়করণ ও দলবাজির তাণ্ডব চলছিল। ২০১২ সালে, মনে হয়, দলবাজি সামান্য কমেছে। তবে অন্তর্লীন ধারায় দলীয়করণ যথাবিহিত আছে। নির্বাচন সামনে নিয়ে বাইরের চেহারাকে একটু ভদ্র করার চেষ্টা করা হচ্ছে। ২০১২ সালে সড়ক দুর্ঘটনা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি ঘটেছে। খ্যাতিমান ও অখ্যাত অনেক লোকের প্রাণ দিয়েছে দুর্ঘটনায়। সরকারের লোকেরা এসব দুর্ঘটনার জন্য প্রধানভাবে দাবি করেছেন ড্রাইভারদের। প্রচারমাধ্যম এসব কথা প্রচার করেছে। কেবল ড্রাইভারদের দোষ দিয়ে, শাস্তি দিয়ে প্রতিকার হয়? রাস্তাঘাটের দুরবস্থার কথা তোলা হয়েছে সব মহল থেকে। সরকারি লোকরা রাতারাতি রাস্তাঘাট ঠিক করে ফেলার তত্পরতা প্রদর্শন করেছেন।

২০১২ সালে সবচাইতে মর্মান্তিক ও আতঙ্কের ঘটনা হলো হত্যাকাণ্ড। সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড থেকে বিশ্বজিত্ হত্যা পর্যন্ত বেশ কয়েকটি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের খবর দীর্ঘদিন ধরে পত্র-পত্রিকায়, রেডিও-টেলিভিশনে প্রচারিত হয়েছে। ক্রমাগত অপরাধীদের শাস্তি দাবি করা হচ্ছে। প্রায় সব হত্যাকাণ্ডই রহস্যের মধ্যে আছে। নানা রকম মিথ্যা প্রচারমাধ্যমে স্থান করে নিয়েছে। সমাজের সর্বস্তরে সব মানুষের মধ্যে জান-মাল নিয়ে আতঙ্ক ও সংশয় দেখা দিয়েছে। কেবল শাস্তিমূলক ব্যবস্থাই কি প্রতিকার? এত দাবি, এত প্রচার, তার পরও বিচার এগোয় না! সাগর-রুনিকে কারা কেন হত্যা করেছে?

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, খাদ্যে ভেজাল, ওষুধের নিম্নমান ও দাম বাড়ানো জন্য কৃত্রিম অভাব সৃষ্টি, ফরমালিনের ব্যবস্থা ইত্যাদি যথাবিহিত ক্রমবর্ধমান আছে। সরকার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে, পারে না। মনে হয়, সকলেই এখন এগুলোকে মেনে নিয়েছে। ২০১২ সালের বড় ঘটনাগুলোর মধ্যে ড. ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংকের ঘটনা অবশ্য উল্লেখ্য। গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদে ড. ইউনূসের ৬০ বছর বয়সে চাকরির মেয়াদ শেষ হয়েছে, কিন্তু ৭২ বছর বয়সেও তিনি তার পদ আঁকড়ে আছেন। সরকার অনেক দিন দরে ইউনূসের জায়গায় নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ করার চেষ্টা করছে। কিন্তু ইউনূসকে সরিয়ে দেওয়ার পরও তা পারছে না। এ নিয়ে পশ্চিমা বৃহত্ শক্তিগুলো—বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ সরকারের উপর ইউনূসের অনুকূলে প্রত্যক্ষ চাপ দিয়ে চলেছে। এ থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, বাংলাদেশ কোনো স্বাধীন রাষ্ট্র না।

পদ্মসেতুর নির্মাণের জন্য বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের ঋণচুক্তি বিশ্ব ব্যাংক বাতিল করে দেয়। দুর্নীতির অভিযোগ তুলে এটা করা হয়। বাংলাদেশ সরকারের ভূমিকা যেমন স্বচ্ছ নয়, বিশ্ব ব্যাংকের ভূমিকাও তেমনি স্বচ্ছ নয়। পত্র-পত্রিকায়, রেডিও টেলিভিশনে অজস্র কথা প্রচারিত হয়। কিন্তু দুর্নীতিটা কী তা বোঝা যায় না। বিশ্বব্যাংক একরকম বলে বাংলাদেশ সরকার মধ্য অন্যরকম বলে। দুর্নীতি সম্পর্কে বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশনারের বক্তব্যেও পারম্পর্য পাওয়া যায় না। বিশ্বব্যাংকের লোকেরা সব সাধু—এমনটা ভাববার কোনো কারণ দেখি না। মনে হয়, বাংলাদেশ যে পরাধীন, এই কথাটাই বিশ্বব্যাংক ভালো করে বুঝিয়ে দিতে চায়। গ্রামীণ ব্যাংক ও ড. ইউনূসের ঘটনা নিয়ে পদ্মাসেতুর ঋণচুক্তি বাতিল সংক্রান্ত ঘটনা যেভাবে প্রচারমাধ্যমে এসেছে তাতে বোঝা যায়, বাংলাদেশ স্বাধীনতা হারিয়েছে।

বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী ও আরও কোনো কোনো মন্ত্রী কখনও কখনও বিরূপ কথা বলে থাকেন। তাদের কথায় জনগণ সমর্থন দেয় না এই কারণে যে, সরকার কোনো দৃঢ় নীতিগত অবস্থান না নিয়েই এসব কথা বলছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের সুনির্দিষ্ট কিছু নীতি ঘোষণা করে সেই নীতিকে দৃঢ়ভাবে অবলম্বন করলে অবশ্যই তা জনগণের সমর্থন পাবে।

বাংলাদেশের সমস্যাবলি জটিল। যুক্তরাষ্ট্রের অধীন থেকে, তাদের প্রতি আনুগত্য নিয়ে, তাদের ইচ্ছানুযায়ী কাজ করতে হয় বলে বাংলাদেশের কোনো সরকার কোনো সমস্যার সমাধান করতে পারে না। সমস্যার সমাধানের জন্য রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা দরকার। গত তিন দশক ধরে রাজনীতি যে ধারায় চলছে তাতে রাজনৈতিক দলগুলো রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার বোধ হারিয়ে ফেলেছে। লিবারেল ডেমোক্রেসির নামে যে গণতন্ত্র বাংলাদেশে চলছে, জনগণের দৃষ্টিতে তা আদৌ গণতন্ত্র নয়।

সকলেই অন্ধভাবে বিশ্বাস করত যে, আওয়ামী লীগের ও বিএনপির নেতৃত্বে দ্বিদলীয় কথিত লিবারেল ডেমোক্রেসি বাংলাদেশে কায়েম হবে। কিন্তু দল দুটোর মধ্যে গণতান্ত্রিক মনোভাবের বদলে বিরাজ করছে সরাসরি শত্রুতার মনোভাব। কথিত এই গণতন্ত্রের পরিচালনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্টেট ডিপার্টমেন্টের সাউথ এশিয়া ডেস্ক, বর্তমানে সাউথ এশিয়া অ্যান্ড মিডল ইস্ট ডেস্ক সরাসরি সক্রিয়। বাংলাদেশের রাজনীতিবিদেরা যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকেই বাংলাদেশের জন্য সর্বোত্কৃষ্ট নীতি মনে করেন। বাংলাদেশের উন্নতি হবে কীভাবে? কথিত ডোনার এজেন্সিসমূহের 'উন্নয়ন প্রকল্প'ই বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা। বাংলাদেশ উন্নতি করবে কীভাবে? ২০১২ সালে সিভিস সোসাইটির রাজনৈতিক ভূমিকা সম্পর্কে শিক্ষিত সাধারণের মধ্যে নতুন উপলব্ধি দেখা দিয়েছে। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির জরুরি অবস্থা ঘোষণা মইন উ আহমদের নেতৃত্বে হয়নি, ইয়াজউদ্দিনের বুদ্ধিতেও হয়নি, হয়েছে সিভিল সোসাইটি মহলের মাধ্যমে, সিভিল সোসাইটি মহলের পেছনে সক্রিয় ছিল যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ও স্থানীয় দূতাবাস—এই রকম কথাবার্তা এখন খবরের কাগজ পড়েন এমন সাধারণ লোকদের মুখেও শোনা যায়। বাংলাদেশের শিক্ষিত লোকেরা খুব সহজে এখন বাংলাদেশের পরাধীনতাকে মেনে নিয়েছে। এই পরাধীনতার মধ্যে বাংলাদেশের মুত্সুদ্দি-বণিক শ্রেণী বিরাটভাবে লাভবান। গ্রামে শহরে খবরের কাগজ পড়েন এমন লোকদের মুখে এখন প্রায়শ শোনা যায়, ২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন সাংবিধানিক নিয়মে হবে না, এরপর সিভিল সোসাইটি ক্ষমতায় আসবে, মিলিটারিরা ব্যাকে থাকবে। যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় দূতাবাস এবং সিভিল সোসাইটিসমূহ রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় আছে।

২০১২ সালের ঘটনাবলি থেকে ভবিষ্যতের জন্য বাংলাদেশের অনেক কিছু শিক্ষণীয় আছে। সমস্যাবলিকে ভাসাভাসা দৃষ্টিতে দেখলেই হবে না, গভীরেও দৃষ্টি দিতে হবে এবং সমাধানের উপায় ভাবতে হবে।

লেখক :রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও শিক্ষাবিদ

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
দলীয় সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। সাবেক উপদেষ্টা আকবর আলি খানের এই আশঙ্কা যথার্থ বলে মনে করেন?
8 + 7 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
আগষ্ট - ২০
ফজর৪:১৬
যোহর১২:০২
আসর৪:৩৬
মাগরিব৬:৩১
এশা৭:৪৭
সূর্যোদয় - ৫:৩৬সূর্যাস্ত - ০৬:২৬
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :