The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার, ৩১ ডিসেম্বর ২০১২, ১৭ পৌষ ১৪১৯, ১৭ সফর ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ রাজধানীতে বর্ষবরণে নাশকতা ঠেকাতে মাঠে নেমেছে ৮টি ভ্রাম্যমাণ আদালত | নতুন বছরে খালেদা জিয়ার শুভেচ্ছা | নতুন বছরে আন্দোলনে ভেসে যাবে সরকার: তরিকুল ইসলাম | দক্ষিণ এশিয়ায় সাংবাদিক হত্যার শীর্ষে পাকিস্তান | ঢাবি শিক্ষক সমিতির নির্বাচন নীল ৮, সাদা ৭ পদে জয়ী | জোর করে ক্ষমতায় থাকতে চাইলে ৭৫ এর মতো পরিণতি হবে: খন্দকার মোশাররফ | দুর্নীতিবাজদের ভোট দেবেন না : দুদক চেয়ারম্যান | ট্রেনের ধাক্কায় ৫ হাতির মৃত্যু | এখন বাবা-মাকে বই নিয়ে চিন্তা করতে হয় না : প্রধানমন্ত্রী | আপাতত পাকিস্তান সফর করছে না বাংলাদেশ ক্রিকেট দল | মিরপুরে ঢাবি অধ্যাপকের স্ত্রীকে গলাটিপে হত্যা | তাজরীনে আগুন পরিকল্পিত: বিজিএমইএ | ১৩ জানুয়ারি থেকে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার নিবন্ধন | সমস্যা সমাধানে আলোচনার বিকল্প নেই : সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম

তৃতীয় শক্তি বনাম পরিশোধিত রাজনীতি

ড. মো. রওশন আলম

১৯৯০ সালের ৬ই ডিসেম্বর এরশাদ সরকারের যখন পতন হল, তখন সারা ঢাকাতে কি যে এক অনাবিল আনন্দ বয়ে গেল সেদিন। অন্যরকম একটা শান্তির পরিতৃপ্তি ছিল মানুষের চোখেমুখে। ১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চের পর প্রায় টানা ৯ বছর ক্ষমতায় জগদ্দল হয়ে থাকা এরশাদকে হটানোর জন্য সে সময় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এক হয়ে আন্দোলনে নেমেছিল। যার ফলে এরশাদকে ক্ষমতা থেকে হটানোর দীর্ঘদিনের সেই অসম্ভব কাজটিও সম্ভবপর হয়েছিল। তখন উদ্দেশ্য ছিল সেনাছাউনি থেকে ক্ষমতা জনগণের মধ্যে ফিরিয়ে আনা। প্রকৃত গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে পাবার জন্য এক উদাত্ত স্বপ্ন ও আশা। কিন্তু কতটুকু সেই কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্র ফিরে পেলাম আমরা- এ রকম এক চরম হতাশা আজ বিরাজ করছে আমাদের অনেকের মাঝে। ১৯৯০ সালের পর থেকে আজ অবধি গত ২২ বছরে ভোটের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের সুযোগ হয়ত সৃষ্টি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু যতটুকু আশা নিয়ে বড় দুই রাজনৈতিক দলকে পুনঃ পুনঃ ক্ষমতায় বসিয়েছিল জনগণ- তার কতটুকু পূর্ণ হয়েছে- সেটা একটা বড় প্রশ্নই রয়ে গেল। অন্যদিকে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের দুই শীর্ষ নেত্রীদ্বয়ের শাসন আমলের চেয়ে এরশাদ শাসনই বুঝি ব্যাটার ছিল- এ রকম তুলনা ইদানিং যারা করছেন- তাদের সেই তুলনাটা কতটুকু যৌক্তিক বা অপ্রাসঙ্গিক, সেটাও অনেকের মনে উদ্রেক করেছে এক সন্দেহের জটিল প্রশ্ন।

সে যাই হোক, এটা হয়ত অনস্বীকার্য যে, গত ২২ বছরে আমরা দুই বৃহত্তর রাজনৈতিক দলের মাঝখানে গ্রহপুঞ্জের নক্ষত্ররাশির কক্ষপথের ন্যায় আবর্তিত হয়ে পড়েছি এবং বার বার ঘুরপাক খাচ্ছি প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আশায়, বৈষম্য দূরীকরণ ও দেশের অর্থনৈতিক মুক্তির তাগাদায়। আমরা সব সাধারণ আমজনতা ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি দল দুটির কর্মকাণ্ডের সঙ্গে; বিভাজিত হয়ে পড়েছি দুটি কাতারে, দুটি সারিতে- বিএনপি ও আওয়ামী লীগ। কিঞ্চিত্ যারা জামায়াত এবং এরশাদের জাতীয় পার্টির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত- তারাও দিগ্বিদিকভাবে ছোটাছুটি করছেন ক্ষমতার লোভে। কখনো জোটে বা মহাজোটে। তাই ক্ষমতার রাজনীতিতে জোট ও মহাজোট নামের দুটি বলয় তৈরি হয়েছে। একবার এরা আর একবার ওরা- মাঝখানে অতি সাধারণ আমজনতারা দিশাহারা। এছাড়াও জোট বা মহাজোটের বাইরে মূল দল থেকে যারা অতীতে বিচ্যুত হয়ে পড়েছিলেন, তাঁদের কথারইবা মূল্য কোথায়? যেমন ড. কামাল হোসেন, বদরুদ্দোজা চৌধুরী এবং আরো অনেককে তো আমরা জানি- যারা মূল দল থেকে বিচ্যুত হয়ে নতুন ধারার কিছু একটা করতে চেয়েছিলেন। তারা কি তাদের সেই চেষ্টা বা বিকল্প চিন্তার সাকসেসফুল কোনো রাজনৈতিক ধারা আজ অবধি চালু করতে সক্ষম হয়েছেন? উত্তরে নিশ্চয় বলবেন যে, তারা সক্ষম হননি হয়ত ঠিকই তবে চেষ্টা তো করে যাচ্ছেন। তদুপরি মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, দেশে যারা বাম ধারার রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, তারা কি রাজনীতি থেকে ধীরে ধীরে ছিটকে পড়ছেন বা হারিয়ে যাচ্ছেন? এটাকে অন্যভাবেও বলা যেতে পারে- বামপন্থিরা কথার ফুলঝুরি ও তেজস্বী বাক্য দ্বারা সাধারণ মানুষদেরকে তাদের বাম ধারার রাজনীতির প্রতি কতটুকু আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছেন? বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের গীত কি এখনো বাজিয়ে শোনানোর সময় আছে? এ রকম দোলাচলের মধ্যে পড়ে অনুর্বর চিত্তের-মস্তিষ্কের অনুসারী কিছু সুজুগি চিন্তা কারো কারো মনে অতি সহজেই দোলা দিয়ে যায়। তখনই হয় যত বিপত্তি, যার নাম হল তৃতীয় শক্তি। অনুর্বর চিত্তের অনুসারী যেসব ব্যক্তি বিকল্প হিসেবে দেশের রাজনীতিতে তৃতীয় শক্তির চিন্তা করে থাকেন এবং সেই চিন্তার উর্বর ফসল হিসাবে যারা দেশ পরিচালনায় বা ক্ষমতার কাণ্ডারি রূপে সামরিক শক্তিকে দেখতে চান-তাদের সেই চিন্তার ভিত্তি কোথায়? মনে কি পড়ে তাদের- ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের সেই বিভীষিকা, জেলহত্যা, ক্যু পাল্টা ক্যু? তারও পরে ১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চ? অতীতের সেই সামরিক সরকারগুলো তাদের কৃতকর্ম দ্বারা মানুষের নিকট কতটুকু আশার বা সুবিধার আলো বয়ে আনতে পেরেছিল? নাকি সামরিক সরকারগুলো গণতন্ত্রের জ্বালা কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল? এসব নিকট-অতীত ইতিহাস কি কারো অজানা? উপরন্তু মাঝখানে দুবছর ড. ফখরুদ্দিন আহমেদ ও মইনুদ্দিন শাসনকালেও সম্মানিত নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ড. মোহাম্মাদ ইউনূসকে নিয়ে এবং কিছু সংস্কারপন্থি ধারণার কথা বলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ধরনের নতুন হিসাব নিকাশ ও সম্ভাবনার আলো যারা দেখতে চেয়েছিলেন-তাদের সেই স্বপ্নও অঙ্কুরে বিনষ্ট হতে তেমন সময় লাগেনি। তাহলে আর থাকে কি? ঘুরেফিরে আবারও সেই বিএনপি ও আওয়ামী লীগ ওরফে জোট ও মহাজোট। কারণ আমরা যে আটকে পড়েছি এক ঘূর্ণায়মান কক্ষপথে। জোট ও মহাজোটের বেড়াজালে। ২২ বছরের এই ঘূর্ণায়মান কক্ষপথে কত ঘটনাই না ঘটেছে এ দেশে।

আমরা ভালর জন্য অবশ্যই বিকল্প দেখব- তাতে তো দোষের কিছু নেই। কিন্তু তা যদি হয় মাইনাস- টু ফর্মুলার নামে বা অনুর্বর চিত্তের উর্বর ফসলের তৃতীয় শক্তির নামে- তখনই হয়েছে যত বিপত্তি। সামরিক সরকারের ইতিহাস তো আমাদের সবারই কমবেশি জানা। আশেপাশের পাকিস্তান ও বার্মার সামরিক শাসনের ইতিহাস বা আমাদের নিজেদের ইতিহাসই কি যথেষ্ট নয়? ইদানিং আর একটি ধুয়া উঠেছে যে, স্বাধীনতার চেতনা ধরে রাখতে পারে এমন এক পক্ষকে আকাশ থেকে ধরে এনে ক্ষমতায় বসিয়ে 'তৃতীয় শক্তি' বানান। মনে হয় তারা আকাশের চাঁদ এনে দিবে জনগণকে। এরকম কি কোনো ইতিহাস পৃথিবীর কোথাও আছে? দেশের অধিকাংশ জনগোষ্ঠীই যখন বিএনপি ও আওয়ামী লীগের কাতারে বিভক্ত, তখন এরকম উদ্ভট চিন্তা অরণ্যে রোদনই মাত্র। এসব আকাশকুসুম চিন্তাধারা দেশকে শুধু পিছিয়েই নিয়ে যেতে পারে- মুক্তি নয়।

তারচেয়ে বরং চলমান গণতান্ত্রিক যে ধারা এখন চালু আছে- সেই ধারাকে কতটুকু বিশুদ্ধ করা যায়- সেইদিকে যদি আমরা মনযোগী হতে পারতাম- সেটাই হত উত্তম পদ্ধতি। আর এই ধারাকে ধরে রাখতে হলে ৭১-এর স্বাধীনতার চেতনা ও ৯০-এর গণআন্দোলনের উদ্দেশ্যকে মনেপ্রাণে ধরে রাখতে হবে। একক ব্যক্তির ক্ষমতা আঁঁকড়ে ধরার যে কালচার চালু আছে- সে মানসিকতার আমূল পরিবর্তন আনতেই হবে। হোক সে ক্ষমতা -দলের ভিতরে কিম্বা দেশের শীর্ষ পর্যায়ে। তা করতে হলে দুই জনপ্রিয় নেত্রীর দলের উপর একচ্ছত্র ক্ষমতা হরাস করা এবং তারা দুজনই যে দেশের জন্য একমাত্র এবং একমাত্রই অপরিহার্য এরকম একটা ধ্যান-ধারণা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে গণতন্ত্রের পথকে প্রসারিত করতে হলে সঠিক অবকাঠামো সৃষ্টির মাধ্যমে ভবিষ্যত্ সত্ নেতৃত্ব তৈরি করার কোনো বিকল্প নেই। অন্যথায় তৃতীয় শক্তির মত অপশক্তিগুলি বার বার গণতন্ত্রকে বাধাগ্রস্ত করবেই করবে। পরিশেষে গণতন্ত্র ও গভর্নমেন্ট সম্পর্কে গ্রীক দার্শনিক এরিস্টটল এবং আমেরিকার ১৬তম প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কনের দুটি বিখ্যাত উদ্ধৃতি দিয়ে লেখাটি শেষ করছি। এরিস্টটলের ভাষায় 'a democracy is the rule of the poor and the rule of the majority'. আর আব্রাহাম লিঙ্কন বলেছিলেন-'Government of the people, by the people, for the people'। আমাদের দেশের নেতৃত্ব এই বাণী দুটো মানলেই হয়।

লেখক :যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও স্টেটে একটি ইন্ডাস্ট্রিতে কর্মরত।

[email protected]

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
দলীয় সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। সাবেক উপদেষ্টা আকবর আলি খানের এই আশঙ্কা যথার্থ বলে মনে করেন?
7 + 8 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
সেপ্টেম্বর - ২০
ফজর৪:৩২
যোহর১১:৫৩
আসর৪:১৬
মাগরিব৬:০১
এশা৭:১৩
সূর্যোদয় - ৫:৪৬সূর্যাস্ত - ০৫:৫৬
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :